স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন প্রশ্নে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির অবস্থানে ভিন্নমাত্রা যোগ হয়েছে। তিন দলই বলছে, এই ইস্যুতে তাদের অবস্থান কড়া। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা তিন দলের এই দাবিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন। তাদের মতে, আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির অবস্থান অনেকটা কাছাকাছি হলেও কৌশলে বেশ পার্থক্য রয়েছে। বিএনপি বিষয়টিকে দেখছে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সতর্কতার প্রশ্ন হিসেবে। দলটি এখন এই ইস্যুর চেয়ে মাঠ পর্যায়ে প্রতিরোধ, স্থানীয় নির্বাচন ও সাংগঠনিক নজরদারিতে বেশি জোর দিচ্ছে। জামায়াত তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বিচারিক নিষ্পত্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ওপর। আর এনসিপি পুরো বিষয়টিকে জুলাই অভ্যুত্থানের নৈতিক ম্যান্ডেট ও রাষ্ট্র সংস্কারের আলোকে ব্যাখ্যা করছে। তবে তিন দলের মিলের জায়গা একটি। সেটা হলো, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগের নিষ্পত্তি ছাড়া দলটিকে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
রাজনীতি বিশ্লেষকেরা মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য পুনর্বাসন, নির্বাচনি অংশগ্রহণ ও ‘অন্তর্ভুক্তি’ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন বাস্তবতায় দলটির ভবিষ্যৎ, তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিচার, অতীতের রাজনৈতিক দায় এবং স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগÑ এই চার প্রশ্ন এখন এসে মিলেছে এক বিন্দুতে। একদিকে একটি মত হচ্ছে, আওয়ামী লীগের ভেতরে থাকা অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন ও তৃণমূলভিত্তিক রাজনীতিকদের জন্য কোনো না কোনোভাবে রাজনীতিতে ফেরার পথ খোলা রাখা উচিত। অন্যদিকে সমান জোরে উচ্চারিত হচ্ছে আশঙ্কাÑ এই সুযোগে বিগত সরকারের আমলে ক্ষমতার অপব্যবহার, দমন-পীড়ন, দুর্নীতি, দখলদারিত্ব ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত বিতর্কিত নেতারাও আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
এ কারণে স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের প্রশ্নটি এখন আর নিছক একটি নির্বাচনি সমীকরণের বিষয় নয়; বরং এটি পরিণত হয়েছে গণতান্ত্রিক উত্তরণ, জবাবদিহি, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক সংস্কারের বড় এক পরীক্ষায়। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিÑ তিন পক্ষই ভিন্ন ভাষায় একই ধরনের সতর্কতা উচ্চারণ করছে : অতীতের দায় নির্ধারণ ও রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া আওয়ামী লীগের স্বাভাবিক প্রত্যাবর্তনের পথ খুলে দেওয়া হলে তা নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
আইন ও রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আশিকুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো দায় নির্ধারণ ও দৃশ্যমান বিচার। যেসব অভিযোগ জনপরিসরে এসেছেÑ গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ভোটাধিকার হরণ, রাষ্ট্রীয় দমনÑ এসবের বিশ^াসযোগ্য বিচার ছাড়া কেবল রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা টেকসই সমাধান দিতে পারে না। আওয়ামী লীগ প্রশ্নে জনরোষকেই তিনি দীর্ঘমেয়াদি দমনমূলক শাসনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখেন।
শিক্ষাবিদ ড. রেজাউর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদ বা কর্তৃত্ববাদ কেবল একটি দলের সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রের সমস্যা। তার বিশ্লেষণী অবস্থান থেকে বোঝা যায়, আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে চাইলে শুধু রাজনৈতিক সেøাগান নয়, প্রশাসনিক দলীয়করণ, বিচারহীনতা, পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর অর্থনীতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের কাঠামোও ভাঙতে হবে। নইলে ব্যক্তি বা দল বদলালেও শাসনের চরিত্র বদলাবে না।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বরাবরই বলে আসছেন, রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিশোধের রাজনীতি এড়িয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। আওয়ামী লীগবিরোধী ক্ষোভ বাস্তব হলেও সেটিকে টেকসই গণতান্ত্রিক সমাধানে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত, স্বচ্ছ বিচার, নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। অন্যথায় নিষিদ্ধকরণ বা রাজনৈতিক প্রতিরোধের বাইরে গিয়ে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসবে না।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসন ঠেকাতে ভিন্ন সুরে হলেও এবার একই অবস্থান নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ দুই দলের নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গুম, খুন, দমন-পীড়ন, ভোটাধিকার হরণ, রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহার এবং জুলাই-অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত ঘটনার যে অভিযোগ জমা হয়েছে, তার বিচার ও দায় নির্ধারণের আগে দলটিকে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দেওয়া যাবে না। কেউ নতুন নামে, কেউ স্বতন্ত্র পরিচয়ে, কেউ সামাজিক-রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের আড়ালে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলারও ইঙ্গিত দিয়েছে দল দুটি।
