ঢাকা রবিবার, ০৫ জুলাই, ২০২৬

খামেনির শেষ বিদায়ে জনসমুদ্র

আরিয়ান স্ট্যালিন
প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২৬, ০৬:১৭ এএম

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া গতকাল শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সকে কেন্দ্র করে লাখো মানুষের সমাগমে সৃষ্টি হয়েছে এক অভূতপূর্ব শোকাবহ পরিবেশ। ছয় দিনব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান শেষে আগামী ৯ জুলাই তার জন্মস্থান মাশহাদে দাফন করা হবে। এর আগে তেহরান, কোম এবং ইরাকের নাজাফ, কারবালায়ও বিভিন্ন পর্বের শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।

ভোর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের ঢল নামে গ্র্যান্ড মোসাল্লার দিকে। বহু মানুষ কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান। তেহরানের বিভিন্ন মেট্রো স্টেশন ও প্রধান সড়কে দীর্ঘ সারি দেখা যায়। বিপুল জনসমাগমের কারণে রাজধানীজুড়ে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল সীমিত করা হয় এবং বহু এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়।

রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে প্রচারিত দৃশ্যে দেখা যায়, কাচঘেরা বিশেষ স্থাপনায় ইরানের পতাকায় মোড়ানো খামেনির কফিন রাখা হয়েছে। একই হামলায় নিহত তার পরিবারের সদস্যদের কফিনও পাশাপাশি রাখা হয়। হাজারো মানুষ অশ্রুসিক্ত চোখে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শোকাহত মানুষের অধিকাংশই ছিলেন কালো পোশাক পরিহিত। তাদের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা, লাল পতাকা এবং শহিদদের প্রতিকৃতি। শিয়া ঐতিহ্যে লাল পতাকা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।

পুরো অনুষ্ঠানে সমবেত মানুষের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগান। অনেকেই বুক চাপড়ে শোক প্রকাশ করেন, যা শিয়া মুসলিমদের প্রচলিত শোকরীতির অংশ। একাধিক শোকগাথা পাঠে খামেনির রক্ত বৃথা যেতে না দেওয়ার অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়। উপস্থিত অনেকেই বলেন, তারা কেবল একজন নেতাকে বিদায় জানাতে নয়, বরং তার আদর্শ রক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করতেই সেখানে এসেছেন।

এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় শুধু আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকেই নয়, তার সঙ্গে নিহত পরিবারের সদস্যদেরও স্মরণ করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন তার কন্যা, জামাতা, নাতনি এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য। একই হামলায় নিহতদের জন্য পৃথক দোয়া ও স্মরণানুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছে।

খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণকারী মোজতবা খামেনি জনসমক্ষে উপস্থিত হবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তিনি আহত হয়েছেন এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রকাশ্যে আসছেন না। তবে তার ছবি বহন করতে দেখা গেছে বহু শোকাহত মানুষকে।

রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান ঘিরে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছে। দেশটির যৌথ সামরিক কমান্ড যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে নতুন কোনো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তাদের ভাষ্য, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন আগ্রাসন হলে তার জবাব হবে কঠোর ও ব্যাপক।

খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল তেহরানে উপস্থিত হয়েছে। প্রতিবেশী ইরাকের রাষ্ট্রপতি ও পার্লামেন্টের স্পিকার, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান ও সিনেট চেয়ারম্যান, আফগানিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এবং তুরস্কের উপরাষ্ট্রপতি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন।

উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যেও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা গেছে। সৌদি আরবের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানের প্রেসিডেন্টের কাছে শোকবার্তা পৌঁছে দেন। কাতার, ওমান, ইয়েমেন, মিশরের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। পাশাপাশি রাশিয়া, চীন, ভারত, বাংলাদেশ, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, সার্বিয়া, বেলারুশ, জর্জিয়া, নামিবিয়া, কঙ্গো, নিকারাগুয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকার শোকানুষ্ঠানে অংশ নেন।

এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি রাজনৈতিক ও প্রতিরোধমুখী সংগঠনের প্রতিনিধিরাও তেহরানে উপস্থিত হয়েছেন। এতে স্পষ্ট হয়েছে, খামেনির শেষযাত্রা শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রীয় আয়োজন নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

তবে সব দেশ এই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি। ইরানি সূত্রের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপের কারণে অন্তত ১৩টি দেশ শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে প্রতিনিধি পাঠানো থেকে বিরত থাকে। যদিও শতাধিক দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত হওয়ায় সেই চাপ খুব বেশি কার্যকর হয়নি বলে তেহরানের ধারণা।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে তিনি দাবি করেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় আগ্রহী এবং মানবিক কারণেই তাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য সময় দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিনি বলেন, ভবিষ্যতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে ইরান যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করতে পারে।

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে তেহরান। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, অন্য দেশের জনগণকে খাদ্যসংকটে আছে বলে উপহাস করার আগে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের দারিদ্র্য ও খাদ্য সহায়তার বাস্তবতা নিয়ে ভাবা উচিত। তিনি বলেন, ইরানের সম্পদ ও সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে ইরানের জনগণের।

বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শুধু একজন দীর্ঘদিনের শাসকের বিদায় নয়; এটি ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। প্রায় চার দশক ধরে দেশটির নীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং আঞ্চলিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুর পর নতুন নেতৃত্বের অধীনে প্রথম বড় রাষ্ট্রীয় আয়োজন হওয়ায় এই অনুষ্ঠান দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, শোকানুষ্ঠানের প্রতিটি পর্বে প্রতিরোধ, আত্মত্যাগ এবং জাতীয় ঐক্যের বার্তা তুলে ধরার চেষ্টা করছে ইরান। বিশেষ করে মহররম মাসে এই আয়োজন অনুষ্ঠিত হওয়ায় তা ধর্মীয় প্রতীকী গুরুত্বও বহন করছে। শিয়া ঐতিহ্যে কারবালার স্মৃতি এবং শহিদ ইমাম হোসাইনের আত্মত্যাগের সঙ্গে এই শোকানুষ্ঠানের নানা প্রতীক ও ভাষার মিল লক্ষ করা যাচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এত বড় জনসমাগমকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় ইরান নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। অতীতের বড় রাষ্ট্রীয় জানাজাগুলোতে পদদলিত হয়ে প্রাণহানির অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এবার জনসমাগম নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

আগামী কয়েক দিনে তেহরান থেকে কোম, এরপর ইরাকের নাজাফ ও কারবালা হয়ে খামেনির মরদেহ মাশহাদে নেওয়া হবে। সেখানে ইমাম রেজার মাজারের কাছে তাকে দাফন করা হবে। এই দীর্ঘ রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান শুধু একজন নেতার বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং ইরানের রাজনৈতিক ঐক্য, আঞ্চলিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় পথচলার প্রতীকী ঘোষণা হিসেবেও বিশ্বজুড়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।