রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।’ রাষ্ট্রের জীবনেও সত্য কঠিন। তবে সেই সত্য সব সময় দৃশ্যমান নয়। কখনো তা রাষ্ট্রনায়কের ভাষণে উচ্চারিত হয় না, সংবাদ সম্মেলনের মাইক্রোফোনেও ধরা পড়ে না। অনেক সময় সত্য আশ্রয় নেয় করমর্দনের স্থায়িত্বে, যৌথ বিবৃতির শব্দচয়নে কিংবা একটি সফরের সময় নির্বাচনে। ইতিহাসের পাতায় যে ঘটনাগুলো পরে বড় হয়ে ওঠে, সেগুলোর অধিকাংশই জন্ম নেয় নীরবে। আবার, ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো বলেছিলেন, ক্ষমতা তখনই সবচাইতে বেশি কার্যকর হয়, যখন তা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান থাকে।
কূটনীতির ক্ষেত্রেও কথাটি কম সত্য নয়। রাষ্ট্রের প্রকৃত বার্তা অনেক সময় উচ্চারিত বাক্যে নয়, বরং কোন রাষ্ট্র কার দিকে এগোচ্ছে, কে কার সঙ্গে বসছে, কে কখন নীরব থাকছেÑ সেই অদৃশ্য বিন্যাসে লুকিয়ে থাকে। দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ যেন ঠিক এমনই এক নীরব ভাষায় লেখা হচ্ছে।
প্রথমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর। বেইজিংয়ে অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, কৃষি, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা। এরপর খুব বেশি সময় না যেতেই নয়াদিল্লিতে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সফর। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তির শীর্ষ কূটনীতিকেরা দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা নিয়ে আলোচনায় বসলেন। আর ঠিক সেই ধারাবাহিকতার মধ্যেই ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা আরেক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে।
এই তিন ঘটনা কি পরস্পর সম্পর্কহীন? হতেও পারে, আবার হয়তো বা না। আবার সময়ের বিচারে এগুলো কি একই ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের তিনটি আলাদা প্রকাশ বলে ধরে নেওয়া যায়? সেই সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কাকতালীয় ঘটনা থাকে; কিন্তু কৌশলগত সময় নির্বাচনও থাকে।
ইতিহাসের একটি অদ্ভুত স্বভাব আছে। ঘটনার সময় সে খুব কমই নিজের ব্যাখ্যা দেয়। উত্তর দেয় অনেক পরে। যখন ধুলো বসে যায়, যখন নতুন মানচিত্র আঁকা হয়, যখন ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যায়, তখন ইতিহাস ফিরে তাকিয়ে বলে কোন ঘটনাটি ছিল মোড় ঘোরানোর সূচনা।
বাতাসে এখন অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। বাংলাদেশকে ঘিরে বর্তমান সময়ও কি তেমন কোনো মুহূর্ত? প্রশ্নটি অমূলক নয়।
একসময় বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে দেখা হতো ভারতের প্রতিবেশী হিসেবে। আজ সেই পরিচয় অনেক বড় হয়েছে। বঙ্গোপসাগর এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যপথের অংশ। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল আন্তর্জাতিক শক্তির অন্যতম অগ্রাধিকার। জ¦ালানি নিরাপত্তা, সমুদ্রবন্দর, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং আঞ্চলিক সংযোগÑ সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এমন এক ভূখ-, যার দিকে একসঙ্গে তাকিয়ে আছে বেইজিং, দিল্লি, ওয়াশিংটন, টোকিও ও ব্রাসেলস।
চীনের কাছে বাংলাদেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ভারতের কাছে এটি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংযোগের অপরিহার্য বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। জাপানের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্র। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে উৎপাদন ও বাণিজ্যের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অংশীদার।
