জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সাভারে এমআইএসটি শিক্ষার্থী আসহাবুল ইয়ামিন হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সেইসাথে পলাতক ১৩ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। এ ছাড়া অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকা আসামিদের আগামী ২৫ আগস্ট হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ অভিযোগ আমলে নেয়। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেনÑ বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তিনি প্রাথমিক অভিযোগ আমলে নেওয়ার পাশাপাশি আসামিদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা ও হাজিরা পরোয়ানা জারির আবেদন করেন। ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেন, ট্রাইব্যুনাল ভিডিও পর্যালোচনা করে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দিয়েছেন।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাইয়ে ওই ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় অত্যন্ত হৃদয়বিদারক যে ঘটনাটি ঘটেছিল, সেটি ছিল আসহাবুল ইয়ামিনকে একটি এপিসির ওপর থেকে গুলি করে ফেলে দেওয়া। পরে তাকে টেনেহিঁচড়ে রাস্তার অপর পাশে হাসপাতালে ফেলে রাখা হয়। সেখান থেকে লোকজনের সহায়তায় হাসপাতালে নেওয়া হলে তিনি মারা যান। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি সারা পৃথিবীর বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতেই সারা দেশের মানুষ তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে এবং দলমত নির্বিশেষে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শরিক হয়। এ ঘটনার পরই ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়।
মামলায় অভিযুক্ত ১৯ জন হলেনÑ ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম, ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আব্দুল্লাহিল কাফী, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক এসপি আসাদুজ্জামান রিপন, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) শাহিদুল ইসলাম, সাভার থানার সাবেক ওসি মো. শাহজামান, আশুলিয়া থানার সাবেক ওসি এএফএম সায়েদ, এএসআই মোহাম্মদ আলী, নায়েক সুহেল মিয়া, কনস্টেবল মাহফুজ মিয়া, সাভার উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজিব, আতিকুর রহমান, ফখরুল আলম সমর, মেহেদী হাসান তুষার, রাজু আহম্মেদ, মো. ফরিদ, জামান খান, মিজানুর রহমান জিএস মিজান ও শরীফ আশরাফুল আলম বাবুল।
এদের মধ্যে আব্দুল্লাহিল কাফী, শাহিদুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী, সোহেল, মিজানুর রহমান ও মাসুদ মিয়ার বিরুদ্ধে হাজিরা পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে কাফীকে ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর গত ৯ সেপ্টেম্বর তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বাকি আসামিরা পলাতক। নিহত শাইখ আসহাবুল ইয়ামিন মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই পুলিশ ও আওয়ামী লীগ কর্মীরা সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা করে। তারা ইয়ামিনকে ধরে পুলিশের সাঁজোয়া যানের কাছে টেনে নিয়ে যায়। পরে তার বুকের বাঁ পাশে গুলি করা হয়। এরপর দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা ইয়ামিনকে টেনে সাঁজোয়া যানের ওপরে ফেলে রেখে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে ভয় দেখানোর জন্য গাড়ি নিয়ে টহল দেয়। একপর্যায়ে ইয়ামিনকে প্রায় মৃত অবস্থায় রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয় এবং সাঁজোয়া যানের ভেতর থেকে একজন পুলিশ সদস্যকে তার পায়ে আবারও গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই পুলিশ সদস্য ইয়ামিনকে মৃত ভেবে পায়ে গুলি না করে রাস্তার একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে টেনে নিয়ে রোড ডিভাইডারের পাশে ফেলে দেয়। পরে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ইয়ামিনকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট ঢাকার হাকিম আদালতে মামলা করেন ইয়ামিনের মামা আব্দুল্লাহ আল কাবির। মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, ঢাকার এসপি আসাদুজ্জামান, এএসপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্ ও ট্রাফিক, উত্তর বিভাগ) আব্দুল্লাহিল কাফী, এএসপি (সাভার সার্কেল) শাহিদুর রহমানসহ ৪৯ জনকে আসামি করা হয়েছিল।

