ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

তুমি কে আমি কে? ফার্মের মুরগি

পারভেজ খান
প্রকাশিত: জুলাই ১৬, ২০২৬, ০৫:৫৯ এএম

বাংলাদেশে দুটি জিনিস কখনো ফুরায় না। এক, বর্ষাকালে পানি। দুই, বিশিষ্টজনদের অবিস্মরণীয় উক্তি। তবে পানির যেমন বের হয়ে যাওয়ার পথ বা ড্রেন থাকে, উক্তির আবার তেমন কোনো নিষ্কাশনব্যবস্থা নেই। অনেকটা বন্দুকের গুলির মতো। বের হলে আর রক্ষা নেই। কোথাও না কোথাও সে আঘাত হানবেই। আলোচ্য উক্তিও ঠিক তেমনি। একবার মুখ থেকে বেরোলেই তা ইতিহাস, ভূগোল, সমাজবিজ্ঞান, ফেসবুক, টিকটক, চায়ের দোকানÑ সবখানেই সমান গতিতে আঘাত হানে, অতঃপর প্রবাহিত হয়। সর্বশেষ সেই মহামূল্যবান সংগ্রহে যুক্ত হয়েছে বহুল আলোচিত ‘ফার্মের মুরগি’ উপমা। কেউ কেউ বলছেন তকমা।

বৃষ্টিতে ভিজে, কোমরপানি মাড়িয়ে পরীক্ষা দিতে যাওয়া এক শিক্ষার্থীকে ফোন করে এক মান্যবর যে স্নেহমাখা ভাষায় ‘ফার্মের মুরগি’ বলে সম্বোধন করলেন, তা শুনে ভাষাবিদেরা অভিধান খুলেছেন, প্রাণিবিজ্ঞানীরা মুরগির জিনতত্ত্ব খুঁজছেন আর শিক্ষার্থীরা ভাবছেন, পরীক্ষার প্রবেশপত্রের সঙ্গে আগামী বছর থেকে কি খামারের সনদও লাগবে?

রাজধানীর এক ডিম বিক্রেতা নাকি দোকানের সামনে লিখে দিয়েছেন  ‘এখানে শিক্ষা বোর্ড অনুমোদিত ফার্মের ডিম পাওয়া যায়।’

শোনা যাচ্ছে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ নিজেদের নতুন পরিচয়ও ঠিক করে ফেলেছেন ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ নামে। তাদের সম্ভাব্য নির্বাচনি প্রতীক ডিম। নির্বাচনি সেøাগান ‘তুমি কে, আমি কে? ফার্মের মুরগি!’

রাজনীতিবিদদের ভাষার বিবর্তন যদি চার্লস ডারউইন দেখতেন, তাহলে হয়তো তাকে নতুন করে ভাবতে হতো।

তবে শুধু মুরগিতেই আজ আমি কেন থামব? আমাদের রাজনৈতিক অভিধান এমন সব কালজয়ী বাণীতে সমৃদ্ধ যে, একে সহজে কোনো ভাষার অভিধান বলা চলে না; বরং এটিকে ‘জাতীয় উদ্ধৃতি জাদুঘর’ হিসেবে ইউনেস্কোতে পাঠানো যায়।

কখনো শোনা যায় ‘উই আর লুকিং ফর শত্রুজ’। শুনে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একসময় দিশেহারা হয়েছিল। তারা মানচিত্র হাতে দেশ-বিদেশ চষে বেড়াচ্ছিল। সে সময় শত্রুরা অবশ্য পাশের চায়ের দোকানে বসে চা খেতে খেতে বলেছে, ‘আমরা তো এখানেই আছি, শুধু আপনারা গুগল ম্যাপ আপডেট করেননি।’

আবার একসময় উচ্চারিত হয়েছিল ‘আল্লাহর মাল আল্লায় নিয়ে গেছে।’ এই একটি বাক্য শুনে বিমা কোম্পানিগুলো দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল। কারণ ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে যদি সবাই এই দর্শন গ্রহণ করে, তাহলে বিমা শিল্পের ভবিষ্যৎ কোথায়?

আর ‘রাজাকারের বাচ্চা’ শব্দযুগল তো রাজনৈতিক অভিধানে এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছে যে, কোনো বিতর্ক জমে না উঠলে সেটিকে এনে একটু নাড়াচাড়া করে দিলেই আলোচনায় আগুন জ¦লে ওঠে।

অবশ্য এ দেশে শুধু রাজনৈতিক ভাষাই নয়, প্রশাসনিক ভাষাও কম রোমাঞ্চকর নয়। কোথাও সেতু ভেঙে গেলে বলা হয় ‘তদন্ত কমিটি হয়েছে’। সাভারে কোনো ভবন ধসে পড়লে বলা হয় অমুকে ‘ধাক্কা দিয়েছে’। রাস্তা ডুবে গেলে ‘দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে’। সাগর-রুনি হত্যামামলার তদন্ত অগ্রগতি কতদূর? উত্তর আসে ‘প্রণিধানযোগ্য’। ফাইল হারিয়ে গেলে বলা হয় ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে’। আর আমাদের মতো কোনো গাধা যদি কখনো জিজ্ঞাসা করি, অমুক প্রকল্পের কাজ বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কবে হবে? জবাব আসে ‘প্রক্রিয়াধীন’। আমাদের দেশে এই ‘প্রক্রিয়াধীন’ শব্দটি এমন এক জাদুমন্ত্র, যা উচ্চারণ করলেই সময় থমকে দাঁড়ায়।

বিশিষ্টজন বা মান্যবরদের এসব বক্তব্যের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, সেগুলো সাধারণ মানুষের চেয়ে মিম নির্মাতারা বেশি দ্রুত বুঝে ফেলেন। বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই ফেসবুকে পোস্টার, ভিডিও, গান, রিমিক্স, স্টিকার সব হাজির। এমনও দিন গেছে, সকালে একটি বক্তব্য এসেছে, দুপুরে তার মিম, বিকেলে টি-শার্ট আর রাতে সেই উক্তি দিয়ে রিংটোন!

