নাফ নদীর ওপারে আবারও বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা। টানা প্রায় সাত মাসের নীরবতা ভেঙে আবারও উত্তপ্ত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। গত বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কয়েক দফা মর্টারশেল বিস্ফোরণ ও বিমান হামলার বিকট শব্দে কেঁপে উঠেছে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত। জাদিমুড়া থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ জনপদের মানুষ নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন আতঙ্কে। দীর্ঘ বিরতির পর রাখাইনে কেন আবারও সংঘাত তীব্র হয়ে উঠল? আর এর প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা পরিস্থিতি ও স্থানীয় জনজীবনে কতটা পড়তে পারে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত সাড়ে ৯টার পর মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে চার দফা ভারী মর্টারশেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এর আগে দিনের বেলায়ও মিয়ানমারের মংডু এলাকায় বিমান থেকে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে হোয়াইক্যং ও হ্নীলা সীমান্তসংলগ্ন বলিবাজার ও কুমিরখালী এলাকাতেও নতুন করে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।
টেকনাফ পৌরসভার জালিয়াপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন পর এমন বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনে প্রথমে তার মনে হয়েছিল ভূমিকম্প হচ্ছে। শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা সানা উল্লাহ জানান, বিস্ফোরণের তীব্রতায় ঘরের ভেতরেও নিরাপদ মনে হচ্ছিল না। নারী ও শিশুরা রীতিমতো আতঙ্কগ্রস্ত ছিলেন। সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবুল ফয়েজ বলেন, নতুন করে সংঘর্ষ শুরুর পর সীমান্ত এলাকার মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত বছরের ডিসেম্বরে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি মংডু শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন প্রায় ২৭০ কিলোমিটার এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এরপর সীমান্তে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের ঘটনা অনেকটাই কমে আসে। তবে সম্প্রতি হারানো অবস্থান পুনর্দখলের লক্ষ্যে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী আবারও বিমান হামলা ও ভারী অস্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়েছে বলে সীমান্ত সূত্রগুলোর ধারণা। সেই ধারাবাহিকতায় আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাখাইনের রণাঙ্গন।
বিজিবি সূত্র জানায়, শাহপরীর দ্বীপ সীমান্ত থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সংঘর্ষ চলছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, বিস্ফোরণের শব্দ বাংলাদেশের সীমান্তে শোনা গেলেও এখন পর্যন্ত দেশের ভেতরে কোনো মর্টারশেল বা গোলা এসে পড়ার ঘটনা ঘটেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, রাখাইনের সংঘাত আবার দীর্ঘায়িত হলে এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সংকটে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হলে নতুন করে সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা বাড়তে পারে। পাশাপাশি অস্ত্র ও মাদক পাচার, মানবপাচার এবং সীমান্তে অনুপ্রবেশের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।
উখিয়া-টেকনাফের আশ্রয়শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মংডুর রোহিঙ্গাদের নিয়মিত যোগাযোগ থাকায় ওপারের পরিস্থিতি দ্রুত এপারে ছড়িয়ে পড়ছে। এর আগে আরাকান আর্মি ও বিভিন্ন রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষ রাখাইনের মানবিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল।
এই প্রেক্ষাপটে নাফ নদী ও স্থল সীমান্তে বিজিবি এবং কোস্টগার্ড টহল জোরদার করেছে। সরকারও আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে জানিয়েছে, নতুন করে মিয়ানমার থেকে কাউকে শরণার্থী হিসেবে গ্রহণ করা হবে না।
গত বছরের ২৮ ডিসেম্বরও জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘর্ষে উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত প্রকম্পিত হয়েছিল। ওইদিনও রাখাইনে বিমান হামলা চালানো হয়। গত কয়েক বছরে একই চিত্র বারবার ফিরে এসেছে। ওপারে সংঘর্ষ শুরু হলেই এপারে উদ্বেগ বাড়ে, সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার হয়, তারপর কিছুদিনের জন্য পরিস্থিতি শান্ত হয়। কিন্তু স্থায়ী সমাধান আর আসে না।
প্রশাসন সীমান্তবাসীকে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানালেও বাস্তবতা হলো, রাখাইনের সংঘাত যতদিন রাজনৈতিক সমাধানের মুখ দেখবে না, ততদিন নাফ নদীর এপারের মানুষের জীবনও অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠার মধ্যেই থাকবে। প্রতিবেশী দেশের প্রতিটি বিস্ফোরণের শব্দ তখন শুধু সীমান্ত নয়, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও মানবিক চ্যালেঞ্জেরও নতুন বার্তা হয়ে ফিরে আসবে।
বিজিবি রামু সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সীমান্তের ওপারে বিস্ফোরণের শব্দে সাময়িক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে টেকনাফ সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। সীমান্তে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে প্রস্তুত রয়েছে।

