নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শেষ বাঁশি বাজতেই শুরু হয়েছিল উৎসব! হাতে বিশ^কাপ ট্রফি, চোখে স্বপ্নপূরণের আনন্দ আর মুখে বিজয়ের হাসিÑ স্পেনের ফুটবলারদের উচ্ছ্বাস যেন বলে দিচ্ছিল, ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান হয়েছে। সেই উদ্যাপন মুহূর্তেই শুরু হয়ে যায় ইয়ামালদের দেশেও, অর্থাৎ পুরো স্পেন মেতে ওঠে সীমাহীন উচ্ছ্বাস-আনন্দে। এই আনন্দে ভিন্নমাত্রা যোগ গতকাল, যখন বিশ^কাপজয়ীদের বিমান অবতরণ করে মাদ্রিদ বিমানবন্দরে।
একদিকে রাজপ্রাসাদের লাল গালিচা সংবর্ধনা, অন্যদিকে সিবেলেস স্কয়ারে লাখো দর্শকের ভালোবাসার ঢল, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের এই রাজকীয় ‘হোমকামিং’ বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে এক অতি-উত্তেজনাপূর্ণ ও দুর্দান্ত ইতিহাস হিসেবে লেখা হয়ে রইল।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরার ২৪ ঘণ্টাও পার হয়নি, এর মধ্যেই বিজয়ী বীরের বেশে স্পেনের মাটিতে পা রেখেছে লাল-হলুদ ব্রিগেড! পরিষ্কার নীল আকাশের নিচে মাদ্রিদ-বারাজাস বিমানবন্দরে যখন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ও অধিনায়ক রদ্রির টিমকে বহনকারী বিশেষ বিমানটি অবতরণ করে, তখন স্থানীয় সময় দুপুর আড়াইটা। সাউথ আফ্রিকার পর দীর্ঘ ১৬ বছর অপেক্ষা শেষে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে ফেরায় পুরো মাদ্রিদ শুধু নয়, সমগ্র স্পেন, যেন এখন এক অঘোষিত জাতীয় উৎসবে মেতে উঠেছে!
ইয়ামাল-রদ্রিরা কখন মাদ্রিদে পা রাখবেনÑ ভক্ত-সমর্থকরা এ নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। অবশেষে গতকাল দেশে ফিরল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন। মাদ্রিদে স্পেনের ফুটবল দলের বিমান অবতরণ করতেই একে একে বেরিয়ে এলেন অধিনায়ক রদ্রি ও কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেসহ অন্যরা। রদ্রি বিমান থেকে নামার আগেই উঁচিয়ে ধরেন সেই গৌরবের প্রতীক ফিফা বিশ^কাপ ট্রফি। মুহূর্তেই সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে ইন্টারনেটে, ঝড় তোলে লাখো সমর্থকের হৃদয়ে। নামার পর স্প্যানিশ অধিনায়ক, কোচ দে লা ফুয়েন্তে, কুকুরেয়া, কুবারসিরা ফটোসেশন করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের পর কোচ, ফুটবলার, সাপোর্টিং স্টাফদের মুখে দেখা গেছে চওড়া হাসি। ১৬ বছর পর বিশ্বকাপ জয় বলে কথা; রাজকীয় বরণ না হলে কি চলে! ১৬ বছর পর ফুটবলের সবচেয়ে বড় শিরোপা ঘরে ফেরায় তাদের হাসিতে ছিল গর্ব, স্বস্তি আর দীর্ঘ অপেক্ষা অবসানের অনুভূতি।
মাদ্রিদ এখন উৎসবের নগরী। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ছাদখোলা বাসে বিজয় শোভাযাত্রার আগে রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলকে সংবর্ধনা জানান। রাজকীয় এই আয়োজন স্পষ্ট করে দিচ্ছে, স্পেনের কাছে এটি শুধু একটি ক্রীড়া সাফল্য নয়; বরং জাতীয় গৌরবের উপলক্ষ।
মাদ্রিদে পা রাখার পর থেকেই স্প্যানিশ তারকাদের জন্য অপেক্ষা করে এক আঁটসাঁট ও রাজকীয় সব কর্মসূচি। প্রথম অফিসিয়াল স্টপ হিসেবে বিকেল সাড়ে ৪টা নাগাদ জারজুয়েলা প্যালেসে স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ এবং রানি লেটিজিয়া সরাসরি বিজয়ী বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রাজকীয় সংবর্ধনা জানান। এরপর সন্ধ্যা ৬টায় পুরো টিম পৌঁছায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘মনক্লোয়া প্যালেসে’। আলজেরিয়া সফররত প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ তড়িঘড়ি করে মাদ্রিদে ফিরে এসে নতুন বিশ্বজয়ী বীরদের স্বাগত জানান।
তবে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য মূল চমকটি অপেক্ষা করে ছিল সন্ধ্যা ৭টায়! মনক্লোয়া প্যালেস থেকে শহরজুড়ে শুরু হয় বিজয়ী দলের ঐতিহাসিক ছাদখোলা বাস প্যারেড। এই প্যারেডের মূল গন্তব্য ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ঐতিহ্যবাহী ‘প্লাজা দে সিবেলেস’, যেখানে সন্ধ্যা ৬টা থেকেই শুরু হয় বিশাল মিউজিক্যাল কনসার্ট ও উল্লাসের ঝঙ্কার।
বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি ছিল লামিনে ইয়ামালের পরিবারের সঙ্গে উদযাপন। মাঠেই ছোট ভাই কেইনকে নিয়ে ট্রফি হাতে দৌড়েছেন এই তরুণ তারকা। কখনো ভাইয়ের কোলে লাফিয়ে উঠেছেন কেইন, কখনো নিজেই হাতে নিয়েছেন বিশ্বকাপ ট্রফি। মাত্র ১৯ বছর বয়সে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সেই মুহূর্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আনন্দ-আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইয়ামাল, গাভি, কুবারসি ও কুকুরেয়াদের সঙ্গে ছোট্ট কেইনের ফুটবল খেলাও হয়ে উঠেছে বিশ্বজয়ের অন্যতম হৃদয়ছোঁয়া দৃশ্য।
১৬ বছর পর বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ঘরে ফেরা তাই শুধু ট্রফি নিয়ে ফেরার গল্প নয়। এটি এমন এক দেশের গল্প, যেখানে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে উৎসব করছে, রাজপ্রাসাদ প্রস্তুত বিজয়ীদের বরণে, আর একই সময়ে একটি দুর্ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছেÑ সবচেয়ে বড় আনন্দের মধ্যেও জীবন কখনো কখনো অপ্রত্যাশিত মোড় নেয়।
তবে আনন্দের এই আবহে নেমে এসেছে বেদনার ছায়াও। বিশ্বকাপ জয়ের উদযাপন চলাকালে স্পেনের পশ্চিমাঞ্চলে একটি ফোয়ারার কাঠামো ধসে পড়ে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। যে রাতে পুরো দেশ আনন্দে মেতেছিল, সেই রাতই একটি পরিবারের জন্য হয়ে উঠেছে গভীর শোকের। বিশ্বজয়ের উৎসবের মাঝেও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে স্পেন। কিন্তু ট্রফি জয়ের পরের ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিল, ফুটবল শুধু মাঠের ৯০ বা ১২০ মিনিটের গল্প নয়। এটি মানুষের আবেগ, পরিবারের আনন্দ, একটি জাতির গর্ব এবং কখনো কখনো অনাকাক্সিক্ষত বেদনারও নাম।

