রাজধানীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অত্যাধুনিক স্থাপনাবেষ্টিত এলাকা গুলশান-বনানী। দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, কূটনীতিক, বহুজাতিক কোম্পানির কর্মকর্তা, বিদেশি মিশন এবং ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতির কারণে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে। গত কয়েক বছরে এই এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর সিসিটিভি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) নজরদারি অবকাঠামো। তবে এই নজরদারি এখনো গণঅভ্যুত্থানে পলাতক আওয়ামী লীগ সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ক্ষমতার অপব্যবহারকারী প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের নিয়োজিত লোকদের হাতেই রয়েছে। সর্বনি¤œ দর উপেক্ষা করে আগের ‘ডিজিডেন’ নামের আইটি কোম্পানিকেই কাজ দেয় এজাজ।
রূপালী বাংলাদেশের অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম ২০২৩ সালের জুলাই মাসে গুলশান-২ এলাকায় এআই ভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি ব্যবস্থা উদ্বোধন করেন এবং ডিএনসিসির সব সিসিটিভি নেটওয়ার্কে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি সংযোজনের নির্দেশ দেন। টেন্ডারের মাধ্যমে মেয়র আতিকের ঘনিষ্ট ‘ডিজিডেন’ কোম্পানিকে দেওয়া হয় এই কাজ। এর আগে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আমিরুল ইসলাম (অব.), যিনি ২০২২-২৩ সময়কালে ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন। নজরদারি ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, ক্রয়, প্রযুক্তিগত স্পেসিফিকেশন এবং বাস্তবায়নের তত্ত্বাবধান করেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়িত্বে থাকাকালে প্রশাসক এজাজের ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত বছরের নভেম্বর থেকে এজাজের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চললেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে তিনি। অতীতে সরকারবিরোধী বা নিষিদ্ধ সংগঠনের (যেমন হিযবুত তাহরীর) সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো নিয়ে জনমনে বিতর্ক ও ক্ষোভ রয়েছে। তার অপসারণের দাবিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনও বিক্ষোভও করেছে। তবুও এখনো তিনি সদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আইনের আওতার বাইরেই।
এ ব্যাপারে দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে ঘুষ গ্রহণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। প্রাথমিক কিছু তথ্য-প্রমাণ পাওয়ায় অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে তলব করা হয় চলতি বছরের জানুয়ারিতে। অনুসন্ধান এখনো চলমান’।
অভিযোগ রয়েছে, এজাজের নির্দেশেই এই ডিজিডেন কোম্পানির কতিপয় কর্মচারী মিলে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ডিএনসিসি কার্যালয় থেকে সাবেক মেয়রের রাতের বেলায় বেরিয়ে যাওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ ফাঁস করে। যা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সরকার পরিবর্তনের পরও নজরদারি ব্যবস্থা সচল এবং নিরাপত্তাগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। পরে ২০২৫ সালে ‘সাপ্লাই ইন্সটলেশন অ্যান্ড মেইনটেইনান্স ওয়ার্ক অব সিসিটিভি ক্যামেরা অ্যান্ড এআই ডিভাইসেস’ শীর্ষক একটি ফ্রেমওয়ার্ক টেন্ডার অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে অনুমোদিত হয়। ই-জিপি পোর্টালে এর অবস্থা ‘কনট্রাক্ট এওয়াডেড’ হিসেবে দেখানো হয়। যা নজরদারি ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ ব্যাপারে ডিজিডেন কোম্পানির ব্যবস্থাপক মো. গিয়াস উদ্দিন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘ঢাকা উত্তর সিটির পুরো সিসিটিভির নিয়ন্ত্রণ আমাদের কোম্পানিই করে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমাদের দায়িত্ব এক্সটেনশন করা হয়।’
আপনাদের দায়িত্বে থাকা সময়ে মেয়র আতিকের ভিডিও কীভাবে ভাইরাল হলোÑ এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটা সঠিক আমি বলতে পারব না। এখানে হয়তো অন্য কোনো ভেন্ডরও রয়েছে। তারাই হয়তো এটি করেছে’। আওয়ামী লীগের সময়েও আপনারাই এই কাজে নিযুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আসলে ওই সময়টায় দায়িত্বে ছিলাম না। যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা বলতে পারবেন’। তাদের কোনো কন্টাক্ট চাইলে তিনি সেটিও এড়িয়ে যান।
বিশ্বব্যাংকের আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্টের নথি অনুযায়ী, ওই প্যাকেজের আওতায় লাইভ নজরদারি সরঞ্জামসহ জরুরি পরিচালনা কেন্দ্র নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ একই বিক্রেতা নেটওয়ার্ক ডিজিডেনকে নতুন কাজ প্রদান করে এই নজরদারি ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ করে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই নেটওয়ার্ক পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও যুক্ত ছিল। কোনো ফরেনসিক অডিট বা নিরাপত্তা সংস্কার ছাড়াই এই সম্প্রসারণ করা হয়।
কীভাবে গড়ে উঠল এই অবকাঠামো : গত এক দশকে ‘স্মার্ট সিটি’ ধারণাকে সামনে রেখে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণ শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নগর সেবা, জরুরি প্রতিক্রিয়া এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়। বিশ্বব্যাংকের আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্টের আওতায় জরুরি পরিচালনা কেন্দ্র ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার (ইওসি), কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল রুম এবং সংশ্লিষ্ট আইসিটি অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। সরকারি নথি অনুযায়ী, এসব স্থাপনায় লাইভ পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা, জিআইএস’ভিত্তিক তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়।
সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের দপ্তরে জমা হওয়া একটি প্রতিবেদনের কপি এসেছে রূপালী বাংলাদেশের হাতে। ওই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পরবর্তীতে এই অবকাঠামো আরও সম্প্রসারিত হয়ে একটি বৃহৎ কেন্দ্রীয় নজরদারি ব্যবস্থায় রূপ নেয়। যেখানে রয়েছে ৫৪ টি স্ক্রিনের ভিডিও দেয়াল, এআই ক্যামেরা ও কেন্দ্রীয় কমান্ড। যার নিয়ন্ত্রক এখনো আওয়ামী লীগ সরকার সমর্থকরা। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ করছে সাবেক প্রশাসক এজাজের লোকজনও। তাই বর্তমান সরকারের নেতাকর্মীদের বাসভবনবহুল গুলশান-বনানী এলাকার নিরাপত্তা এখনো প্রশ্নের মুখে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ফুটেজ ফাঁসের নজির থাকায় আতঙ্ক আরও বেশি : ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি সিসিটিভি ফুটেজ। ওই ভিডিওতে ডিএনসিসি কার্যালয় থেকে সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামের বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। ভাষ্য অনুযায়ী, এই ঘটনা প্রমাণ করে না যে, পুরো সিস্টেম হ্যাক হয়েছিল। তবে এটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। এই ভিডিওর মাধ্যমে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে জানিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ভিডিওটি কারা সংগ্রহ করল? কীভাবে বাইরে এলো, সিস্টেমে কারা প্রবেশ করতে পারে। ভিডিও সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে কারা ছিল। দুই বছর পার হয়ে গেলেও এসব প্রশ্নের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তাই এই প্রতিবেদনে যে শংকা প্রকাশ করা হয়েছে তা অবাস্তব নয় বলে মনে করেন তিনি।
২০২৫ সালের নতুন টেন্ডার নিয়ে বিতর্ক : ই-জিপি পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, প্রশাসক এজাজের অধীনে ২০২৫ সালে সিসিটিভি এবং এআই ডিভাইস সরবরাহ, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নতুন একটি টেন্ডার প্রকাশ করা হয়। ওই টেন্ডারের বড় অংকের ঘুষ নিয়ে ডিজিডেনকে সিসিটিভি নিয়ন্ত্রণের কাজ দেয় এজাজ। ফলে আওয়ামী লীগ সময়ের মতোই একই ধরনের প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পুনরায় উপস্থিতি এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ার কিছু দিক স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানা যায়নি।
বিদেশি প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা : আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত কিছু নজরদারি প্রযুক্তি নিয়ে বিভিন্ন দেশের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার সতর্কবার্তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে ডিএনসিসি প্রশাসকের কাছে জমা হওয়া ওই প্রতিবেদনে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো বৃহৎ সিসিটিভি নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১. কে সিস্টেমে প্রবেশ করতে পারে, ২. ডেটা কোথায় সংরক্ষিত হয়, ৩. সিস্টেম কত ঘনঘন নিরাপত্তা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়?
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরোনো ব্যবহারকারী অ্যাকাউন্ট, অনিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট বা দুর্বল নেটওয়ার্ক কনফিগারেশন বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এক্ষেত্রে পূর্বের লোকজনই এখনো দায়িত্বে বহাল থাকলে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায় বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
গোপনীয়তার প্রশ্ন : বাংলাদেশে বর্তমানে সিসিটিভি ব্যবহারের জন্য সাধারণ আইনগত কাঠামো থাকলেও এআই-ভিত্তিক ফেসিয়াল রিকগনিশন এবং ব্যাপক জননজরদারি ব্যবস্থার জন্য নীতিমালা এখনো সীমিত। ডিজিটাল অধিকারকর্মীরা বলছেন, যেকোনো নজরদারি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নাগরিকদের জানতে হবে কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, কতদিন সংরক্ষণ করা হচ্ছে, কে তথ্য ব্যবহার করতে পারবে এবং কীভাবে অপব্যবহার রোধ করা হবে এবং বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
এ বিষয়ে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘গুলশান-বনানীর মতো কূটনৈতিক ও ভিভিআইপি এলাকায় সিসিটিভি অবকাঠামো, কন্ট্রোল রুম, অ্যাডমিন অ্যাক্সেস এবং ভিডিও ডেটার নিরাপত্তা নিয়মিত স্বাধীন নিরাপত্তা অডিটের আওতায় থাকা উচিত। যদি কোথাও পূর্ববর্তী প্রশাসনের নিয়োগপ্রাপ্ত বা অননুমোদিত ব্যক্তিদের হাতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ অ্যাক্সেস থেকে থাকে, তাহলে তা দ্রুত যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এমন কোনো সম্ভাব্য ঝুঁকি অবহেলা করা উচিত নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘৫ আগস্টের পর পর দেশে আমরা নানা ধরনের কালচার দেখেছি। এর মধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ ফাঁস অন্যতম। তাই এসব সেনসেটিভ বিষয়ের নিয়ন্ত্রণে এখনো যদি পূর্বের লোকজনই নিয়োজিত থাকে তাহলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বেই। আমাদের যেকোনো কেন্দ্রীয় নজরদারি ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নিয়মিত নিরাপত্তা অডিট। প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, ঝুঁকিও তত বাড়বে’। তাই প্রবেশাধিকার, ডেটা সংরক্ষণ এবং সফটওয়্যার নিরাপত্তা নিয়মিত যাচাই করা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

