ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মোজাফফর গ্রেপ্তার

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ২৪, ২০২৬, ০৬:১১ এএম

অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী মানবতাবিরোধী অপরাধের যে মামলায় কারাগারে আছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকা-ে আলোচিত মোজাফফর হোসেনকে সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনাল এই অবসরপ্রাপ্ত মেজরকে দুদিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে। এদিকে, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার আসামি মোজাফফর হোসেনের পেছনে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রশ্রয় ছিল বলে অভিযোগ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ শুনানি নিয়ে এই আদেশ দিয়েছেন। এ ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেনÑ বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম।

শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার দেখানোর পাশাপাশি তদন্ত সংস্থাকে পরপর দুই দিন বা সুবিধা অনুযায়ী এক দিন করে দুই দিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মোজাফফর হোসেনকে সেনা হেফাজতে রাখার আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে।

সাবেক সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে চলতি বছরের ২৩ মার্চ গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রথমে তাকে অর্থ আত্মসাৎ ও মানব পাচারের মামলায় রিমান্ডে নেওয়া হলেও পরে মে মাসে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ফেনীতে হত্যার ঘটনায় এ মামলা ট্রাইব্যুনালে আসে। আর সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। এদিকে গত ১৫ জুলাই রাতে বনানী ডিওএইচএসের এক বাড়ি থেকে মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়; পরে তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ফেনীতে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফরকে জড়ানোর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে তদন্ত কর্মকর্তা কাজ শুরু করেন। তখন ‘ঝন্ডু’ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র পাওয়া যায়। পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি, সেই ঝন্ডু আর কেউ নন, তিনি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন। জুলাইয়ের আন্দোলন চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সময় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং মোজাফফরের মধ্যে অনেকবার কথোপকথন হয়েছে।

প্রধান কৌঁসুলি বলেন, আমরা তথ্য পাচ্ছি যে, তিনি (মোজাফফর) ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বহুবার পার্শ্ববর্তী দেশে যাতায়াত করেছেন। বাংলাদেশে আত্মগোপনে থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ সরকারের সাথে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল। জুলাই আন্দোলনে মানবতাবিরোধী যেসব অপরাধ হয়েছে, সেখানে অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন।

সুনির্দিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তারের পদ্ধতিগত বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘ট্রাইব্যুনালে কাউকে সুনির্দিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তার করার বিধান নেই। সন্দেহভাজন কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রসিকিউশন একটি ‘মিসকেস’ (বিবিধ মামলা) দায়ের করে। সেই প্রক্রিয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের পর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।

এদিন সকাল ৯টা ২০ মিনিটের দিকে মোজাফফর হোসেনকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট জেনারেলের অফিস থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এ ছাড়া সকালে এ মামলার অপর আসামি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেও ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল।

মোজাফফর হোসেনের বর্তমান হেফাজত সম্পর্কে আমিনুল ইসলাম বলেন, তিনি বর্তমানে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন এবং সেনা আইনেই তার বিরুদ্ধে অন্য একটি কার্যক্রম চলছে। জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে পুনরায় সেনা হেফাজতেই ফেরত পাঠানো হবে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার ঘটনার পর থেকে পলাতক ছিলেন তখনকার মেজর মোজাফফর হোসেন। সে সময় তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল। জিয়া হত্যাকা-ের পর চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় পুলিশ যে মামলা করেছিল, তাতে ছয় নম্বর আসামি ছিলেন মেজর মোজাফফর। এজাহারে বলা হয়েছিল, হত্যাকা-ের সময় রাষ্ট্রপতির কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালে সিআইডি মামলার রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থতা স্বীকার করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।

প্রধান কৌঁসুলি বলেন, জিয়াউর রহমান হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন মোজাফফর হোসেন এবং সেনাবাহিনী থেকে তিনি পলাতক ছিলেন। প্রায় ৪৫ বছর পলাতক থাকার পর গত ১৫ জুলাই রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরদিন তাকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মোজাফফর হোসেনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার জন্য মঙ্গলবার আবেদন করেছিল প্রসিকিউশন। ট্রাইব্যুনাল সে আবেদন মঞ্জুর করে।

অন্যদিকে, গতকাল বৃহস্পতিবার নিজ কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলনে জিয়াউর রহমান হত্যাকা-ের অন্যতম আসামির সঙ্গে কার কী ধরনের যোগসাজশ ছিল, তা তদন্তে উঠে আসবে কি নাÑ জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, প্রথমত মোজাফফর হোসেন দীর্ঘ বছর পলাতক ছিলেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত সত্ত্বেও তিনি এক দেশ থেকে আরেক দেশে অবাধে যাতায়াত করেছিলেন। বাংলাদেশেও নির্বিঘেœ চলাফেরা করেন। এ দেশের টেলিফোনের মাধ্যমে তৎকালীন (আওয়ামী লীগ) সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। থাকতেন অভিজাত এলাকায়। সরকারের প্রশ্রয় বা সংশ্লিষ্টতা না থাকলে এসব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক রেখেছেন, তা অনুমান করে নিতে হবে। আমরা মনে করি, তৎকালীন সরকারের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল। এর মধ্য দিয়েই মানবতাবিরোধী অপরাধে অংশ নিয়েছেন মোজাফফর হোসেন। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মতো দুষ্কৃতকারীদের সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক ছিল।

আমিনুল ইসলাম বলেন, জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় সেনা আইনে তার বিচার হবে। এর সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমাদের তদন্ত চলছে মানবতাবিরোধী অপরাধের। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের কর্মকা-ে তার কী সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, সেটিই আমরা দেখব। অর্থাৎ আমাদের বিচারের কার্যক্রম পুরোপুরি আলাদা। তবে তিনি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে থাকবেন। আমাদের প্রয়োজনমতো সেখান থেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করব। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ট্রাইব্যুনালের প্রচলিত আইনে বিচার চলবে।