আমাদের দেশে গবেষণা প্রতিষ্ঠান যত না গবেষণা করে, তার চেয়ে বেশি গবেষণা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কে কখন কী বললেন, কেন বললেন, কী বলতে চেয়েছিলেন আর আসলে কী বলে ফেললেনÑ এসব নিয়ে এমন বিশ্লেষণ হয় যে, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ও অবাক হয়ে যায়। ভাবুন তো, যদি ভবিষ্যতে ‘জাতীয় উক্তি কমিশন’ গঠন করা হয়! যদি বলা হয়, মন্ত্রীদের নতুন বক্তব্য দেওয়ার আগে কমিশনের অনুমোদন নিতে হবে। কমিশন বলবে, ‘এই বক্তব্যে হাসির মাত্রা ৮.৫, বিতর্ক ৯.২, ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯ শতাংশ। অনুমোদিত।’ তারপর বক্তব্য বাজারে ছাড়া হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় হয়তো নতুন সিলেবাসও করতে পারে। অধ্যায় ১ : ফার্মের মুরগির সমাজতত্ত্ব; অধ্যায় ২ : প্রশাসনিক উপমার ব্যবহার; অধ্যায় ৩ : ভাইরাল বক্তব্যের অর্থনীতি; সৃজনশীল প্রশ্ন : ‘ফার্মের মুরগি’ অথবা ‘রাজাকারের বাচ্চা’ উপমার আলোকে নাগরিক মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করো।

‘ফার্মের মুরগি’ প্রসঙ্গে শিক্ষার্থীরা হয়তো তখন উত্তর লিখবেÑ ‘ফার্মের মুরগি এমন এক সামাজিক প্রাণী, যে বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা দিতে যায়, তারপর বাসায় ফিরে দেখে ভাইরাল হয়ে গেছে।’ কোচিং সেন্টারগুলোও তখন বিজ্ঞাপন দেবেÑ ‘আমাদের এখানে ব্রয়লার ব্যাচ ও দেশি মোরগ ব্যাচে আলাদা ক্লাস নেওয়া হয়।’

পোলট্রি শিল্পও বসে থাকবে না। তারাও নতুন নতুন ব্র্যান্ড বাজারে আনবে। বাজারসেরা হবে ‘মন্ত্রীসিলেক্ট ব্রয়লার’। স্লোগান উঠবে, ‘এই মুরগি খেলে শুধু ওজন নয়, উপমাও বাড়ে!’

সত্যি বলতে কী, আমাদের দেশে বাজেট, মূল্যস্ফীতি কিংবা জলাবদ্ধতা নিয়ে যত আলোচনা হয়, তার চেয়ে কখনো কখনো একটি মাত্র উক্তি বেশি আলোচনার জন্ম দেয়। বাজারে পেঁয়াজের দাম একদিন খবরে থাকে, কিন্তু একটি অমর সংলাপ বছরের পর বছর মানুষের স্মৃতিতে ঘুরে বেড়ায়।

শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন হতে পারে, সকালে ঘুম থেকে উঠে পাবলিক বা আমজনতা প্রথমে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখবে, আজ কোথায় কে কী বললেন। কেউ আবহাওয়ার খবর দেখেন, কেউ শেয়ারবাজার, আর অধিকাংশই অপেক্ষা করেন আজকের ‘ডায়ালগ সূচক’ কত উঠল দেখতে।

বিশ্লেষকেরা বলবেন, একদিন জাতীয় পত্রিকার শিরোনাম হবে ‘ডলারের দাম স্থিতিশীল, কিন্তু আজও বেড়েছে কালজয়ী উক্তির সূচক।’ সেদিন অর্থনীতিবিদেরা বলবেন, ‘মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, বক্তব্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন।’

পরিশেষে একটি কথাই বলা যায়, এ দেশের মানুষ অসাধারণ সহনশীল। তারা জলাবদ্ধতা সহ্য করে, যানজট সহ্য করে, দ্রব্যমূল্যের আগুন সহ্য করে, লোডশেডিং সহ্য করে, আবার মাঝেমধ্যে এমন সব উপমাও সহ্য করে, যা শুনে বাংলা ভাষাও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নতুন করে চিনতে চায়। তাই দেশের জনগণ ‘ফার্মের মুরগি’ হোক, ‘দেশি মোরগ’ হোক কিংবা নিছক সাধারণ নাগরিকই হোক, তাদের একটি বিশেষ গুণ তৈরি হয়েছে। তারা এখন আর বক্তব্য শুনে চমকে ওঠে না; বরং অপেক্ষা করে, পরবর্তী কালজয়ী সংলাপটি কবে আসছে!

কারণ এ দেশে উন্নয়নের সূচক যেমন আছে, তেমনি আছে ‘উক্তি উৎপাদন সূচক’। আর সেই সূচকে আমরা নিঃসন্দেহে বিশ্বসেরাদের কাতারে। শুধু আফসোস একটাই। এই বিপুল ডায়ালগ-সম্পদ দিয়ে পৃথিবী মাতানো গেলেও বাজারের সবজির দাম বা শহরের জলাবদ্ধতা এখনো হার মানতে রাজি নয়!

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ : এই রম্যরচনা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপধর্ম অনুসরণ করে লেখা। এতে উল্লিখিত উক্তিগুলো জনপরিসরে বহুল আলোচিত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রসাত্মকভাবে উপস্থাপনা করা হয়েছে।