ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই, ২০২৬

পিজিআরকে প্রধানমন্ত্রী

জনগণ থেকে দূরে রেখে নিরাপত্তা নয়

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ৬, ২০২৬, ০৫:৫৩ এএম

জনগণ যাতে নিজেদের সরকারপ্রধান থেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করে, সেভাবে নিরাপত্তা কৌশল বিন্যাস করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রোববার দুপুরে ঢাকা সেনানিবাসে প্রেসিডেন্ট গার্ডস রেজিমেন্টের (পিজিআর) সদর দপ্তরে বাহিনীর ৫১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।

গণতান্ত্রিক সরকারপ্রধানের নিরাপত্তার প্রশ্নে নিজের ভাবনা তুলে ধরতে গিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আমি এর আগে এসএসএফের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে আমার একটি উপলব্ধির কথা শেয়ার করেছিলাম, যেহেতু আপনারাও রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের নিরাপত্তায় নিয়োজিত, সেহেতু আপনাদের জন্যও কথাটি প্রযোজ্য বলে আমি মনে করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রায়শই জনসভা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে হয়। ফলে সেই সব অনুষ্ঠানে আপনাদেরও দায়িত্ব পালন করতে হয়। এ ধরনের অনুষ্ঠানে ব্যাপক জনসমাগমের মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই কিছুটা জটিলতাপূর্ণ।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসব কর্মসূচি পালনের সময় একদিকে সরকারপ্রধানের নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় রাখা, অন্যদিকে নাগরিক জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত রাখাÑ এ দুটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই আপনাদের নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন করতে হয়। আপনাদের প্রতি আমার আহ্বান, নিরাপত্তা কৌশল এমনভাবে বিন্যাস করা জরুরি, জনগণ যাতে নিজেদের সরকারপ্রধান থেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করেন। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে আমি জনগণের বিশ্বাস এবং ভালোবাসার ওপর আমার আস্থা এবং নির্ভরতা বজায় রাখতে চাই। নিরাপত্তা কৌশল যাতে সরকারপ্রধানকে জনগণ থেকে দূরে ঠেলে না দেয়, সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ রাখার জন্য আমি আপনাদের প্রতি বিশেষভাবে আহ্বান জানাই।’

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকা-ের প্রসঙ্গ টেনে তার বড় ছেলে তারেক রহমান বলেন, ‘পিজিআরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে আমার জীবনের সবচেয়ে শোকাবহ ও হৃদয় বিদারক ঘটনা, আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের কথা মনে পড়ছে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের সময় কর্তব্য পালনরত পিজিআরের কয়েকজন সদস্যও শহিদ হয়েছিলেন। আজকের এই বিশেষ দিনে আমি পিজিআরের সেই সব শহিদকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। আল্লাহর দরবারে তাদের মাগফিরাত কামনা করছি। দায়িত্ব পালনের সময় তাদের নির্মম মৃত্যুর মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের নিরাপত্তার প্রতি অটল আনুগত্য, কর্তব্যপরায়ণতা এবং জীবন উৎসর্গের যে চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়েছে, এটি অবশ্যই পিজিআরের সদস্যদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তায় ১৯৭৫ সালের এই দিনে প্রথমে ‘রাষ্ট্রপতির দেহরক্ষী ইউনিট’ নামে একটি নতুন রেজিমেন্ট আত্মপ্রকাশ করেছিল। পরবর্তীতে তৎকালীন সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ‘রাষ্ট্রপতির দেহরক্ষী ইউনিট’কে ‘প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট’ হিসেবে অভিহিত করেন। এই নতুন নামকরণ রেজিমেন্টের কার্যক্রমকে আরও আত্মপ্রত্যয়ী ও গতিশীল করতে ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে। প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট-পিজিআর প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান একটি অবিস্মরণীয় ও অনুপ্রেণামূলক নাম।’

১৯৯১ সালে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি সরকারপ্রধানের নিরাপত্তার দায়িত্ব এই রেজিমেন্টের ওপর বর্তায়।

‘পিজিআরের দায়িত্ববোধ প্রশংসনীয়’ : প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার বাবা-মা দুজনই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে আল্লাহর রহমতে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকায় সংগত কারণেই পিজিআরের কার্যক্রমের সঙ্গে আমি কিশোরবেলা থেকেই পরিচিত। পিজিআরের কাজটি অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং। কারণ রাষ্ট্র ঘোষিত অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবদের নিরাপত্তা প্রদানের পাশাপাশি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার দায়িত্ব পালন করাও আপনাদের অন্যতম কর্তব্য। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আপনাদের নানা রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। এসব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ততা, দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যপরায়ণতার বৈশিষ্ট্য আপনাদের নিঃসন্দেহে একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে পরিচিত করেছে।’

সুশৃঙ্খলতার স্বীকৃতিস্বরূপ পিজিআর চলতি বছর ‘ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড’ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়ায় বাহিনীর সদস্যদের অভিনন্দন জানান সরকারপ্রধান।  প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আপনাদের ইস্পাত কঠিন দায়িত্ববোধ অবশ্যই প্রশংসনীয়। আমি জানি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বিশেষভাবে নির্বাচিত ও প্রশিক্ষিত সদস্যগণই এই রেজিমেন্টে দায়িত্ব পালনের জন্য যথানিয়মে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। অর্থাৎ, প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট সেনাবাহিনীরই অধীন একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। সুতরাং পেশাদারিত্ব, আনুগত্য ও শৃঙ্খলার সমন্বয়ে পিজিআর সদস্যগণ নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথারীতি পালন করবেনÑ এটিই বিধিবদ্ধ নিয়ম।’

প্রধানমন্ত্রী পিজিআর সদর দপ্তরে একটি গাছের চারা রোপণ করেন এবং পরিদর্শন বইয়ে সই করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামছুল ইসলাম, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল হাসান মাহমুদ খান, পিজিআরের কমান্ডেন্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলাম আরিকুল আলমসহ সামরিক কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।