ফুটবলের সৌন্দর্য শুধু গোলে নয়, নাটকীয়তায়। এই খেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণই হলো, একটি মুহূর্ত, একটি সিদ্ধান্ত কিংবা একজন মানুষের অসাধারণত্ব মুহূর্তের মধ্যে বদলে দিতে পারে পুরো গল্পের পরিণতি। নব্বই মিনিটের ক্লান্তিকর যুদ্ধের শেষে কখনও একজন খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন হাজারো মানুষের কান্না, আবার কখনো কোটি মানুষের হাসির কারণ। ইতিহাসের পাতায় এমন নায়কের অভাব নেই। কিন্তু প্রতিটি প্রজন্মেরই একজন করে নায়ক থাকে, যিনি সংকটের সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তে আলো হাতে সামনে দাঁড়ান। এই প্রজন্মের ইংল্যান্ডের জন্য সেই নামটি নিঃসন্দেহে হ্যারি কেইন। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে বিশ্বকাপের ম্যাচটি ছিল কেবল শেষ ষোলোয় ওঠার লড়াই নয়, এটি ছিল ইংল্যান্ডের আত্মবিশ্বাস, মানসিক দৃঢ়তা এবং বিশ্বকাপ স্বপ্নের অস্তিত্ব রক্ষার পরীক্ষা। নব্বই মিনিটের সেই নাটকে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে ইংল্যান্ড, কিন্তু ম্যাচটি দেখার পর একটি বিষয় নিয়ে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয় যে, ইংল্যান্ড জিতেছে, কারণ তাদের দলে হ্যারি কেইন নামে একজন মানুষ আছেন। সময়ের কাঁটা যত এগোচ্ছিল, ইংল্যান্ডের সমর্থকদের হৃৎস্পন্দনও যেন তত দ্রুত হচ্ছিল।
স্কোরবোর্ডে পিছিয়ে থাকা ইংল্যান্ডকে দেখে মনে হচ্ছিল, আবারও বুঝি একটি বিশ্বকাপ অসমাপ্ত স্বপ্নের গল্প হয়ে থাকবে। মাঠে ছিল অস্থিরতা, আক্রমণে ছিল পরিকল্পনার অভাব, আর প্রতিপক্ষ ডিআর কঙ্গো খেলছিল নিজেদের ইতিহাস লেখার সাহস নিয়ে। ইংল্যান্ডের সমর্থকদের চোখের সামনে তখন ফিরে আসছিল অতীতের ব্যর্থতার ছবি। ১৯৯০-এর সেমিফাইনালের কান্না, ১৯৯৮-এ পেনাল্টির হতাশা, ২০০৬-এর অশ্রু ২০১৬ ইউরোতে আইসল্যান্ডের কাছে লজ্জাজনক বিদায়, সব ব্যর্থতা যেন আবারও ফিরে আসছিল। ‘ইটস কামিং হোম’ ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্লোগানটি তখন আবারও ব্যঙ্গের প্রতীক হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু বড় খেলোয়াড়েরা অপেক্ষা করেন না; তারা অপেক্ষার অবসান ঘটান। ম্যাচের ৭৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের নিখুঁত ক্রসটি যখন বাতাসে ভাসছিল, তখনও হয়তো কেউ বুঝতে পারেনি যে পরের কয়েক সেকেন্ডেই ম্যাচের ভাগ্য বদলে যাবে।
কেইনের হেডটি ছিল নিখুঁত। শক্তি, ভারসাম্য, টাইমিংÑ একজন বিশ্বমানের নম্বর নাইন যা যা করতে পারেন, তার সবই ছিল সেই মুহূর্তে। বল জালে জড়াতেই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল ইংল্যান্ড। কিন্তু কেইনের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু সমতা ফেরানোয় নয়। ম্যাচের ৮৬ মিনিটে তিনি যা করলেন, সেটি একজন স্ট্রাইকারের ব্যক্তিগত শিল্পকর্ম। গোলের দিকে পিঠ দিয়ে বল গ্রহণ, চারজন ডিফেন্ডারের ভিড়ের মাঝেও অসাধারণ প্রথম টাচ, শরীর ঘুরিয়ে ক্ষণিকের জন্য তৈরি করা সামান্য জায়গা, তারপর বজ্রগতির শট। যে শটে গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি শুধু তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি।
গোলটি ছিল না শুধু একটি গোল। এটি ছিল একজন কিংবদন্তির স্বাক্ষর।
জন্মগত প্রতিভা নন, কঠোর পরিশ্রমের আরেক নাম। হ্যারি কেইনের গল্পটি তাই ফুটবলের রূপকথার প্রচলিত গল্প নয়। লিওনেল মেসি কিংবা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো ছোটবেলা থেকেই বিশ্বজোড়া আলোচনার কেন্দ্র ছিলেন না তিনি। কিশোর বয়সে তাকে দেখে কেউ বলেনি, এই ছেলেটিই একদিন বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকার হবে। বরং বাস্তবতা ছিল উল্টো।
শৈশবে আর্সেনালের একাডেমি থেকে বাদ পড়েছিলেন। টটেনহামেও প্রথম দিকে ছিলেন না মূল দলে। একের পর এক ধারে খেলেছেন লেটন ওরিয়েন্ট, মিলওয়াল, নরউইচ সিটি ও লেস্টার সিটির মতো ক্লাবে। তাকে নিয়ে প্রশ্ন ছিল অসংখ্য, গতি কম, শারীরিক সক্ষমতা সীমিত, বড় ম্যাচে পারবেন তো?
কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উত্তরগুলো দেওয়া হয় মাঠে। আর সেই উত্তরই বছরের পর বছর দিয়ে চলেছেন হ্যারি কেইন। নিজেকে বদলে ফেলার এক বিরল গল্প। অনেক ফুটবলার প্রতিভা নিয়ে জন্মান। কিন্তু কেইন নিজেকে তৈরি করেছেন। প্রতি মৌসুমে নিজের খেলায় নতুন কিছু যোগ করেছেন।
শুধু গোল করাই নয়, খেলা তৈরি করা, মাঝমাঠে নেমে বল বিতরণ, সতীর্থদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি, দুই পায়ে সমান দক্ষ ফিনিশিং, দূরপাল্লার শট, হেডিং, ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠেছেন আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে পরিপূর্ণ স্ট্রাইকারদের একজন। তিনি সেই বিরল ফরোয়ার্ড, যিনি একই সঙ্গে গোলদাতা, প্লেমেকার এবং নেতা। পরিসংখ্যান বলবে, তিনি ইংল্যান্ডের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ইতিহাস বলবে, তিনি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের অন্যতম সফল অধিনায়ক। কিন্তু সংখ্যার বাইরেও তার মূল্য আরও বড়। তিনি কখনো অতিরিক্ত নাটক করেন না, অযথা আবেগ দেখান না, বিতর্ক তৈরি করেন না। মাঠে তার ভাষা একটাই, পারফরম্যান্স। গতকালের ম্যাচেও সেটাই দেখা গেল। দল যখন ভেঙে পড়ার উপক্রম, তখন তিনিই সবাইকে বিশ্বাস করালেন ম্যাচ এখনো শেষ হয়নি। এটাই একজন অধিনায়কের আসল পরিচয়। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে জোড়া গোল করে শুধু ম্যাচ জেতাননি তিনি। বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা নিয়ে পৌঁছে গেছেন ১৩-তে। ছাড়িয়ে গেছেন ফুটবলের ইতিহাসের এক কিংবদন্তিকেও। এবারের আসরে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচে। জোড়া গোলের পথে বিশ্বকাপে গোলসংখ্যায় পেলেকে ছাড়িয়ে গেছেন কেইন। পেলের ১২ গোল ছাপিয়ে ইংলিশ অধিনায়কের গোল ১৩টি। এবারের আসরেও যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতাও কেইন। আর্লিং হলান্ডের মতো তার গোলও ৫টি। ৬টি করে নিয়ে শীর্ষে লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে।
চলতি মৌসুমে কেইনের ৭২ গোল এসেছে মাত্র ৬২ ম্যাচে। বায়ার্নের হয়ে গোল করেছেন ৬১টি, বাকি ১১টি ইংল্যান্ডের হয়ে। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ইংল্যান্ডের জার্সিতে কেইনের এমন ফর্ম, সব মিলিয়ে তার ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুমই এটি। ২০১৮ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জয়, একের পর এক বড় টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডের ত্রাতা হয়ে ওঠা, ক্লাব ফুটবলে অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা, সব মিলিয়ে হ্যারি কেইন এখন শুধু একজন স্ট্রাইকার নন; তিনি একটি যুগের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
সামনে আজতেকা, সামনে ইতিহাস এখন অপেক্ষা আরও কঠিন পরীক্ষার। শেষ ষোলোতে প্রতিপক্ষ স্বাগতিক মেক্সিকো। ভেন্যু সেই কিংবদন্তির আজতেকা স্টেডিয়াম। এই মাঠের নাম শুনলেই ইংল্যান্ডের সমর্থকদের মনে ফিরে আসে ১৯৮৬ সালের সেই কালো বিকেল। ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত দুই মুহূর্তের সাক্ষী এই স্টেডিয়াম।
চার দশক ধরে সেই স্মৃতি ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে এক অমোচনীয় ক্ষত হয়ে আছে। কিন্তু ইতিহাসেরও একটি স্বভাব আছে। সে নতুন নায়কের অপেক্ষা করে। হয়তো এবার সেই নায়কের নাম হ্যারি কেইন। একটি জাতির স্বপ্নের নাম। ফুটবলে অনেক বড় স্ট্রাইকার এসেছেন। অনেকে বেশি গোল করেছেন, অনেকে বেশি শিরোপা জিতেছেন। কিন্তু খুব কম খেলোয়াড়ই আছেন, যাদের উপস্থিতি একটি জাতিকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস করতে শেখায়।
হ্যারি কেইন সেই বিরলদের একজন। তাকে দেখলে মনে হয়, ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছুই শেষ নয়। তার চোখে দেখা যায় পরাজয় মেনে না নেওয়ার এক অদম্য জেদ। তার পায়ে বল থাকলে ইংল্যান্ডের কোটি সমর্থক এখনো বিশ্বাস করে, অসম্ভব বলে কিছু নেই।
গতকালের ম্যাচটি তাই শুধু দুটি গোলের গল্প নয়। এটি একজন নেতার গল্প। একজন যোদ্ধার গল্প। একজন মানুষের গল্প, যিনি প্রতিবারই প্রমাণ করেন, মহান ফুটবলাররা শুধু গোল করেন না, তারা সময়ের গতিপথও বদলে দেন। আর তাই ইংল্যান্ডের সমর্থকেরা আজও নিশ্চিন্তে বলতে পারেন যতক্ষণ হ্যারি কেইন মাঠে আছেন, ততক্ষণ ইংল্যান্ডের স্বপ্নও বেঁচে আছে।