অর্থাৎ, ঢাকা এখন শুধু একটি রাজধানী নয়; এটি একটি কৌশলগত কেন্দ্র। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরকে শুধু দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে দেখার সুযোগ খুব সীমিত। বাংলাদেশ যখন চীনের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের বার্তা দেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই বার্তা দিল্লিতেও পৌঁছে যায়। আর যখন তার কিছুদিন পরই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফর করেন, তখন ঘটনা দুটিকে অন্তত একই আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে পড়ার চেষ্টা করাই স্বাভাবিক।
তারপর আসা যাক শেখ হাসিনার ঘোষণায়। রাজনীতিতে ঘোষণা নতুন কিছু নয়। প্রত্যাবর্তনের আশ^াসও নতুন নয়। কিন্তু ঘোষণার সময় কখনো কখনো ঘোষণার বিষয়বস্তুর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যখন তা এমন এক সময়ে আসে, যখন আঞ্চলিক কূটনীতি দ্রুত পুনর্বিন্যস্ত হচ্ছে। এ কারণেই আজ বাতাসে এত প্রশ্নের জন্ম। এই আত্মবিশ্বাস কি কেবল একজন রাজনীতিকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মূল্যায়ন? নাকি তিনি এমন কোনো পরিবর্তিত কূটনৈতিক পরিবেশের ইঙ্গিত অনুভব করছেন, যা এখনো জনসমক্ষে স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি? নাকি পুরোটাই ফাঁকা আওয়াজ? এর কোনো নিশ্চিত উত্তর আজ নেই। এবং সত্যি বলতে, প্রমাণ ছাড়া এমন উত্তর দেওয়াও উচিত নয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করলে তারাও পুরোপুরি ফাঁকা আওয়াজ বলে উড়িয়ে দিতে চান না। আবার গভীরভাবে গ্রহণ করতেও রাজি নন। ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা অন্তত পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। তবে এটাও ঠিক যে, এখন পর্যন্ত এমন কোনো সরকারি দলিল, কূটনৈতিক বার্তা কিংবা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রকাশিত পায়নি, যা এই তিন ঘটনাকে একটি অভিন্ন কৌশলের অংশ হিসেবে প্রমাণ করে। সত্য যে, বাতাস প্রশ্ন তুলতে পারে, ইঙ্গিত বিশ্লেষণ করতে পারে, সময়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রবণতা শনাক্ত করতে পারে; কিন্তু প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে পারে না।
তবু একটি সত্য ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ আর অন্যের কূটনীতির প্রান্তিক চরিত্র নয়, বরং এখন বাংলাদেশকে ঘিরেই অনেক হিসাব-নিকাশ লেখা হচ্ছে। ফলে ঢাকার একটি সফর, দিল্লির একটি বৈঠক কিংবা একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একটি সাক্ষাৎকারÑ সবকিছুই বৃহত্তর আঞ্চলিক সমীকরণের আলোয় নতুন অর্থ পায়।
জার্মান দার্শনিক হেগেল লিখেছেন, ইতিহাসের একটি শিক্ষা আছে। সেটি হলো, যে সময়কে আমরা সাধারণ মনে করি, ইতিহাস অনেক সময় সেই সময়কেই অসাধারণ বলে ঘোষণা করে।
আজ হয়তো আমরা কেবল তিনটি আলাদা সংবাদ দেখছি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর, ওয়াং ই-এর ভারত সফর এবং শেখ হাসিনার ঘোষণা। কয়েক বছর পর হয়তো ইতিহাস বলবে, এগুলো ছিল একই সময়ের তিনটি ভিন্ন বাক্য; একটি পরিবর্তনশীল দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি নীরব সংকেত। কারণ ইতিহাস কখনো হঠাৎ সৃষ্টি হয় না। ইতিহাস প্রথমে ইঙ্গিত পাঠায়, তারপর ঘটনা ঘটে, শেষে মানুষ তার অর্থ খুঁজে পায়। সময়ের কাছে মানুষের অনেক প্রশ্ন থাকে; ইতিহাসের কাছে থাকে তার চেয়েও বেশি।

