ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬

এগিয়ে যেতে হবে আন্তর্জাতিক ভারসাম্যে

মল্লিক মাকসুদ আহমেদ বায়েজীদ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: জুন ২৬, ২০২৬, ০৬:৫৪ এএম

কূটনীতির মঞ্চে সব রাষ্ট্রই যেন এক নিপুণ দাবারু। কার দান কতটুকু কার্যকর হবে, তা নির্ভর করে টেবিলের ওপর নয়, বরং ভূ-রাজনীতির বিশাল ক্যানভাসে। দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ আজ এমন এক কূটনৈতিক চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপকে কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দিয়ে নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক ক্ষমতার বিন্যাস দিয়ে বুঝতে হয়। ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে দেশটি আশা করতে পারে যে, নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রথম বড় সফরে দিল্লিকে অগ্রাধিকার দেবে, কিন্তু রাষ্ট্রনীতি কেবল প্রথার ওপর দাঁড়ায় না; তা দাঁড়ায় প্রয়োজন, সময়, সুযোগ, সংকেত ও দর-কষাকষির ওপর। এমন সন্ধিক্ষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।

জনপ্রিয় একটি প্রবাদ আছে, ‘হাতি যখন লড়াই করে, তখন ঘাসেরই ক্ষতি হয়।’ কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ আজ এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে ঘাস হয়ে মাটিতে মিশে থাকা নয়, বরং ঘাসের মতোই প্রাণশক্তিতে বেড়ে ওঠা জরুরিÑ যাতে হাতির পায়ের তলায় না পড়ে বরং হাতির লড়াইয়ের ময়দানটিই শান্তির শীতল ছায়ায় রূপান্তরিত হয়। সেদিক থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। একদিকে বিশাল প্রতিবেশী ভারত, যার সঙ্গে রয়েছে নাড়ির টান ও নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন; অন্যদিকে উদীয়মান পরাশক্তি চীন, যার অর্থনৈতিক হাতছানি উন্নয়নের স্বপ্ন দেখায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর সেই বাস্তবতারই এক নতুন অধ্যায়।

১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দূরদর্শিতা

বাংলাদেশে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ঐতিহাসিক ভিত্তি বেশ মজবুত। ১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের যে বীজ বপন করেছিলেন, আজ তা এক মহিরুহে পরিণত হয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে এক রাষ্ট্রীয় সফরের মাধ্যমে তিনি এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান, যেখানে তার সফরসঙ্গী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। সেই চীন সফরেই শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক বাজারে অর্থনৈতিক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন ও মালয়েশিয়া সফর যেন শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সেই দূরদর্শী অর্থনৈতিক কূটনীতিরই এক আধুনিক ও সময়োপযোগী সম্প্রসারণ।

২. মালয়েশিয়া সফর ও শ্রমবাজারের ‘পদ্ধতির গেরো’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফর কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি ছিল প্রবাসী কর্মীদের অধিকার ও দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করার এক সাহসী পদক্ষেপ। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের কর্মসংস্থান খাতে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত পর্যায়ে আলোচনা করেছেন।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট ভাঙা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কাছে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে ‘পদ্ধতির গেরো’ বা বিদ্যমান জটিলতা নিরসনের আহ্বান জানিয়েছেন।

৩. কূটনীতির ‘জাদু’: কৌশলগত বাস্তববাদ

কূটনীতিতে একটি কথা প্রচলিত আছে, ‘সব ভালো খেলোয়াড়েরই কিছু অদৃশ্য যাদু থাকে।’ আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে যেমন বন্ধুরা নানা অসাধ্য সাধনে পটু থাকে, তেমনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও দক্ষ কূটনীতিবিদদের ক্ষেত্রে এমন ‘জাদুর’ বিষয়টি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। গণমাধ্যমে যখন দেখা যায়, জটিল আন্তর্জাতিক সংকটÑ যেমন শ্রমবাজারের জট বা মেগা প্রকল্পের অর্থায়নÑ তারেক রহমান অনায়াসে সমাধান করছেন, তখন সাধারণ মানুষের কাছে তাকে ‘জাদুকর’ বলে মনে হয়।

