ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

কার মাথায় উঠবে মুকুট?

মিনহাজুর রহমান নয়ন
প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২৬, ০৬:০৬ এএম

উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ ভূখ-ে ফুটবল মহাযজ্ঞের দামামা বেজে উঠেছে।  এবারের আসরে ট্রফি জয়ের সমীকরণটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জটিল। ফুটবল ইতিহাসের চিরাচরিত নিয়মেই প্রতিটি বিশ্বকাপের আগে কিছু দলকে গণমাধ্যম ও সমর্থকেরা কাগুজে বাঘ বা ফেভারিট হিসেবে শতাব্দীর সেরা তকমা দিয়ে দেয়। কিন্তু মাঠের সবুজ গালিচায় আদিম লড়াই শুরু হলে সমস্ত হিসাব-নিকাশ উল্টে দিয়ে অন্ধকার থেকে আলোতে বেরিয়ে আসে কিছু ডার্ক হর্স। একদিকে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী পরাশক্তিদের সিংহাসন ধরে রাখার আদিম দ্বৈরথ, অন্যদিকে ডাগআউটের মগজ খাটানো আধুনিক ট্যাকটিক্সের নিখুঁত বাস্তবায়ন; এই দুইয়ের সমন্বয়েই নির্ধারিত হতে যাচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপের ভাগ্য।

চ্যাম্পিয়নদের মুকুট রক্ষার পরীক্ষা

গত আসরের বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনা এবার নামছে তাদের মুকুট ধরে রাখার কঠিনতম মিশনে। লিওনেল মেসির জাদুকরী ছোঁয়া আর লিওনেল স্কালোনির সুসংহত দলীয় রসায়নে আলবিসেলেস্তেরা নিঃসন্দেহে কাগুজে বাঘের তালিকায় ওপরের দিকেই থাকবে। তবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের জন্য ইতিহাস সব সময়ই একটু নিষ্ঠুর। অন্যদিকে, ইউরোপের পরাশক্তি ফ্রান্স, জার্মানি ও ইংল্যান্ড কিংবা লাতিনের অন্যতম দাবিদার ব্রাজিল-প্রত্যেকেই মুখিয়ে আছে বিশ্বফুটবলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের অধিনস্থ করতে।

লাতিন-ইউরোপ দ্বৈরথ

বিগত দুই দশক ধরে বিশ্বকাপ ফুটবলে ইউরোপীয় দলগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে কাতার বিশ্বকাপে লাতিন আমেরিকা লাস্ট হাসিটা হেসেছিল। এবার সেই মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই আরও তীব্র। ব্রাজিলের সাম্বা ছন্দ বনাম ফরাসিদের অতিমানবীয় গতি, কিংবা স্পেনের টিকিটাকার আধুনিক সংস্করণ বনাম আর্জেন্টিনার লড়াকু ফুটবল, এই চিরন্তন দ্বৈরথই টুর্নামেন্টের মূল আকর্ষণ। তবে এই ফেভারিটদের গলার কাঁটা হতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত বিশ্বফুটবলের নতুন কিছু শক্তি।

ডার্ক হর্স ও জায়ান্ট কিলার

বিশ্বকাপের পরিধি বাড়ার কারণে এবার এমন কিছু দল মূল মঞ্চে এসেছে, যারা যেকোনো মুহূর্তে বড় বড় পরাশক্তিদের টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এবারের আসরে ডার্ক হর্স বা জায়ান্ট কিলার হিসেবে ফুটবল প-িতদের নজর কাড়ছে উরুগুয়ে এবং কলম্বিয়া। মার্সেলো বিয়েলসার অধীনে উরুগুয়ে এখন ভয়ংকর গতিশীল ফুটবল খেলছে, যারা হাই-প্রেসিং দিয়ে প্রতিপক্ষকে শ্বাসরোধ করে মারতে ওস্তাদ। লাতিন আমেরিকার এই দলটিকে ফেভারিটরা কেউই হালকাভাবে নেওয়ার সাহস দেখাবে না।

