শতবর্ষের ইতিহাসে ফুটবল বিশ্বকাপ বহু রোমাঞ্চকর উপাখ্যানের জন্ম দিয়েছে, কিন্তু ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার বিশ্বমঞ্চ যা প্রত্যক্ষ করছে, তা যেন পূর্বের সমস্ত মহাকাব্যকে ম্লান করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এটি এখন আর কেবল সোনালি ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরার দলগত লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ফুটবলবিশ্ব এখন বুঁদ হয়ে আছে বিশ্বমঞ্চের সর্বকালের সেরা গোলদাতার মুকুট নিয়ে দুই ভিন্ন প্রজন্মের দুই মহাতারকার অবিশ্বাস্য, শ্বাসরুদ্ধকর দ্বৈরথে। একদিকে ৩৯ বছর বয়সেও ফুটবলের বরপুত্র লিওনেল মেসি তার জাদুকরী ক্যারিয়ারের শেষলগ্নে দাঁড়িয়ে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। অন্যদিকে, মাত্র ২৭ বছর বয়সেই ফরাসি গতিদানব কিলিয়ান এমবাপ্পে তার অতিমানবীয় কার্যকারিতা দিয়ে ফুটবল ইতিহাসের সমস্ত হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিচ্ছেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার হিসেবে একদিকে ৩০ ম্যাচে ২০ গোল নিয়ে চূড়ায় বসে আছেন মেসি, অন্যদিকে মাত্র ১৯ ম্যাচে ১৯ গোল নিয়ে তার ঘাড়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলছেন এমবাপ্পে। ফুটবলপ্রেমীদের মনে এখন প্রশ্ন, চলতি বিশ্বকাপের সমাপনীর পর কার মাথায় উঠবে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুট?
চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দলের প্রতিটি ম্যাচ যেন লিওনেল মেসির এক একটি ঐতিহাসিক পদযাত্রা। ৩৯ বছর বয়সেও এই আর্জেন্টাইন জাদুকর যেভাবে আলবিসেলেস্তেদের কাঁধে করে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, তা আধুনিক ফুটবলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দৃশ্য। চলতি টুর্নামেন্টেই আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া, জর্ডান এবং সবশেষ কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে জালের ঠিকানা খুঁজে নিয়ে জার্মানির কিংবদন্তি স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসেকে (১৬ গোল) ছাড়িয়ে এককভাবে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেন মেসি। ৩০টি ম্যাচ খেলে ২০টি গোলের এই রেকর্ডটি একসময় মনে হচ্ছিল বহু বছর অধরাই থেকে যাবে। ক্যারিয়ারের শেষলগ্নে এসেও মেসির এই অতিমানবীয় ফর্ম প্রমাণ করে যে, কেন তাকে সর্বকালের সেরা বলা হয়। কিন্তু মহাজাগতিক এই রেকর্ডের আনন্দ পুরোপুরি উপভোগ করার ফুরসত বোধহয় মেসি পাচ্ছেন না, কারণ তার গড়া এই রাজকীয় সাম্রাজ্যের প্রাচীরে ইতোমধ্যেই প্রবল আঘাত হানতে শুরু করেছেন তারই সাবেক পিএসজি সতীর্থ।
রোববার শেষ ষোলোর মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগের কঠিন দেওয়াল ভাঙতে ফ্রান্সকে চরম বেগ পেতে হয়েছিল। তবে ফরাসিদের ত্রাতা হয়ে আসেন তরুণ প্রতিভাবান বদলি খেলোয়াড় দেসিরে দুয়ে, যিনি পেনাল্টি বক্সে ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় লে ব্লুজরা। স্পট-কিক থেকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, নিখুঁত দক্ষতায় গোল করে ফ্রান্সের ১-০ ব্যবধানের জয় ও কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। আর এই একটি পেনাল্টি গোলের মাধ্যমেই বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় মেসির ঠিক পেছনে, অর্থাৎ ১৯টি গোল নিয়ে এককভাবে দ্বিতীয় স্থানে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
