রাজধানীর মগবাজার নয়াটোলা এলাকার ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা আকবর আলী। স্বামী-স্ত্রী দুজনে একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। বাকি ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দেওয়া। ছেলে-মেয়ে সবাই দেশের বাইরে থাকেন। বলা যায়, ভাড়াটিয়াদের তদারকি করেই দিন কাটে এই দম্পতির। ভাড়া ছাড়া অন্যান্য বিল ভাড়াটিয়ারা নিজেরা দিলেও সম্প্রতি তাদের অভিযোগে কঠিন সময় যাচ্ছে আকবর আলীর। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, হঠাৎ করেই জুন মাসে একেকজন ভাড়াটিয়ার দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি বিদ্যুৎ বিল এসেছে। সবাই এর জন্য দায়ী করছে বাড়িওয়ালাকে। তারা বলছে, বাড়িওয়ালা নাকি ইচ্ছে করে মিটারে কোনো কারসাজি করে রেখেছে যাতে বিল বেশি আসে। কোনোভাবেই তাদের বোঝাতে না পেরে ডিপিডিসির (ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি) অফিসে গিয়ে দেখি এমন হাজারো অভিযোগ। কারো কারো তো ৫শ টাকার জায়গায় বিল এসেছে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। বিদ্যুৎ অফিস সমাধান দিতে না পারায় বাড়তি বিল দিতে হয়েছে। ভাড়টিয়াদের দাবি বাসা ভাড়ার সঙ্গে এটির সমন্বয় করে নিতে হবে।
পোস্টপেইড গ্রাহকদের এমন বাড়তি বিলের অভিযোগের পাশাপাশি প্রি-পেইড মিটারের গ্রাহকদের পোহাতে হচ্ছে দুই রকম ভোগান্তি। রাজধানীর মিরপুর পল্লবী এলাকার বাসিন্দা সেলিম মিয়ার অভিযোগ কার্ডে টাকা ভরার দুই দিনের মধ্যে টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর টাকা ভরতে গিয়ে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। তিনি বলেন, রিচার্জের পর আমাদের মোবাইলে ২০০ ডিজিটের দীর্ঘ কোড পাঠানো হচ্ছে, যা মিটারে একে একে প্রবেশ না করা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ চালু হচ্ছে না। ফলে শত শতবার বাটন চাপতে গিয়ে চরম ভোগান্তি হচ্ছে। বিশেষ করে কোড প্রবেশের সময় একটি সংখ্যাও ভুল হলে পুরো প্রক্রিয়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হচ্ছে, যা অনেক গ্রাহকের জন্যই বিরক্তির কারণ এবং সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর থেকে আমরা যেমন মুক্তি চাই তেমনি ভূতুড়ে বিলের হাত থেকেও বাঁচতে চাই।
বিষয়টি নিয়ে গ্রাহকদের ভোগান্তি হলেও অস্বস্তিতে রয়েছে সরকার। বিদ্যুতের ট্যারিফ সমন্বয়ের সময় প্রিপেইড মিটারে এই প্রযুক্তিগত জটিলতা তৈরি হয়েছে দাবি করে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এর কারণেই গ্রাহকদের ভোগান্তি হয়েছে। বিষয়টি পুরোপুরি প্রযুক্তিগত। তাই এক্ষেত্রে আমাদের খুব বেশি একটা কিছু করার নেই। তবে ভবিষ্যতে তা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যুতের ট্যারিফ পরিবর্তনের কারণে প্রিপেইড মিটারে যে ডিজিট কোড-সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিয়েছে, সেটি মূলত প্রযুক্তিগত সমস্যা। ২০২৪ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতি হয়েছিল। এবার ট্যারিফ সমন্বয়ের পর বিষয়টি উপলব্ধি করে ছয়টি বিতরণ সংস্থাকে নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে এবং গ্রাহকদের সমস্যা সমাধানে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে ট্যারিফ সমন্বয় বা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সময় যাতে একই ধরনের সমস্যা না হয়, সে জন্য মিটার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভূতুড়ে বিল বা বাড়তি বিলের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি শুধু ট্যারিফ বৃদ্ধির কারণে নয়, বরং বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণে হয়েছে। আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ব্যবহারের পরিমাণ বাড়লে উচ্চতর স্ল্যাবে বিল গণনা হওয়ায় মোট বিল তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তবে কতিপয় ক্ষেত্রে কিছু করণিক ভুল পাওয়া যাচ্ছে এবং সেগুলোর বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যথাযথ প্রতিকার দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের অস্বাভাবিক বা ‘ভূতুড়ে’ বিল নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ বাড়ছে দিন দিন। তাদের দাবি, প্রতি মাসে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, জুন মাসের বিলে তার তুলনায় অনেক বেশি ইউনিট দেখানো হয়েছে।
অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, বছরের অন্য সময় এমনটি না হলেও জুন ক্লোজিংয়ের আগে প্রকৃত মিটার রিডিংয়ের পরিবর্তে অনুমানভিত্তিক বা অতিরিক্ত ইউনিট দেখিয়ে বিল করা হয়। যদিও বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো বরাবরের মতো এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেট এলাকার বাসিন্দা মোস্তাবা মেহেদি বলেন, সাধারণত আমার মাসিক বিদ্যুৎ খরচ দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু জুন মাসে এসে সেই খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। এটা পুরোপুরি একটা ভূতুড়ে ব্যাপার মনে হচ্ছে। এমনটা আগে কখনো হয়নি। এর আগেও জুন মাসে অতিরিক্ত বিল এসেছে। অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। পুরো বিলই পরিশোধ করতে হয়েছে। এ বছরও অতিরিক্ত ৩ হাজার টাকা এসেছে। এবারও অভিযোগ দিয়েছি, কাজ হবে কি না জানি না। বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের কাছে থেকে অন্যায়ভাবে বেশি টাকা আদায় করছে। সরকার সংশ্লিষ্টরা আশ্বাস দিলেও আদতে কোনো কাজ হচ্ছে না।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, অনেক এলাকায় প্রিপেইড ও স্মার্ট মিটার চালু হলেও এখনো বিপুলসংখ্যক গ্রাহক পুরোনো পোস্টপেইড মিটারের ওপর নির্ভরশীল। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্মার্ট মিটারের ব্যবহার বাড়লে মিটার রিডিং নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক অনেকটাই কমে আসবে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থার সঙ্গে সরাসরি অথবা হটলাইনের মাধ্যমে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর জন্য কেন্দ্রীয় সেবা হটলাইন ১৬৯৯৯ ছাড়াও বিপিডিবি (১৬২০০), পল্লী বিদ্যুৎ (১৬৮৯৯), বিপিডিসি (১৬১১৬), ডেসকো (১৬১২০), নেসকো (১৬৬০৩) এবং ওজোপাডিকো (১৬১১৭) নম্বরে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অতিরিক্ত বিলের ক্ষেত্রে পরে সমন্বয় করা হয়। এতে অতিরিক্ত অর্থ আত্মসাৎ বা ব্যক্তিগতভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সমন্বয় হলেও অতিরিক্ত ইউনিটের কারণে কোনো গ্রাহক যদি উচ্চতর স্ল্যাবে চলে যান, তা হলে সেই অতিরিক্ত অর্থ আর ফেরত পান না।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, প্রায় প্রতি বছরই একই ধরনের ঘটনা ঘটে। বছরের অন্য সময় দুই থেকে তিন হাজার টাকা বিল এলেও জুনে পাঁচ থেকে আট হাজার টাকার বিল এসেছে। এ বিষয়ে স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিস সন্তোষজনক ব্যাখ্যা বা কার্যকর সমাধান দিচ্ছে না। কেউ কেউ মিটার পরীক্ষার আবেদন করলেও সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকে। অনেক এলাকায় নিয়মিত মিটার রিডিংও নেওয়া হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একসঙ্গে দুই মাসের রিডিং নেওয়া হয়। আবার কোথাও অনুমানভিত্তিক বিল তৈরি করা হয়। ফলে প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে বিলের কোনো মিল থাকে না। পরে সংশোধনের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নে গ্রাহকদের দীর্ঘ ভোগান্তি পোহাতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, বিদ্যুৎ অপচয় ও চুরির কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত সিস্টেম লস কম দেখাতে অনেক সময় গ্রাহকদের ওপর বাড়তি বিলের চাপ সৃষ্টি করা হয়। পাশাপাশি জুন ক্লোজিংয়ের আগে বকেয়া কম দেখানো, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং মিটার রিডারদের গাফিলতির কারণেও প্রতিবছর অনেক গ্রাহক ভোগান্তির শিকার হন। তারা বলছেন, সিস্টেম লস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ প্রযুক্তিগত কারণে এবং আরেকটি অংশ চুরি, অবৈধ সংযোগ ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে নষ্ট হয়। এ ক্ষতি যত কমানো যায়, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাও তত ভালো থাকে। তবে সিস্টেম লস কমানোর নামে গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত বিল চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তবে সরকার সিস্টেম লস কমাতে কাজ করছে জানিয়ে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এস এম জিয়াউল আজিম গতকাল সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘ বিদ্যুৎ লাইনের কারণে স্বাভাবিকভাবেই সিস্টেম লস তুলনামূলক বেশি হয়। তবে জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং বিদ্যুৎ খাতকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই আর্থিকভাবে সক্ষম করে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। বিশেষ করে নি¤œমানের যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে। অতিরিক্ত বিল করার কোনো নীতিগত সুযোগ নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিটার রিডিংয়ের ভুল, অনুমানভিত্তিক বিল অথবা আগের মাসের সমন্বয়ের কারণে বিল বেশি হতে পারে। অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয় সঙ্গে সঙ্গে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিলিং ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। মিটার রিডিংয়ের ছবি সংরক্ষণ, অনলাইনে রিডিং যাচাইয়ের সুযোগ, অভিযোগ নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা চালু করা গেলে এ ধরনের অভিযোগ অনেকাংশে কমে আসবে।
ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, জুন মাস এলেই বিতরণ সংস্থাগুলোতে সিস্টেম লস কমানোর একটা হিড়িক পড়ে যায়। তখন মৌখিকভাবে বাড়তি বিলের একটা ঘোষণা দেওয়া থাকে। এ অপকৌশল সম্পর্কে অনেকেই জানেন। কিন্তু কেউ ব্যবস্থা নেয় না। বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বড় পরিবর্তন দরকার। কারণ বিদ্যুৎ খাতে সেবা দেওয়ার পরিবর্তে লুণ্ঠন হচ্ছে। যার থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
তবে বিদ্যুৎ খাতকে ঘিরে অন্য ফ্যাসিবাদি সরকারের দীর্ঘদিনের লুটপাটের খেসারত বিএনপি সরকারকে দিতে হচ্ছে উল্লেখ করে বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, এতদিনের জটিলতা তো আর এক দিনেই সমাধান সম্ভব নয়। সরকার গ্রাহকদের যেকোনো ধরনের ভোগান্তি কমাতে কাজ করছে। বাড়তি বিদ্যুৎ বিল বা ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য থাকলে নির্দিষ্ট বিতরণ সংস্থাগুলোর কাছে অভিযোগ দিলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া আছে। তাই শুধু শুধু দোষারোপ না করে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে ধরলে প্রতিকার সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া সম্ভব।

