ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬

নিহত ১৬৪, আহত সহস্রাধিক

ভেনেজুয়েলায় পরপর দুই শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাত

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ২৬, ২০২৬, ০৫:৩৬ এএম

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় স্থানীয় সময় গত বুধবার আঘাত হেনেছে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প। এতে অন্তত ১৬৪ জন নিহত এবং সহস্রাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তীব্র কম্পনে দেশটির রাজধানী কারাকাসে ধসে পড়া বহু ভবনের নিচে আটকা পড়েছেন অসংখ্য মানুষ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বুধবার সন্ধ্যায় আঘাত হানা ভূমিকম্প দুটির রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫। তথ্য-উপাত্ত অনুসারে, এই ভূমিকম্প ছিল গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে আঘাত হানা অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প। খবর : এপি।

জানা গেছে, পুরো দেশেই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এতে ভেনেজুয়েলার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে আপাতত বিমানবন্দরটি বন্ধ রাখা হয়েছে। ভূমিকম্পের পর দেশটির রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার দূরে ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চলেও বিভিন্ন ভবন থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার টেলিভিশনের খবরে দেখা যায়, উদ্ধারকর্মীরা ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। স্থানীয়রা জানান, ভূমিকম্পের সময় রাজধানী কারাকাসে আতঙ্কিত মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। ভূমিকম্পের পর অনেককে ধসে পড়া ভবন ও বিধ্বস্ত স্থাপনার নিচে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ করতে দেখা যায়।

দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বৃহস্পতিবার ভোরে সর্বশেষ হতাহতের তথ্য জানিয়ে বলেন, দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে উদ্ধারকারী দলগুলোকে রাজধানীর উত্তরে উপকূলীয় রাজ্য লা গুইরায় পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধারে দিনের আলোকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। রদ্রিগেজ লা গুইরাকে ‘দুর্যোগ এলাকা’ হিসেবে বর্ণনা করে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট বলেন, বিপুলসংখ্যক ভবন ধসে পড়ায় ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি এটি। উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভারী নির্মাণযন্ত্র সরবরাহের আহ্বান জানিয়ে রদ্রিগেজ বলেন, জাতিসংঘের অনুসন্ধানকারী ও উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলার পথে রয়েছে। বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, লা গুইরার একটি হাসপাতালের ভেতরে-বাইরে অসংখ্য আহত মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

রদ্রিগেজ আরও জানান, ভূমিকম্পের ফলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ ও মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের প্রধান বিমানবন্দর সিমোন বলিভার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। ফলে সেটি বন্ধ রাখা হয়। কারাকাসে মেট্রো রেলসেবাও স্থগিত করা হয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ। কয়েক দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কিছু স্কুল ভবনকে আশ্রয়কেন্দ্র ও ত্রাণ সংগ্রহকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে।

এদিকে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ভূমিকম্পের সময় কারাকাসে দুলতে থাকা ভবন থেকে মানুষ ছুটে বেরিয়ে আসছে। পরে তারা দেখতে পান, অনেক ভবনের দেয়াল ধসে পড়েছে। এ সময় রাস্তা থেকেই ঘরের আসবাবপত্র দেখা যাচ্ছিল। রাজধানীর দুটি ব্যস্ত এলাকায় ধুলার বিশাল মেঘ আকাশে উঠতে দেখা যায়। কারাকাসের বাসিন্দা হেক্টর রিচ্চি বলেন, ‘প্রথমে কম্পন হালকা ছিল, পরে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এ সময় ভয়ে-আতঙ্কে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তা ও খোলা স্থানে আশ্রয় নেন।’

ভেনেজুয়েলা একাধিক ভূতাত্ত্বিক ফল্ট লাইনের কাছে অবস্থান করলেও দক্ষিণ আমেরিকান ও ক্যারিবীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে লাতিন আমেরিকার অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সেখানে শক্তিশালী ভূমিকম্প তুলনামূলক কম হয়ে থাকে। কিন্তু বুধবারের ভূকম্পন ছিল প্রলয়ঙ্করী। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, প্রথম ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে ক্যারিবীয় উপকূলের মোরোন শহরের পশ্চিমে, যা কারাকাস থেকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দূরে। এর গভীরতা ছিল ২২ কিলোমিটার। এর মাত্র এক মিনিট পর একই এলাকায় ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার এবং উৎপত্তিস্থল ছিল মোরোনের দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে।

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডিওসদাদো ক্যাবেল্লো জনগণ কোনো স্থাপনার ভেতরে না থেকে খোলা স্থানে অবস্থানের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, পরাঘাত বা আফটার শক ভবনগুলোকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তার এই আহ্বানের পর বহু মানুষকে রাস্তায় অবস্থান করতে দেখা যায়। কারাকাসের কেন্দ্রস্থলে শত শত মানুষ রাত কাটান পার্ক, পার্কিং এলাকা এবং খোলা জায়গায়।

ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে ৪১ বছর বয়সি পরিচ্ছন্নতাকর্মী মারিয়া ক্রিস্টিনা দিয়াজ বলেন, ‘আমরা ভয় পাচ্ছিলাম ভবনগুলো আমাদের ওপর ভেঙে পড়বে। আমার মা, মেয়ে ও আমি সারারাত বাইরে ছিলাম। এক মুহূর্তও ঘুমাতে পারিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সেটা ছিল ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। আমরা কেঁদেছি, চিৎকার করেছি। তবে সৌভাগ্যক্রমে আমরা বেঁচে আছি।’ বৃহস্পতিবার সকালে মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বলতার মধ্যেও অনেককে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ করতে দেখা যায়।

এর আগে বুধবার গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রদ্রিগেজ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতাল ও আবাসন পুনর্নির্মাণে ২০ কোটি ডলারের একটি তহবিল গঠন করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও অর্থমন্ত্রীদের এ কার্যক্রম তদারকের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন দেশের সহায়তার প্রস্তাব : তীব্র ভূমিকম্পের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সহায়তার প্রস্তাব আসতে শুরু করেছে ভেনিজুয়েলায়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা সহায়তা এবং মানবিক ত্রাণ ভেনেজুয়েলায় পাঠাচ্ছে। তিনি বলেন, এটি হবে পুরো সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ। এটি হবে বৃহৎ, দ্রুত ও কার্যকর। রুবিও আরও জানান, ভূমিকম্পে কারাকাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি রানওয়ে ফেটে গেছে, ফলে সেখানে বিমান অবতরণ কঠিন হয়ে পড়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই প্রস্তাবের জন্য তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান রদ্রিগেজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, মার্কো রুবিওর সঙ্গে তার টেলিফোনে কথা হয়েছে। তিনি সহমর্মিতা ও সহায়তার প্রস্তাব পাঠানো বিভিন্ন দেশের নেতাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান।

রদ্রিগেজ আরও জানান, ইকুয়েডর মানবিক সহায়তা পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। কাতার, মেক্সিকো এবং এল সালভাদর এরই মধ্যে উদ্ধারকর্মী পাঠিয়েছে। এ বিষয়ে এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নাইব বুকেলে এক্সে লেখেন, ‘আমাদের সংহতি ও প্রার্থনা আপনাদের সঙ্গে রয়েছে। শক্ত থাকুন, ভেনেজুয়েলা।’