রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সায় বা সবুজ সংকেত থাকার পাশাপাশি দলগতভাবে সেই সময়ের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সরাসরি জড়িত থাকার শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে। ১৬ বছর আগের ওই নারকীয় হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত এবং এর পেছনে প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র ও হাসিনার আত্মীয় শেখ ফজলে নূর তাপস। একই সঙ্গে এতে বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথাও বলা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
বিডিআর বিদ্রোহের নামে সংঘটিত বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের বিষয় তদন্তের জন্য গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল রোববার জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান ও অন্য সদস্যরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেন। কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন- মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার (অব.), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাইদুর রহমান বীর প্রতীক (অব.), মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ যুগ্ম সচিব (অব.), ড. এম আকবর আলী ডিআইজি (অব.), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন।
গত রাতে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এসব তথ্য জানান। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিডিআর হত্যাকা-ের ঘটনায় জাতি দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকারে ছিল। আপনারা সত্য উদঘাটনে যে ভূমিকা রেখেছেন, জাতি তা স্মরণে রাখবে। জাতির পক্ষ থেকে আপনাদের প্রতি ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ইতিহাসের এই ভয়াবহতম ঘটনা নিয়ে জাতির অনেক প্রশ্ন ছিল, এ কাজের মধ্য দিয়ে সেই সব প্রশ্নের অবসান ঘটবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই প্রতিবেদনে শিক্ষণীয় বহু বিষয় এসেছে। জাতির জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে এটি। কমিশনের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান বলেন, তদন্তকাজ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও ত্রুটিমুক্ত করার স্বার্থে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব বজায় রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন কাজ শুরু করি, তখন ১৬ বছর আগের এ ঘটনার বহু আলামত ধ্বংস হয়ে গেছে। এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকে বিদেশে চলে গেছেন।’
‘আমরা দুটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছি। সাক্ষীদের ডাকলাম, কারো কারো আট ঘণ্টা পর্যন্ত বক্তব্য শুনেছি আমরা। যতক্ষণ তিনি বলতে চেয়েছেন। যারা তদন্তে জড়িত ছিলেন, তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের তদন্তের রিপোর্ট কালেক্ট করেছি, অন্যান্য এলিমেন্ট কালেক্ট করেছি।’ তিনি বলেন, এই তদন্তের মাধ্যমে বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে জনমনে থাকা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে, উদঘাটনের চেষ্টা করা হয়েছে কার কী ভূমিকা ছিল। কেন সেনাবাহিনী দাঁড়িয়ে থাকল, অ্যাকশন নিল না। ফজলুর রহমান বলেন, তদন্তে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সরাসরি জড়িত থাকার শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে।
এ সময় কমিশনের ফাইন্ডিংস সম্পর্কে জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার বলেন, এ ঘটনার কিছু বাহ্যিক ও প্রকৃত কারণ বের করেছে কমিশন। তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত এবং এর পেছনে প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন শেখ ফজলে নূর তাপস।
তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের রক্ষা করতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। তারা ২০-২৫ জনের একটি মিছিল নিয়ে পিলখানায় ঢুকেছে এবং বের হওয়ার সময় সেই মিছিলে দুই শতাধিক মানুষ ছিল।
জাহাঙ্গীর কবির বলেন, পুরো ঘটনা সংঘটিত করার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিল। তিনি এ ঘটনার দায় নিরূপণের ক্ষেত্রে বলেন, দায় তৎকালীন সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সেনাপ্রধানেরও। এ ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুলিশ ও র্যাব এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও রয়েছে চরম ব্যর্থতা।
তিনি বলেন, ওই ঘটনার সময় কিছু প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং কয়েকজন সাংবাদিকের ভূমিকা ছিল অপেশাদার। ‘ওই হত্যাকাণ্ডের সময় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) যেসব বিডিআর সদস্যের সঙ্গে শেখ হাসিনা বৈঠক করেছেন, তাদের সঠিক নাম-পরিচয় ও তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি।’ তিনি বলেন, কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ করে, যেন ভবিষ্যতে বাহিনীগুলোতে এ ধরনের ঘটনা এড়ানো যায় এবং এ ঘটনার ভিকটিমরা ন্যায়বিচার পান।
এ সময় অন্যদের মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ ও স্বরাষ্ট্রসচিব নাসিমুল গনি উপস্থিত ছিলেন।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদর দপ্তরে বিদ্রোহের নামে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে এর বিচার করা হলেও এ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। প্রথম থেকেই দাবি ওঠে নতুন করে বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও নিরপেক্ষ বিচারের। শেখ হাসিনার সরকার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে এলে ওই ঘটনা নতুন করে পুনঃতদন্তের দাবি ওঠে। গত ২৪ ডিসেম্বর জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়, যেটির সময় পরে কয়েক দফা বাড়ানো হয়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন