ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

সংসদে প্রধানমন্ত্রী

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ১৬, ২০২৬, ০৬:০০ এএম

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সব রাজনৈতিক দলের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি দফা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে বর্তমান সরকার জনগণের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন এবং বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত ৩১ দফা এখন দেশের মানুষের মুক্তির সনদে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও পেশাদার করা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা জোরদারে ১০ হাজার নতুন পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদের সব সদস্য এবং দেশের জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বৈষম্যহীন, উগ্রবাদমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠা করা হবে। সরকার কোনো ধরনের উগ্রবাদ বা চরমপন্থাকে প্রশ্রয় দেবে না। এ বিষয়ে বিরোধী দলের সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।

এদিকে একাত্তরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে প্রকৃত শহিদ এবং মুক্তিযোদ্ধার সঠিক তালিকা প্রণয়ন যাদের দায়িত্ব ছিল, তারা সেটাকে রাজনীতিকীকরণ করেছে বলে সংসদে প্রশ্নোত্তরে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল পিরোজপুর-৩ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমীন দুলালের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রথমে আমি বলেছি, দেশ স্বাধীনের পরে তাদের দায়িত্ব ছিল সঠিকভাবে শহিদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি তালিকা প্রণয়ন করা। তারা সেটিকে রাজনৈতিকভাবে উপস্থাপন করেছে, তারা সেটা নিরপেক্ষভাবে সঠিকভাবে করেনি।’

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ১৯৮৪ সালে তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদের আমলে। এরপর বিভিন্ন সরকারের সময় সেই তালিকা পরিবর্তন, পরিমার্জন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় তারা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি মতন করে গঠন করেছে। যেখানে আমরা চেষ্টা করব সঠিক যারা মুক্তিযোদ্ধা, সঠিক যারা শহিদ, তাদের চিহ্নিত করা জন্য।’

একাত্তরের শহিদ ও গণহত্যার শিকারদের সঠিক তালিকা প্রণয়নের পরিকল্পনা সরকারের আছে কি নাÑ রুহুল আমীন দুলালের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তার দলের নির্বাচনি অঙ্গীকার মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, ‘এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যাগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ মুক্তিযুদ্ধের গবেষকদের নিয়ে বিশেষজ্ঞ সভা আয়োজন, বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তার ভিত্তিতে কার্যক্রম গ্রহণ। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে গণহত্যার শিকার এবং সব শহিদের একটি নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য তালিকা প্রণয়ন এবং তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ স্বীকৃতি ও মর্যাদা প্রদান সম্ভব হবে।’

দলীয়করণমুক্ত প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করার বিষয়ে কুড়িগ্রাম-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলামের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনার প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে আমি বলতে চাই, আপনাকে একটু আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল হচ্ছে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গঠিত দল। আপনাকে একই সঙ্গে আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, মাঠে থেকে যুদ্ধ করেছেন এবং শুধু তাই নয়, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণাও দিয়েছিলেন।’

তারেক রহমান বলেন, ‘বর্তমানে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল রয়েছে এবং একটু আগেই বললাম এই দল বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দ্বারা গঠিত এই দল। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিশ্বাস করে মনে-প্রাণে যে, মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাদের পবিত্র একটি দায়িত্ব রয়েছে।

সে কারণেই একটু আগেই আমি বলেছিলাম যে যাদের দায়িত্ব ছিল দেশ স্বাধীনের পরে সঠিকভাবে শহিদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি তালিকা প্রণয়ন করা, তারা সেটিকে রাজনৈতিকভাবে উপস্থাপন করেছে, তারা সেটা নিরপেক্ষভাবে সঠিকভাবে করেনি।’ তিনি বলেন, ‘পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে এই তালিকা তৈরিতে বিভিন্ন রকম সমস্যা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে সরকার চেষ্টা করছে, বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে একটির পূর্ণাঙ্গ সঠিক মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরি করার।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তার শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করাই যথেষ্ট। পূর্ববর্তী সরকার অন্যের স্বার্থ রক্ষায় সেই নীতিই অনুসরণ করেছে। ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী সরকার একটি বিশেষ দেশ ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করেছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি বলেছেন, সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে উভয় খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তার শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করাই যথেষ্ট। পূর্ববর্তী সরকার অন্যের স্বার্থ রক্ষায় সেই নীতিই অনুসরণ করেছে।

শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, বিতর্কিত সিলেবাস ধীরে ধীরে বাদ দিয়ে আধুনিক, মানবিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যেই চলতি বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাত প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পূর্ববর্তী সরকার দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা অকার্যকর করে একটি বিশেষ দেশের চিকিৎসা বাণিজ্যের সুবিধা নিশ্চিত করেছিল। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, চিকিৎসাব্যবস্থা ‘১০১ শতাংশ অসুস্থ’ অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে আগামী পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য খাতেও জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি জানান, রোগ প্রতিরোধভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। এ ছাড়া আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাঁচটি বিভাগে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট পাঁচটি আধুনিক শিশু হাসপাতাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।