আওয়ামী লীগকে ঘিরে এই নতুন রাজনৈতিক অবস্থান শুধু একটি দলকে নিষিদ্ধ রাখার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিচার, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, স্থানীয় নির্বাচনের সমীকরণ এবং জুলাই-পরবর্তী রাজনীতির ভবিষ্যৎ। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী স্থানীয় পর্যায়ে ‘স্বতন্ত্র’ পরিচয়ে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেনÑ এমন অভিযোগ সামনে আসার পর বিরোধিতা আরও তীব্র হয়েছে। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিÑ তিন পক্ষই এখন বিষয়টিকে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী দল ঠেকানোর কৌশল হিসেবে নয়, বরং পতিত শাসনের প্রত্যাবর্তন রোধের রাজনৈতিক লড়াই হিসেবে তুলে ধরছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটিকে দীর্ঘ সময় পুরোপুরি অকার্যকর ধরে নিয়ে স্থানীয় নির্বাচনের মাঠ সাজানো সহজ নয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেহেতু জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় অনেক বেশি তৃণমূলভিত্তিক, সেখানে দলীয় প্রতীকের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সামাজিক প্রভাব, স্থানীয় নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে কারণে আওয়ামী লীগের সঙ্গে অতীতে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু বিগত সময়ের দমন-পীড়ন, দুর্নীতি বা সহিংসতার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ননÑ এমন কিছু ব্যক্তি স্থানীয় পর্যায়ে আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
সমালোচকদের ভাষ্য, ‘সুস্থ ধারার’ রাজনীতিকদের ফেরার নামে যদি পুরো সাংগঠনিক কাঠামোর জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়, তাহলে তৃণমূলে সেই পুরোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী, পেশিশক্তিনির্ভর বলয়, দখলদার রাজনীতি এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক নেটওয়ার্ক আবার সক্রিয় হতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় বিগত সময়ে দলীয় ছত্রচ্ছায়ায় ভোটকেন্দ্র দখল, হামলা-মামলা, ভীতি প্রদর্শন, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রতিপক্ষকে দমনের অভিযোগ ছিল, সেখানে স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেই গোষ্ঠীগুলো পুনর্গঠনের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
একাধিক বিশ্লেষকের মতে, এই বিতর্কের সবচেয়ে জটিল দিক হচ্ছে ‘আওয়ামী লীগ’কে দল হিসেবে দেখা আর ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে অতীতে যুক্ত ব্যক্তি’কে আলাদা করে দেখা। দল হিসেবে তাদের রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় কতটা, তার পরিণতি কী হবেÑ এটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ; তেমনি সমান গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী নেতাকর্মীদের কীভাবে চিহ্নিত করা হবে এবং কারা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
তাদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর নেতারা মনে করেন, আওয়ামী লীগের পুনরাগমন প্রশ্নে আগে স্পষ্ট হতে হবে। অতীতের জন্য দলটির কোনো রাজনৈতিক দায় আছে কি না, থাকলে সেই দায় কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের কর্তৃত্ববাদী বা সহিংস রাজনীতি ঠেকাতে কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা তৈরি হবে। তাদের ভাষায়, ‘রিব্র্যান্ডিং’ আর ‘রিফর্ম’ এক জিনিস নয়; নতুন আঙ্গিকে পুরোনো রাজনীতির প্রত্যাবর্তন হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন বিতর্কে তুলনামূলকভাবে রাজনৈতিক সংস্কার ও নতুন বন্দোবস্তের প্রশ্ন সামনে আনছে। তারা আওয়ামী লীগের প্রশ্নটিকে কেবল একটি দলের ভবিষ্যৎ হিসেবে নয়, বরং পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ভাঙার প্রশ্ন হিসেবে দেখছে। ফলে স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যদি প্রশাসনিক সুবিধা, তৃণমূল নেটওয়ার্ক বা সামাজিক প্রভাবের জোরে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ বলয়গুলো আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্য সমতল প্রতিযোগিতার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেÑ এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছে তারা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, অতীতের ভুল স্বীকার না করে, দায়বদ্ধতার প্রশ্ন এড়িয়ে এবং ক্ষমা না চেয়ে রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। কোনো দল যদি সত্যিকার অর্থে নতুনভাবে রাজনীতিতে ফিরতে চায়, তাহলে তাদের বলতে হবেÑ অতীতে কোথায় ভুল হয়েছে, কারা দায়ী, ভুক্তভোগীদের প্রতি তাদের অবস্থান কী এবং ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কী সাংগঠনিক পরিবর্তন আনা হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বহু সময়েই জাতীয় রাজনীতির পূর্বাভাস হিসেবে কাজ করেছে। তৃণমূলের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংগঠন পুনর্গঠন, প্রভাব বিস্তার, অর্থবল ও পেশিশক্তি প্রদর্শনÑ সবকিছুরই অনুশীলন হয় এই পর্যায়ে। ফলে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন যদি স্থানীয় নির্বাচন দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়, তাহলে সেটি কেবল নির্বাচনি অংশগ্রহণের প্রশ্ন থাকবে না; বরং রাষ্ট্র কতটা ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারছে, তারও পরীক্ষা হয়ে উঠবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে, কীভাবে ‘রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার’ এবং ‘বিতর্কিত শক্তির পুনর্গঠন ঠেকানো’র মধ্যে ভারসাম্য রাখা যায়। কোনো ব্যক্তি যদি গুরুতর সহিংসতা, দখলদারিত্ব বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তাহলে তার প্রার্থিতা, প্রচার-তৎপরতা ও মাঠ পর্যায়ের প্রভাব কঠোরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, স্থানীয় নির্বাচন যেন কোনোভাবেই ‘পুরোনো প্রভাবশালী বলয়’-এর প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্র না হয়ে ওঠে।
স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিতর্ক যতই ঘনীভূত হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছেÑ এটি কেবল আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন নয়। এটি আসলে বাংলাদেশের রাজনীতি কোন পথে যাবে, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণের সম্পর্ক কীভাবে পুনর্নির্ধারিত হবে এবং সহিংস-দখলদার রাজনীতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুতÑ সেই বৃহত্তর প্রশ্নেরও মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে দেশকে।

