ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই, ২০২৬

আস্থার সংকটে বিদেশমুখী রোগী

স্বপ্না চক্রবর্তী
প্রকাশিত: জুলাই ৩, ২০২৬, ১২:০৭ এএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেশজুড়ে তৈরি হয় একের পর এক হাসপাতাল, অবকাঠামোগতভাবে যা বিশ্বমানের। টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে দেওয়া হয় ২০টি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন। যেগুলোর বেশির ভাগই অবকাঠামোগতভাবে মানসম্মত। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র শাহবাগেই গড়ে তোলা হয় সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল। এত উদ্যোগের পরও দেশের রোগী ও তাদের স্বজনেরা ঝুঁকছেন বিদেশে চিকিৎসায়। এতে একদিকে যেমন দেশের চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তেমনি প্রতি বছর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিদেশে চলে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।

কেন এই সংকট? এর পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসে বিভিন্ন তথ্য। এর মধ্যে অন্যতম হলো, দেশে চিকিৎসাব্যয় বিদেশের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রেই বহুগুণ বেশি। এ ছাড়া ভুল ডায়াগনসিস ও চিকিৎসায় রোগীদের ভোগান্তি না কমে বরং বাড়ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসক ও সেবাসংশ্লিষ্টদের দুর্ব্যবহার রোগী ও তাদের স্বজনদের বিদেশমুখী করছে।

আওয়ামী আমলে দেশের জনগণের একটি বড় অংশ চিকিৎসার জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারতমুখী হয়; বিশেষত যারা মধ্যবিত্ত ও কম আয়ের মানুষ। এ ছাড়া যারা ধনী বা উচ্চ মধ্যবিত্ত, তারা বেছে নেন থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রদানে কড়াকড়ি আরোপ করে ভারত। এরপর কার্যত দেশটির ভিসা প্রদান বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ ক্ষেত্রে স্বল্প পরিসরে চিকিৎসা ও শিক্ষা ভিসা চালু রাখে দেশটি। এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জানানো হয়, কেউ চাইলে চীনে উন্নত চিকিৎসার্থে সহজেই যেতে পারেন। কিন্তু তাতেও খুব একটা চিড়ে ভেজেনি। দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে আস্থাহীনতার মধ্যেই কাটছিল দেশের মানুষের দিন। এরপর নির্বাচিত সরকারের সময়ে সম্প্রতি আবারও ভারতীয় ভিসা উন্মুক্ত করা হয়েছে। এরপর থেকেই ভারতীয় ভিসা সেন্টারে লক্ষ করা যাচ্ছে চিকিৎসার্থে ভারতে যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের দীর্ঘ লাইন।

এমন চিত্র দেশের জন্য কখনোই ইতিবাচক নয় বলে মনে করেন স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবস্থার উত্তরণে অবকাঠামো উন্নয়ন বা অতিরিক্ত চিকিৎসক নিয়োগ নয়, চিকিৎসাসেবার মান বাড়ানো জরুরি। বর্তমান নির্বাচিত সরকারেরও উচিত সেই উদ্যোগ গ্রহণ করা। কারণ দেশের চিকিৎসাসেবা উন্নত ও মানবিক হলেই আস্থা ফিরবে দেশের মানুষের। এর ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাওয়া বন্ধ হবে।

দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ভারতের ভিসা চালুর দিন থেকেই রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতীয় ভিসা সেন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইন। সেখানে কয়েকজন ভিসাপ্রার্থী জানান, ট্যুরিস্ট বা মেডিকেল ভিসা, যেটাই পান না কেন, তারা ভারতে যেতে চান মূলত চিকিৎসার জন্য। এ সময় দেশের অনেক চিকিৎসক রোগীদের সঙ্গে আন্তরিক ব্যবহার করেন না বলে অভিযোগ করেন সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলা থেকে আসা মুজিবার রহমান।

লাইনে দাঁড়ানো অপর ভিসাপ্রত্যাশী বগুড়ার শিবগঞ্জের স্বরূপ মন্ডল বলেন, আমার স্ত্রী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ভারতের ব্যাঙ্গালুরুতে তার অপারেশন হয় দুই বছর আগে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে ভারতের ভিসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অপারেশন-পরবর্তী চিকিৎসা পেতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি ক্যানসার হাসপাতালে কেমোথেরাপি নিতে গিয়ে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। একসময় বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে কেমোথেরাপি দিতে গিয়ে জমি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। তিনি বলেন, বাকি চিকিৎসা ভারতেই করাতে চাই। এ ছাড়া অনেকে ভারতের ভিসা পেতে উচ্চপর্যায়ে তদবির করছেন বলেও জানা গেছে।

তবে কি দেশে পর্যাপ্ত হাসপাতাল নেই? স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অবশ্য তেমনটা বলছে না। অধিদপ্তরের তথ্যমতে, শুধু রাজধানীতেই রয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল), জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটট ও হাসপাতালসহ ১০ থেকে ১৫টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতাল। এর বাইরেও দেশজুড়ে মোট নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে ১৩ হাজার ৬১১টি। এ ছাড়া পুনর্নবায়নের জন্য আবেদন করেছে আরও ২২ হাজার ৪৭২টি হাসপাতাল।

