ঢাকা রবিবার, ০৫ জুলাই, ২০২৬

টেবিলের ফাইলে বন্দি হাজারো মানুষের সুস্থতার স্বপ্ন

সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২৬, ০৭:৫২ এএম

প্রতিশ্রুতি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালকে জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তরের উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে রয়েছে প্রকল্পটি। এতে স্থানীয় বাসিন্দা এবং রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।

স্থানীয়রা জানান, রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল রেলপথ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়। তবে এক বছর পার হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ১৮৭২ সালে নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৮২ শয্যার এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। একসময় এটি রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও যাত্রীদের চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসাস্থল ছিল। বর্তমানে চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় জনবলের সংকটে হাসপাতালটির কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

সূত্র জানায়, অনুমোদিত চিকিৎসকের পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র একজন চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন। একই সঙ্গে নার্স ও টেকনিশিয়ানের অধিকাংশ পদ শূন্য থাকায় কোটি টাকার এক্স-রে ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় রয়েছে। ২০২০ সালে চিকিৎসক ও কারিগরি পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত হওয়ার পর থেকেই হাসপাতালটির সেবাকর্ম ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসে। ফলে দেশের বৃহত্তম ও প্রাচীন সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার প্রায় ৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

অচলাবস্থা কাটাতে হাসপাতালটি যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। পরে অর্থ বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগ ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ত্রিপক্ষীয় সভাও অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন। প্রায় ৬৮ লাখ টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো সংস্কারকাজও সম্পন্ন হয়। তবে এর পরও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা থাকলেও প্রস্তাবটি এখনো বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের টেবিলে ঘুরছে। সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের কারখানা শাখার সাধারণ সম্পাদক শেখ রোবায়েতুর রহমান বলেন, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিকিৎসার জন্য রংপুর বা দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে তাদের চিকিৎসা ব্যয় ও ভোগান্তি দুটোই বেড়েছে।

সৈয়দপুর সাংগঠনিক জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহিন আক্তার বলেন, এ অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে হাসপাতালটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তর করা জরুরি। পরিদর্শন ও প্রতিশ্রুতির পরও যদি বছরের পর বছর প্রকল্পটি কাগজে-কলমেই আটকে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি দ্রুত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে হাসপাতালটি সবার জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানান।

এ বিষয়ে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. আনিছুল হক বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রেলওয়ের চারটি হাসপাতাল সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর রেলওয়ে হাসপাতাল জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তর করা হয়েছে। সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালের বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং অনুমোদনের জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে ফাইল পাঠানো হয়েছে। দ্রুতই কার্যকর অগ্রগতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম বলেন, বিষয়টি তিনি ইতোমধ্যে সংসদে উত্থাপন করেছেন। প্রকল্পটির সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।