এমবাপ্পের এই উত্থান কেবল গোলের সংখ্যার কারণে নয়, বরং ফুটবল মাঠে তার অবিশ্বাস্য ও অতিমানবীয় কার্যকারিতার কারণে ফুটবল প-িতদের চোখ কপালে তুলছে। বয়স মাত্র ২৭, অথচ এরই মধ্যে নামের পাশে ১৯টি বিশ্বকাপ গোল, যার মধ্যে ১১টিই এসেছে নকআউট রাউন্ডের মতো চরম চাপের মঞ্চে! মিরোস্লাভ ক্লোসে (১৬ গোল), রোনালদো নাজারিও (১৫ গোল) কিংবা ফুটবল সম্রাট পেলের (১২ গোল) মতো কিংবদন্তিরা যে পরিমাণ ম্যাচ খেলে এই চূড়ায় পৌঁছেছিলেন, এমবাপ্পে তার চেয়ে অনেক কম ম্যাচ খেলে ১৯টি গোল পূর্ণ করেছেন। ম্যাচ প্রতি তার গোলের গড় প্রায় ১.০০, যা আধুনিক ফুটবলে প্রায় অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান।
২০২৬ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটের লড়াইটিও এই দুই মহাতারকার দ্বৈরথকে আরও উসকে দিয়েছে। টুর্নামেন্টের এ পর্যায়ে এসে মেসি ও এমবাপ্পে উভয়েই সমান ৭টি করে গোল করে গোলদাতার তালিকায় যৌথভাবে শীর্ষে অবস্থান করছেন। একদিকে মেসি চাইছেন নিজের গোলসংখ্যাকে আরও বাড়িয়ে এমবাপ্পের নাগালের বাইরে নিয়ে যেতে, অন্যদিকে এমবাপ্পের সামনে সুযোগ থাকছে ফরাসিদের পরবর্তী ম্যাচেই মেসিকে স্পর্শ করার। ফ্রান্স কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, যার অর্থ এমবাপ্পের সামনে এই টুর্নামেন্টেই মেসিকে ছুঁয়ে ফেলার বা ছাড়িয়ে যাওয়ার অন্তত আরও একটি সুযোগ নিশ্চিতভাবেই থাকছে। মরক্কোর জমাট রক্ষণভাগের বিপক্ষে এমবাপ্পের গতি আর বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষা যেমন হবে, তেমনি ফুটবল ইতিহাস নতুন কোনো রেকর্ডের সাক্ষী হবে কি না, তা-ও নির্ধারিত হবে এই ম্যাচেই।
বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে, লিওনেল মেসির জন্য এই বিশ্বকাপটি সম্ভবত এক সোনালি ও বর্ণিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়। ৩৯ বছর বয়সে এসেও তিনি যে জাদুকরী ফুটবল উপহার দিচ্ছেন, তা ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান থাকবে। কিন্তু সময়ের নিয়ম মেনেই মেসিকে একদিন থামতে হবে। অন্যদিকে, এমবাপ্পের বয়স মাত্র ২৭। এই বিশ্বকাপের পরও তার সামনে আরও অন্তত এক বা দুটি বিশ্বকাপ খেলার পূর্ণ সম্ভাবনা ও বয়স রয়েছে। ফুটবল পরিসংখ্যানই স্পষ্ট আভাস দিচ্ছে যে, মেসির রেকর্ড আগামী দিনে এমবাপ্পে ভেঙে চুরমার করে দেবেন এবং বিশ্বকাপের গোলদাতার তালিকায় এমন এক উচ্চতা তৈরি করবেন যা হয়তো আগামী কয়েক দশকেও কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। তবে ফুটবল মাঠের আসল রোমাঞ্চ তো আর কাগজে-কলমে বা পরিসংখ্যানের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। কাগজের হিসাবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাঠের ৯০ মিনিটে যে কোনো রূপকথা তৈরি হতে পারে। চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপেই কি মেসি তার শীর্ষস্থান ধরে রেখে এক অবিসংবাদিত সম্রাট হিসেবে বিদায় নেবেন, নাকি মরক্কো ম্যাচ বা তার পরবর্তী লড়াইতে এমবাপ্পেই অকাল দখলে নেবেন ফুটবল ইতিহাসের এই অমর সিংহাসন? উত্তরটি এখনো অজানা থাকলেও, এই দুই মহাতারকার পায়ের জাদুতে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়টি রচিত হতে দেখার জন্য অধীর আগ্রহে উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছে কোটি কোটি ক্রীড়াপ্রেমী।