কিন্তু রোগীদের অভিযোগ, অনেক হাসপাতালেই নেই পর্যাপ্ত দক্ষ চিকিৎসক ও উন্নতমানের চিকিৎসা যন্ত্রপাতি। অনেক হাসপাতালে করা হয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচারও। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে অনীহা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ সামনে আসে, যার খেসারত দিতে হয় রোগীদের। এমনকি কাউকে কাউকে জীবনও খোয়াতে হয়। এসব অভিযোগকে দেশের চিকিৎসা খাতের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমসিএ) ও বাংলাদেশ সোসাইটি অব প্রাইভেট হসপিটালস এক গবেষণার ভিত্তিতে জানায়, দেশে গড়ে প্রতি বছর ৫ লাখ মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যায়। এ কারণে প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। এর বড় অংশ যায় ভারতে।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা এক গবেষণায় দেখেছি, যেসব মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে দেশের বাইরে গেছেন, তাদের শুধু চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ ছাড়া প্রত্যেক রোগীর ভ্রমণ, থাকা, খাওয়া ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ও রয়েছে। এর মূল কারণ আস্থার সংকট। আমাদের চিকিৎসকেরা বিশ্বের অন্যান্য দেশের চিকিৎসকদের মতোই দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে তাদের আচরণ ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মানের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না রোগীরা। ফলে তারা বিদেশে যাচ্ছেন। বাংলাদেশি রোগীরা বর্তমানে ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের আয়ের বড় উৎস হয়ে উঠেছেন। অথচ এই অর্থ আমাদের দেশেই থাকার কথা ছিল।

চিকিৎসাসেবার মান, রোগীদের অভিযোগ এবং বিদেশমুখিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, পরিস্থিতি এখন অনেকটাই পাল্টেছে। আমাদের চিকিৎসকেরা আগের তুলনায় বেশি করে সময় দিচ্ছেন রোগীদের। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চিকিৎসা খাত নিয়ে যতটা কাজ করেছে, আর কোনো খাতে এতটা কাজ হয়নি। চিকিৎসাসেবা নির্বিঘ্ন করতে এই খাতে আরও ১ লাখ ডাক্তার-নার্সসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে রাতারাতি তো আর একটা বড় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে শৃঙ্খলায় ফেরানো সম্ভব নয়। এজন্য সময় প্রয়োজন এবং সরকার সে ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক। এখন সাধারণ মানুষকেও আন্তরিক হতে হবে। তারা কেন দেশের টাকা খরচ করে বিদেশে যাচ্ছেন, সেটা গবেষণা করে দেখতে হবে। তবে পরিবর্তন অবশ্যই আসবে।

সম্প্রতি ‘কি রিজনস ফর মেডিকেল ট্রাভেল ফ্রম বাংলাদেশ টু ইন্ডিয়া’ শীর্ষক এক গবেষণার তথ্যে দেখা গেছে, ব্যবসায়ী, বেসরকারি চাকরিজীবী, ছাত্র-শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা ও শ্রমিকেরা বেশি যাচ্ছেন ভারতে। এই মানুষদের বেশির ভাগই বলেন, চিকিৎসা ও নার্সিং সেবা ভালো পান বলে সেখানে যান তারা। দেশে কেন চিকিৎসা করাচ্ছেন না- এমন প্রশ্নে তারা বলেন, আস্থা কম পান। কারণগুলোর মধ্যে এর পরই আছে অপর্যাপ্ত হাসপাতাল, রোগীর নিরাপত্তা এবং সবার পরে খরচের বিষয়টি।

দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় এত আধুনিকায়নের পরও কেন দেশের রোগীরা বিদেশে যাচ্ছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দীর্ঘ সময় একটি সরকার নয়, বরং গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে ছিল স্বাস্থ্যব্যবস্থা। তারা নিজেদের স্বার্থে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করেছেন ঠিকই। কিন্তু চিকিৎসার মানোন্নয়নে কোনো কাজ করেননি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কী হয়েছে তা তো আপনারা জানেনই। আমরা দায়িত্বে এসেই এসব বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেছি। মূলকথা হলো, মানুষের আস্থা ফেরাতে হবে। বাকিটা সময়ে সময়ে তৈরি হয়েই যাবে।

গত কয়েক বছরে দেশের বেসরকারি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে জানিয়ে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমসিএ) সদস্য ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী বলেন, বাংলাদেশেই বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা সম্ভব। লিভার প্রতিস্থাপনের মতো জটিল সেবাও শুরু হয়েছে। শুধু বেসরকারি হাসপাতালেই শয্যাসংখ্যা ১ লাখের বেশি। তার পরও রোগীদের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে যাচ্ছেন চিকিৎসার জন্য। ভিআইপি থেকে শুরু করে সাধারণ মধ্যবিত্ত পর্যন্ত একটু সুস্থতার আশায় বিদেশে যাচ্ছেন। অনেকে বসতবাড়ি, জমি, গয়না বিক্রি করেও যাচ্ছেন। কিন্তু কোনোভাবে তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে দেশের অনেক টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও কাজ করতে হবে বলে মনে করেন ডা. আশীষ।