ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬

কার্নিশে ঝোলা তরুণকে গুলি

ডিএমপির সাবেক কমিশনার  হাবিবসহ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড 

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ২৯, ২০২৬, ০৫:৪৭ এএম

রক্তাক্ত জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি করার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির তখনকার কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশকে মৃত্যুদ- দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আসামি অপর দুই পুলিশের একজনের যাবজ্জীবন ও অপরজনের ২০ বছরের সাজা হয়েছে।

গতকাল রোববার এ মামলার রায় ঘোষণা করে বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেনÑ বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। সাবেক ডিএমপি কমিশনার ছাড়াও মৃত্যুদ-প্রাপ্ত অপর দুজন হলেনÑ ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক এডিসি রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মশিউর রহমান। একই থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার যাবজ্জীবন এবং রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে শুধু চঞ্চল চন্দ্র সরকার গ্রেপ্তার রয়েছেন। রায় ঘোষণার সময় তাকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে সাজা পরোয়ানা দিয়ে তাকে পাঠানো হয় কারাগারে। মামলায় গুলির ঘটনা ছাড়াও দুজনকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়।

প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি নির্দেশনায় এবং তখনকার ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের আদেশে আসামিরা নিজেদের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার বাইরে গিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ চালান। ওই বছরের ১৯ জুলাই দুপুর আনুমানিক ২টা থেকে আড়াইটার দিকে বনশ্রী এইচ ব্লকে জামে মসজিদের সামনের গলিতে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। তখন মো. নাদিম (৩৮) নামে এক ব্যক্তি পেটে দুটি গুলি লাগে এবং ঘটনাস্থলেই মারা যান।

দ্বিতীয় অভিযোগে কার্নিশে ঝুলে থাকা ১৮ বছরের তরুণ আমির হোসেনকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ও গুরুতর জখম করার ঘটনা বর্ণনা দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলি ও ধাওয়া খেয়ে বনশ্রী জামে মসজিদের পাশে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্মাণাধীন ভবনে আশ্রয় নেন আমির হোসেন। আত্মরক্ষায় তিনি ওই ভবনের তৃতীয় তলার ছাদ ঢালাইয়ের পাইপ ধরে ঝুলেছিলেন। সেখানে এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার ও এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া উপস্থিত হয়ে তাকে নিচে লাফ দিতে বলেন। ওই তরুণ লাফ না দেওয়ায় পর পর ছয়টি গুলি করা হয়। এতে তিনি গুরুতর জখম হন।

মামলার তৃতীয় অভিযোগে মায়া ইসলাম (৬০) নামে এক বৃদ্ধাকে গুলি করে হত্যা এবং তার ছয় বছরের নাতি বাসিত খান মুসাকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে বনশ্রী জি ব্লকে রামপুরা থানার সামনের একটি বাসার নিচতলায় গেটের ভেতরে দাদি-নাতি অবস্থান করছিলেন। আসামিরা যখন ক্রমাগত গুলি চালাচ্ছিল, তখন পুলিশের একটি বুলেট শিশু মুসার মাথা ভেদ করে বেরিয়ে যায় এবং তা সরাসরি তার দাদি মায়া ইসলামের পেটে বিদ্ধ হয়। আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মায়া ইসলাম মারা যান।

এ মামলায় গত বছরের ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। এরপর ৭ আগস্ট প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেন। পরবর্তী সময়ে ১৮ সেপ্টেম্বর পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচারকাজ শুরু হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও আইসিটি তদন্ত সংস্থার সহকারী পরিচালক সৈয়দ আব্দুর রউফ ৩০ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নিলেও ট্রাইব্যুনালে মামলা পরিচালনার জন্য প্রসিকিউশন ১৪ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর জবানবন্দি উপস্থাপন করে।

গত ৪ মার্চ এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করা হয়েছিল। তবে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে নতুন করে ‘ডিজিটাল অ্যাভিডেন্স’ জমা দেওয়ার আবেদন করা হলে তা পিছিয়ে যায়। গত ১৫ জুন রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রায়ের জন্য রোববার দিন ঠিক করে দেয়। কার্নিশে ঝোলা যুবক জবানবন্দিতে যা বলেছেনÑ ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম প্রসিকিউশনের পক্ষে সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন করেন। ওই দিনই মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালের এজলাসে দাঁড়িয়ে নিজের ওপর চলা ভয়াবহ নির্মমতার বর্ণনা দেন কার্নিশে ঝুলে থাকা গুলিবিদ্ধ যুবক আমির হোসেন।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, জুমার নামাজের পর আফতাবনগরে তার কর্মস্থল থেকে রামপুরায় ফুফুর বাসায় তিনি ফিরছিলেন। সে সময় পুলিশ ও বিজিবির গুলিবর্ষণের মুখে পড়েন। জীবন বাঁচাতে তিনি নির্মাণাধীন ভবনের চতুর্থ তলার ছাদে ওঠেন। তিনজন পুলিশ তাকে ধাওয়া করলে তিনি ছাদের রড ধরে ঝুলে পড়েন।

