এক সময় জংলি ফল হিসেবে পরিচিত টক-মিষ্টি স্বাদের লটকন এখন নরসিংদী জেলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ফসল। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফলটি স্থানীয় কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে, এনেছে আর্থিক সচ্ছলতা। লাভজনক হওয়ায় জেলায় প্রতি বছরই লটকনের বাণিজ্যিক আবাদ ও নতুন বাগানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, লটকনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলোÑ এর কোনো দৃশ্যমান ফুল বা পাপড়ি ঝরে পড়ে না; সরাসরি গাছের কা- ও শাখা-প্রশাখা থেকে ছড়ার মতো ফল ধরে। স্থানীয়ভাবে এটি ‘বুগি’ নামেও পরিচিত। ইতোমধ্যে লটকন নরসিংদীর জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্যের স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, লটকনে ভিটামিন বি-টু, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও লৌহসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। মাত্র কয়েকটি লটকনই দৈনন্দিন ভিটামিন সি-এর চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে সক্ষম।
সূত্র জানায়, জেলার শিবপুর, বেলাবো, রায়পুরা ও মনোহরদী উপজেলার লালমাটি অঞ্চল লটকন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে লটকনের বাগান করা হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১৫ টন হিসেবে মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টন, যার বাজারমূল্য ২৪০ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। জেলার শিবপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নকে ‘লটকনের রাজা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এখানকার সমতল ও পাহাড়ি উভয় ধরনের জমিতেই লটকনের ব্যাপক আবাদ হয়ে থাকে।
চর-বেলাবো গ্রামের চাষি মো. হযরত আলী জানান, প্রায় ৩০ বছর আগে বেলাব উপজেলার লাখপুর গ্রামে মৃত হাছেন আলী ভূঁইয়া প্রথম লটকন চাষ শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে বেলাবো ও শিবপুরের লালমাটি এলাকায় এর বিস্তার ঘটে।
তিনি আরও জানান, লটকন চাষে খরচ ও ঝুঁকি তুলনামূলক কম। বেলে ও দো-আঁশ মাটিতে চারা রোপণের তিন বছরের মধ্যেই ফলন পাওয়া যায় এবং গাছ ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত ফল দিয়ে থাকে। ফল সংগ্রহের প্রায় ৬০ দিন আগে প্রতি গাছে ৫০ গ্রাম পটাশ মিশ্রিত পানি দিলে ফলের আকার ও মিষ্টতা বৃদ্ধি পায়।
বাজারজাতকরণ পদ্ধতিও বেশ অনন্য। সাধারণত কাঁচা অবস্থাতেই মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বাগান মালিকদের কাছ থেকে পুরো বাগান পাইকারি দরে কিনে নেন। বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ লটকন তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। ২০০৮ সাল থেকে নরসিংদীর লটকন দেশের চাহিদা মিটিয়ে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা এসে এখান থেকে লটকন সংগ্রহ করে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করছেন।
বেলাবো উপজেলার পাহাড় উজিলাব গ্রামের চাষি ইঞ্জিনিয়ার বাচ্চু মিয়া জানান, তার ৬০ বিঘার বাগান থেকে ইতোমধ্যে প্রায় ৪৯ লাখ টাকার লটকন বিক্রি হয়েছে। একইভাবে লাখপুর গ্রামের নুরুল হাসান ভূঁইয়ার ৩০ বিঘা এবং শিবপুরের আব্দুস সালাম মাস্টারের ১০ বিঘার বাগান থেকেও এ বছর বিপুল পরিমাণ লটকন বিক্রি হয়েছে। মরজাল বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন বলেন, নরসিংদীর লটকন মানসম্মত হওয়ায় ঢাকা হয়ে তা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি হচ্ছে।
নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আজিজুল হক জানান, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় লটকনের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাওয়ায় লাভবান হচ্ছেন। কৃষি বিভাগ নিয়মিত পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে চাষিদের সহযোগিতা করছে।

