২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের লড়াই জমে উঠেছে। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শেষ ৩২-এর টিকিট নিশ্চিত করা পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের পরবর্তী প্রতিপক্ষ এশিয়ান পরাশক্তি জাপান। তবে ফুটবলের নজরে এখন তার চেয়েও বড় কৌতূহলÑ জাপান বাধা টপকালে শেষ ষোলোতে নেইমার-ভিনিসিয়ুসদের প্রতিপক্ষ কারা হবে?
৪৮ দলের বিশ্বকাপের টুর্নামেন্টের বিন্যাস অনুযায়ী, শেষ ৩২-এ সি গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল লড়বে এফ গ্রুপের রানার্স আপ জাপানের বিপক্ষে। এই ম্যাচে জয়ী দল সরাসরি জায়গা করে নেবে শেষ ষোলোতে। ব্রাজিল যদি তাদের এই ম্যাচে জয় পায়, তবে শেষ ষোলোতে তাদের প্রতিপক্ষ হবে নরওয়ে এবং আইভরিকোস্টের মধ্যকার ম্যাচের জয়ী দল।
ব্রাজিল তাদের নকআউট যাত্রায় যদি নরওয়ের মুখোমুখি হয়, তবে সেটি হবে বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় দ্বৈরথ। গ্রুপ ‘আই’ থেকে রানার্স আপ হয়ে আসা নরওয়ের মূল শক্তি আর্লিং হলান্ড এবং অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড। অন্যদিকে, ব্রাজিলের আক্রমণভাগে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও নেইমারের ছন্দ তাদের শিরোপার অন্যতম বড় দাবিদার হিসেবে তুলে ধরেছে।
হিউস্টনে আজ সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় জাপানের বিপক্ষে মাঠে নামবে ব্রাজিল। এই ম্যাচ জিতে প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে শেষ ষোলোর টিকিট। ডালাসে আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় নরওয়ে বনাম আইভরিকোস্ট মুখোমুখি হবে। এই ম্যাচের জয়ী দলই নিশ্চিত করবে তারা শেষ ষোলোতে সেলেসাওদের মুখোমুখি হবে কি না।
যদি ব্রাজিল এবং নরওয়ে উভয় দলই তাদের নিজ নিজ ম্যাচে জয় তুলে নিতে পারে, তবে ফুটবলপ্রেমীরা শেষ ষোলোতে পেতে যাচ্ছেন নেইমার-ভিনিসিয়ুস বনাম হলান্ড-ওডেগার্ডের মতো স্বপ্নের লড়াই। নকআউটের এই সমীকরণ এখন সেলেসাও সমর্থকদের জন্য যেমন রোমাঞ্চের, তেমনি চ্যালেঞ্জিংও। এখন দেখার বিষয়, জাপানকে হারিয়ে ব্রাজিল কি নকআউটের মূল মঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে পারে কি না।
প্রতিবারের মতো এবারও বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট দল ব্রাজিল। দুর্দান্ত খেলেই টুর্নামেন্টের নকআউটে জায়গা করে নিয়েছে সেলেসাওরা। এদিকে, যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে বিশ্বকাপের পরের রাউন্ডে জায়গা করে নিয়েছে সূর্যোদয়ের দেশ জাপানও। এবার এশিয়ার জায়ান্টদের সামনে প্রতিপক্ষ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। এরই মধ্যে ব্রাজিলকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন জাপানের কোচ হাজেমি মোরিয়াসু। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের জাপান ডাগআউটে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রটি কোনো ট্যাবলেট, ল্যাপটপ কিংবা প্রযুক্তির আধুনিক যন্ত্র নয়। সেটি একটি সাধারণ সাদা হোয়াইটবোর্ড আর একটি কালো মার্কার।
