২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আন্দোলনকারীদের দমাতে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করা হয়েছিল বলে প্রমাণ পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এ ছাড়া স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে বিভিন্ন মেয়াদে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ দিয়ে দেশে যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল, সেসব অপকর্ম খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে দোষ প্রমাণিত হলে দল নিষিদ্ধের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আইনি বিধান রয়েছে।
গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘নানা সময়ে আওয়ামী লীগ ব্যক্তি ও দলগতভাবে গুম-খুনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িয়েছে। সরকারের পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবেও তারা মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। জুলাই বিপ্লবের সময় নৃশংস কায়দায় আন্দোলন দমনে স্নাইপার রাইফেল ব্যবহারের বিষয়টি আমাদের তদন্তে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।’
বিচারের ক্ষেত্রে সরকারের কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নেই উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর জানান, এই অপরাধযজ্ঞে আওয়ামী লীগের সঙ্গে অন্য কোনো দলের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আইনি লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা দেশে এসে নিজের বিচারের মুখোমুখি নিজে হোনÑ সেটাই আমরা চাই। তিনি আদালতে এসে তার সাজা চ্যালেঞ্জ করুন।
তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে চিফ প্রসিকিউটর জানান, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্তের কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করা হলেই পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে দল নিষিদ্ধ ও সম্পদ বাজেয়াপ্তের পাশাপাশি বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম শুরুর নজির তৈরি হতে যাচ্ছে।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, টানা শাসনামলে দল হিসেবে নানা অপরাধ ঘটিয়েছে আওয়ামী লীগ। সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির দায় থেকেও অনেক কর্মকা- ঘটিয়েছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। আইন অনুযায়ী এসবের বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ ও সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ প্রণয়ন করেছিল। আর এ দুটি আইনেই এ ধরনের অপরাধের বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘৪ জুলাই একটি স্মরণসভায় দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বক্তব্যটি আপনারা (সাংবাদিক) যেভাবে শুনেছেন, আমিও একইভাবে শুনেছি। তবে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৩ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন প্রণয়ন করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। পরে সরকারে এসে ২০১০ সালে একই আইনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এরপর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। ২০১৩ সালে এ আইনে সংশোধন এনে ‘অর্গানাইজেশন’ শব্দটি যোগ করে শেখ হাসিনার সরকার। এ ছাড়া ২০০৯ সালে সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়ন করে তারা। ওই আইনের এক জায়গায় ব্যক্তির সঙ্গে সঙ্গে সত্তাকেও বিচারের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া কোনো সংগঠন যদি কোনো অপরাধ করে, তাহলে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে বিচার করা যাবে বলেও উল্লেখ করা হয়।’