ইউরোপের আঙিনা থেকে ডার্ক হর্স হিসেবে সবচেয়ে বড় হুমকি অস্ট্রিয়া। রালফ রাংনিকের মডার্ন ট্যাকটিক্যাল দর্শনে দীক্ষিত অস্ট্রিয়ানরা গত এক বছরে ইউরোপের বড় দলগুলোকে নাচিয়ে ছেড়েছে। তাদের নিখুঁত গেগেনপ্রেসিং এবং বল কেড়ে নেওয়ার পর দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়ার প্রবণতা যেকোনো কাগুজে বাঘকে মাটিতে নামিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট।

মডার্ন ট্যাকটিক্স

আধুনিক ফুটবল আর কেবল ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়; মাঠের ভেতরের ৯০ মিনিটের লড়াইয়ের ভাগ্য এখন অনেককাংশেই নির্ধারিত হয়ে যায় ডাগআউটে বসা কোচদের ল্যাপটপের স্ক্রিনে এবং ট্যাকটিক্যাল বোর্ডে। এবারের বিশ্বকাপে দলগুলোর মূল যুদ্ধটা হবে ফুটবলীয় দর্শনের। যে কোচ যত নিখুঁতভাবে প্রতিপক্ষের ফাঁদ ধরতে পারবেন, জয়ের পাল্লা তার দিকেই ঝুঁকবে। আধুনিক ফুটবলের তিনটি প্রধান কৌশল এবার দলগুলোর ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করবে-

ইনভার্টেড ফুলব্যাক : রক্ষণভাগের পাশ থেকে খেলা ডিফেন্ডাররা (যেমন রাইট ব্যাক বা লেফট ব্যাক) এখন আর কেবল উইং দিয়ে ওপরে ওঠেন না। বল যখন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তখন তারা মাঝমাঠে চলে এসে অতিরিক্ত মিডফিল্ডার হিসেবে কাজ করেন। এতে মাঝমাঠে আধিপত্য বিস্তার করা সহজ হয় এবং প্রতিপক্ষের কাউন্টার অ্যাটাক মাঝপথেই থামিয়ে দেওয়া যায়।

হাই-প্রেসিং : বল হারানোর ঠিক ৪ থেকে ৫ সেকেন্ডের মধ্যে প্রতিপক্ষের ওপর পঙ্গপালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে বল পুনর্দখল করার কৌশল। অস্ট্রিয়া বা উরুগুয়ের মতো দলগুলো এই কৌশলে প্রতিপক্ষকে নিজেদের হাফে থিতু হতেই দেয় না।

ফলস নাইন : প্রথাগত স্ট্রাইকার বা নম্বর নাইন পজিশনে কেউ না খেলে, আক্রমণভাগের মূল খেলোয়াড়টি নিচে নেমে এসে মাঝমাঠের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেন। এতে প্রতিপক্ষের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডাররা বিভ্রান্ত হয়ে নিজেদের পজিশন ছেড়ে বেরিয়ে আসে এবং সেই ফাঁকা জায়গায় উইঙ্গাররা ভেতরে ঢুকে গোল করেন।

ক্ষমতার রূপান্তর

আধুনিক ফুটবলে ট্যাকটিক্যাল সচেতনতা এতটাই বেড়ে গেছে যে, ছোট এবং বড় দলের মধ্যকার ব্যবধান এখন ঘুচে এসেছে। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনাল মঞ্চে শেষ পর্যন্ত কার মাথায় উঠবে মুকুট?

বিজ্ঞান এবং ট্যাকটিক্সের এই মগজ যুদ্ধে যে দল নিজেদের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে মাঠের কৌশলগুলো সবচেয়ে নিখুঁতভাবে রূপায়ণ করতে পারবে, শেষ হাসি তারাই হাসবে। ওল্ড স্কুল বা প্রথাগত ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ আধুনিক, গতিময় এবং ট্যাকটিক্যাল ফুটবলের প্রদর্শনী। ডাগআউটের এই বুদ্ধির খেলায় শেষ পর্যন্ত কোন মাস্টারমাইন্ড বাজিমাত করেন, তার উত্তর দেবে মাঠের লড়াই।