৪. ভারত-চীন ভারসাম্য : একটি সূক্ষ্ম শিল্প

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত নিরাপত্তা, সীমান্ত, নদী, জ্বালানি, যোগাযোগ, আঞ্চলিক স্থিতি ও মানুষে-মানুষে সংযোগ। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক হওয়া উচিত অর্থায়ন, শিল্প, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, বাণিজ্যবৈচিত্র্য, রপ্তানি সক্ষমতা ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের ওপর ভিত্তি করে। বর্তমান সরকার প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে বাস্তববাদী কূটনীতির ওপর জোর দিচ্ছে।

চীনের সঙ্গে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

চীন আমাদের উন্নয়নের জ্বালানি। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে যে গতি সঞ্চার করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। চীনের মডেলটি হলোÑ ‘সরাসরি কাজ, কম কথা।’ তবে মনে রাখতে হবে, ‘বিনামূল্যে খাবার কেবল ইঁদুর মারার ফাঁদেই থাকে।’

৫. সূক্ষ্ম ভারসাম্যের শিল্প : ‘কারো বিরুদ্ধে নয়, সবার সঙ্গে’

অনেকে মনে করেন চীনকে কাছে টানা মানেই ভারতকে দূরে ঠেলে দেওয়া। এই ধারণাটিই বাংলাদেশের কূটনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। কূটনীতিতে ‘জিরো-সাম গেম’ বা ‘একজন জিতলে অন্যজন হারবে’Ñ এই মানসিকতা পরিহার করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর কোনো সামরিক জোট বা ভারতবিরোধী অক্ষ তৈরির জন্য নয়, বরং এটি উন্নয়নের ক্ষুধা মেটানোর জন্য।

আমাদের কৌশল হতে হবে ‘সূক্ষ্ম ভারসাম্য’ ফাইন টানিং ব্যালেন্স

ভারতকে আশ্বস্ত করা : নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মূল অংশীদার ভারত। চীনের বিনিয়োগকে ভারতের নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে ভারতকে বোঝাতে হবে।

৬. জাতীয় ঐকমত্য ও পররাষ্ট্রনীতি :

পররাষ্ট্রনীতিকে অভ্যন্তরীণ দলীয় রাজনীতির বন্দি হতে দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশের সামনে তিনটি বড় কাজ রয়েছে:

১. ভারতকে বোঝানো যে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভারতের বিরুদ্ধে নয়, বরং উন্নয়নের অংশ।

২. চীনকে বোঝানো যে বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক কোনো সামরিক বা ভূরাজনৈতিক মৈত্রীর স্বয়ংক্রিয় রূপ নয়।

৩. দেশের জনগণকে বোঝানো যে পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে স্বার্থ, মর্যাদা, ঝুঁকি, সময়জ্ঞান ও দর-কষাকষির কঠিন শিল্প।

বাংলাদেশে পররাষ্ট্রনীতি প্রায়ই গৃহবিবাদের শিকার হয়। এক দল ভারতের ঘনিষ্ঠ হলে অন্য দল চীনের কার্ড খেলে। এটি আমাদের জাতীয় মেরুদ-কে দুর্বল করে দেয়।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ আজ এমন এক অবস্থানে, যেখানে আবেগ দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি সাজানোর সময় পেরিয়ে গেছে। ভারত ও চীনÑ উভয় দেশই আমাদের জন্য অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র এখন রাজনৈতিক আবেগের চেয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

আমাদের পথ হোক শান্তির, উন্নয়নের এবং সর্বোপরি সার্বভৌম মর্যাদার। ভারতের সঙ্গে আস্থা ও চীনের সঙ্গে সমৃদ্ধিÑ এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই রচিত হবে আগামীর বাংলাদেশ।