পুলিশের কথায় সেখান থেকে নিচে ঝাঁপ দিতে না চাইলে একজন পুলিশ সদস্য তাকে পরপর তিনটি গুলি করেন। আরেকজন পুলিশ সদস্য এসে আরও তিনটি গুলি করেন, যার সবগুলোই তার পায়ে বিদ্ধ হয়। রাজধানীর ফেমাস হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল, ফরাজী হাসপাতাল, টঙ্গী আহছানিয়া হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতাল হয়ে সাভারের সিআরপি পর্যন্ত তার চিকিৎসার বিবরণ ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন আমির হোসেন। ওই ঘটনায় দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি। সাক্ষ্যগ্রহণের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন গুলিবিদ্ধ শিশু বাসিত খান মুসার বাবা মো. মোস্তাফিজুর রহমান।

চোখের সামনে নিজের সন্তানের গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং মায়ের মৃত্যুর বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, তার ছেলে বেঁচে থাকলেও কথা বলার শক্তি হারিয়েছে, যা তাদের পরিবারের সব স্বপ্ন তছনছ করে দিয়েছে। এরপর ওই বছরের ৪ নভেম্বর জবানবন্দি দেন গণঅভ্যুত্থানের সময় রামপুরা থানায় দায়িত্বে থাকা এসআই মো. গোলাম কিবরিয়া খান। তিনি আদালতে বলেন, ভাইরাল ভিডিওতে নির্মাণাধীন ভবনের রড ধরে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি করা এসআই তারিকুল ও এএসআই চঞ্চলকে রামপুরা থানায় এক সভায় শনাক্ত করা হয়েছিল।

তরুণ আমির হোসেনকে গুলির ঘটনার আগের দিন ১৮ জুলাই তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান আন্দোলন দমনে হাঁটু গেড়ে বসে চাইনিজ রাইফেল দিয়ে গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ২১ বা ২২ জুলাই রামপুরা থানায় এসে মামলার আসামি ওসি মশিউর রহমানকে নগদ ১ লাখ টাকা পুরস্কারও দিয়েছিলেন। তবে মামলার ৫ নম্বর সাক্ষী এসআই গোলাম কিবরিয়ার বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের কাছে প্রশ্ন তোলেন যে, ঘটনার দিন এই পুলিশ কর্মকর্তার নামে সরকারি অস্ত্র ও গুলি বরাদ্দ থাকার পরও তাকে কেন আসামির তালিকায় না রেখে সাক্ষী করা হলো। রামপুরা থানার এক জিডিতেও কিবরিয়ার নামে গুলি বরাদ্দ ও গুলি করার বিষয়ে বলা হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এ বিষয়ে সম্প্রতি বলেছিলেন, আমার দায়িত্বভার নেওয়ার অনেক আগেই এ মামলার সাক্ষীর কার্যক্রম শেষ হয়েছিল। নিজেও দেখেছি যে, গোলাম কিবরিয়া নামে একজন সাক্ষী, তিনি পুলিশ কর্মকর্তা। ঘটনার দিন তার নামে অস্ত্র ও গোলাবারুদ ইস্যু করা হয়েছিল। সেখানে তাকে সাক্ষী করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। যদি তিনি (গোলাম কিবরিয়া) অপরাধ না করে থাকেন, তাহলে সংগত কারণেই আসামি হবেন না। তবে অপরাধ বা অংশগ্রহণ করে থাকলে যদি সাক্ষী করা হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টা আমরা খতিয়ে দেখব বলে ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছি।

চিফ প্রসিকিউটর বলেছিলেন, শুধু সাক্ষ্য দেওয়ার অজুহাতে তিনি দায় থেকে মুক্তি পেতে পারেন না। গোলাম কিবরিয়ার অপরাধসংক্রান্ত কোনো সম্পৃক্ততা থাকলে অবশ্যই বিচারের সম্মুখীন করা হবে। আমাদের এমন সুযোগ রয়েছে।”

১৪ জনের সাক্ষ্য : মামলার নথি অনুযায়ী, প্রসিকিউশন ১৪ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর জবানবন্দি উপস্থাপন করে, তার মধ্যে রয়েছেন কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণ আমির হোসেন, নিহত মায়া ইসলামের ছেলে ও গুলিবিদ্ধ মুসার বাবা মো. মোস্তাফিজুর রহমান, নিহত নাদিম মিজানের স্ত্রী তাবাসুম আক্তার নিহা।

এ ছাড়া প্রত্যক্ষদর্শী ইয়াকুব, রামপুরা থানার এসআই গোলাম কিবরিয়া, ট্রাইব্যুনালের লাইব্রেরিয়ান কনস্টেবল আবু বক্কর সিদ্দিক, ডিএমপি কন্ট্রোলরুমের ওয়্যারলেস অপারেটর এএসআই কামরুল হাসান, রামপুরা থানার বেতারচালক মো. আ. রহমান, তদন্ত সংস্থার ফিল্ড অফিসার এএসআই বায়েজীত খান, রামপুরা থানার ডিউটি অফিসার এসআই মো. শাহিন মিয়া, স্টাফ নার্স লিংকন মাঝি, মো. রুকুনুজ্জামান, ইফতেখার আলম এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সৈয়দ আব্দুর রউফও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।