তীব্র ওষুধ ও জনবল সংকটের কারণে মৌলভীবাজার জেলার গ্রামাঞ্চলের প্রায় ১১ লাখ মানুষ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে কাক্সিক্ষত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ১৯৯৮ সালে গ্রামের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম চালু করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালের পর দেশজুড়ে এ কার্যক্রমের ব্যাপক সম্প্রসারণ হলেও বর্তমানে মৌলভীবাজারের অধিকাংশ কমিউনিটি ক্লিনিক নানা সংকটে কার্যকারিতা হারাতে বসেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার সাত উপজেলায় মোট ১৮৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এসব ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় ১১ লাখ মানুষের নিয়মিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব, জনবলের সংকট এবং অনিয়মিত কার্যক্রমের কারণে অধিকাংশ মানুষ কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কমিউনিটি ক্লিনিকে ২২ ধরনের প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্লিনিকে প্যারাসিটামল, মেট্রোনিডাজল (মেট্রিল) ও ওরস্যালাইন ছাড়া তেমন কোনো ওষুধ নেই। অনেক ক্লিনিকে এসবও পর্যাপ্ত নয়। ফলে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ ছাড়াই ফিরে যেতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, শিশু ও নি¤œ আয়ের মানুষ।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে অনিয়ম যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্লিনিক নির্ধারিত সময়ে খোলা হয় না, আবার নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওষুধ সংকটের পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের অনিয়মিত উপস্থিতিও সেবাব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, শ্রীমঙ্গল, রাজনগর, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী ও সদর উপজেলায় মোট ১৮৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ক্লিনিকে সপ্তাহে ছয় দিন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া সপ্তাহে তিন দিন স্বাস্থ্য সহকারী এবং তিন দিন পরিবার কল্যাণ সহকারী সেবা দেওয়ার কথা। তবে বাস্তবে অধিকাংশ ক্লিনিকে সিএইচসিপি ছাড়া অন্য কাউকে দেখা যায় না।
সম্প্রতি জেলার বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে উদ্বেগজনক চিত্র। কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার শ্রীসূর্য্য কমিউনিটি ক্লিনিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত সিএইচসিপি উপস্থিত থাকলেও দুপুর পর্যন্ত কোনো রোগী আসেনি। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকায় মানুষ এখন আর ক্লিনিকে আসতে আগ্রহী নয়।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর ইউনিয়নের লাইয়ারকুল কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক দিনই ক্লিনিক বন্ধ থাকে। ঝড়-বৃষ্টির অজুহাতে টানা কয়েক দিন ক্লিনিক বন্ধ রাখা হয়। খুললেও ওষুধ না থাকার কথা বলে রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
একই উপজেলার কাকিয়াছড়া ও সিন্দুরখান ইউনিয়নের সাইটুলা কমিউনিটি ক্লিনিকেও অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে। রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের সালন কমিউনিটি ক্লিনিকেও নির্ধারিত সময়ের আগেই তালা ঝুলিয়ে চলে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
কমলগঞ্জের সেবাগ্রহীতা সাবিনা আক্তার বলেন, ‘আগে নিয়মিত এখান থেকে চিকিৎসা ও ওষুধ পেতাম। গত এক বছর ধরে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না। কোনো অ্যান্টিবায়োটিকও নেই। তাই অনেকেই এখন আর কমিউনিটি ক্লিনিকে আসে না।’
রাজনগরের নিদনপুর গ্রামের বাসিন্দা ফাতিহা বেগম বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে আলসারের রোগী। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নিয়মিত ওষুধ কিনতে পারি না। চার মাস ধরে ক্লিনিকে এসেও কোনো ওষুধ পাইনি। সরকারি ক্লিনিক থেকেও যদি না পাই, তাহলে আমরা কোথায় যাব?’
স্থানীয় মসজিদের ইমাম আব্দুন নুর বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এখানে ওষুধের সংকট চলছে। আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ এই ক্লিনিকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ওষুধ না পেয়ে সবাই ফিরে যাচ্ছে।’
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শ্যামেরকোনা কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি জান্নাত আরা বেগম বলেন, ‘প্রয়োজনীয় ওষুধ থাকলে রোগীরা উপকৃত হতেন এবং সদর হাসপাতালের ওপর চাপও কমত। কিন্তু ওষুধের অভাবে রোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, অনেক সময় আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করেন।’
জেলা সিএইচসিপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রুবেল আহমেদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ওষুধের সংকট চলছে। বিষয়টি বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে, শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন বলেন, ‘প্রায় এক বছর ধরে কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধের সংকট চলছে। আগে তিন কার্টন ওষুধ পাওয়া গেলেও এখন মাত্র এক কার্টন আসে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া ভারি বৃষ্টিপাতে লইয়ারকুল কমিউনিটি ক্লিনিক প্রায়ই পানিতে তলিয়ে যায়।’
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, ‘কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হয়। আগের তুলনায় ওষুধের বরাদ্দ কমেছে। আমরা পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নিয়মিত চাহিদাপত্র পাঠাচ্ছি। জনবলের সংকটও রয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কারণ গ্রামীণ জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রধান ভরসা এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো।’