হাফটাইমের বাঁশি বাজতেই খেলোয়াড়দের ভিড় জমে সেই বোর্ডের চারপাশে। কয়েকটি সরলরেখা, কিছু তীরচিহ্ন, ছোট ছোট বৃত্ত। দেখতে সাধারণ, কিন্তু সেই আঁকাতেই লুকিয়ে থাকে পরের ৪৫ মিনিটের যুদ্ধপরিকল্পনা। জাপান কোচ হাজিমে মোরিয়াসুর বিশ্বাস, দীর্ঘ অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতার চেয়ে একটি পরিষ্কার চিত্র অনেক দ্রুত খেলোয়াড়দের মাথায় পৌঁছে যায়।
এবার সেই হোয়াইটবোর্ডের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গতি, ম্যাথেউস কুনিয়ার তীক্ষè আক্রমণ আর নেইমারের সৃজনশীলতা থামানোর নতুন ছক এখন নিশ্চয়ই আঁকা হচ্ছে মোরিয়াসুর মার্কারের আঁচড়ে। ফুটবল বিশ্বের চোখও তাই এখন সেই সাদা বোর্ডের দিকেই।
মোরিয়াসুর হোয়াইটবোর্ড কৌশলের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের ওপর। প্রথমটি হলো রিয়েল টাইম অ্যাডজাস্টমেন্ট। প্রথমার্ধে প্রতিপক্ষের রক্ষণ কোথায় দুর্বল হচ্ছে, কোন জায়গায় বেশি স্পেস তৈরি হচ্ছে, হাফটাইমেই সেগুলো চিহ্নিত করে দেন তিনি। দ্বিতীয়টি জোনভিত্তিক নির্দেশনা। কোন দিক দিয়ে আক্রমণ গড়তে হবে, কখন ফুলব্যাকের পেছনের ফাঁকা জায়গায় বল ফেলতে হবে কিংবা কখন খেলোয়াড়দের অবস্থান বদলাতে হবে, সব কিছুই বোঝানো হয় সহজ কিছু রেখাচিত্রের মাধ্যমে।
তৃতীয়টি মানসিক স্বচ্ছতা। জটিল ট্যাকটিক্যাল ব্যাখ্যার বদলে সহজ ভিজ্যুয়াল নির্দেশনা খেলোয়াড়দের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। ফলে মাঠে বিভ্রান্তি কমে, বাড়ে আত্মবিশ্বাস।
শুধু পরিকল্পনাই নয়, ম্যাচের গতি-প্রকৃতি বদলালে মুহূর্তেই নিজের কৌশলও বদলে ফেলেন মোরিয়াসু। এই বিশ্বকাপে জাপান বেশির ভাগ সময় ৩-৪-২-১ ফর্মেশনে খেললেও বলের নিয়ন্ত্রণ পেলে সেটি খুব দ্রুত ৩-৪-৩ রূপ নেয়। প্রতিপক্ষ বুঝে ওঠার আগেই বদলে যায় পুরো আক্রমণ কাঠামো। এক পাশ দিয়ে একাধিক খেলোয়াড়কে নিয়ে প্রতিপক্ষকে টেনে আনে জাপান। এরপর হঠাৎ করেই খেলা ঘুরে যায় বিপরীত উইংয়ে। সেই মুহূর্তেই তৈরি হয় নতুন আক্রমণের রাস্তা। দ্রুত ট্রানজিশন, নিখুঁত ওয়ান টাচ পাসিং এবং অসাধারণ অব দ্য বল মুভমেন্টই এখন সামুরাই ব্লুদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
কাগজে-কলমে ব্রাজিলই হয়তো এগিয়ে। ইতিহাস, তারকা আর অভিজ্ঞতায়ও সেলেসাওদের পাল্লা ভারী। কিন্তু আধুনিক ফুটবল বারবার দেখিয়েছে, শুধু বড় নাম দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না। সঠিক পরিকল্পনা, নিখুঁত বাস্তবায়ন আর শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল দিয়ে যেকোনো পরাশক্তিকেই চাপে ফেলা সম্ভব।

