ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

বিশ্বকাপে ভবিষ্যদ্বাণীর খাতা কতটা মিলল

মিনহাজুর রহমান নয়ন
প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২৬, ০৭:০৭ এএম

বিশ্বকাপ মানেই শুধু ৯০ মিনিটের লড়াই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কোটি মানুষের আশা, বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ আর নানা ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী। ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর আগে বিশ্বের বড় বড় ফুটবল বিশ্লেষক, ডেটা প্রতিষ্ঠান ও সাবেক তারকারা নিজেদের হিসাব দিয়েছিলেনÑ কার হাতে উঠতে পারে বিশ্বকাপ ট্রফি?

কেউ ভরসা রেখেছিলেন স্পেনের তরুণ প্রজন্মে, কেউ ফ্রান্সের তারকা শক্তিতে, আবার কেউ আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা ও লিওনেল মেসির নেতৃত্বে। কিন্তু বিশ্বকাপের মাঠ আবারও দেখিয়েছে ফুটবলে নিশ্চিত বলে কিছু নেই।

অপটা সুপারকম্পিউটার : বিশ্বকাপ শুরুর আগে সবচেয়ে আলোচিত পূর্বাভাস দিয়েছিল সুপারকম্পিউটার। হাজার হাজার সিমুলেশনের মাধ্যমে তারা সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নদের তালিকা তৈরি করেছিল। তাদের বিশ্লেষণে স্পেনকে রাখা হয়েছিল শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবে। এরপর ছিল ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের শেষ পর্যায়ে এসে দেখা গেল, এই চারটি দলই সেমিফাইনালে পৌঁছেছে অর্থাৎ শীর্ষ দাবিদারদের তালিকা অনেকটাই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে।

ফ্রান্সের পক্ষে বাজি : অপটা বিশ্লেষক ক্রিস মাইসনের নেতৃত্বে প্রকাশিত পূর্বাভাসে ফ্রান্সকে অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিলিয়ান এমবাপ্পের নেতৃত্ব, আক্রমণভাগের গভীরতা এবং বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতার কারণে ফ্রান্সকে এগিয়ে রাখা হয়। টুর্নামেন্টের শেষ দিকে সেই বিশ্লেষণ আরও শক্তিশালী হয়। সেমিফাইনালে ওঠার পর অপটার নতুন হিসাবেও ফ্রান্সকে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এগিয়ে রাখা হয়েছে।

অভিজ্ঞতার ওপর আস্থা : বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে অনেক বিশ্লেষক শুরু থেকেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার বলেছিলেন। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর দলটির আত্মবিশ্বাস, কোচ লিওনেল স্কালোনির কৌশল এবং মেসির নেতৃত্ব ছিল তাদের বড় শক্তি। সমালোচকদের কেউ কেউ আর্জেন্টিনাকে ফেভারিটদের তালিকায় ফ্রান্স ও স্পেনের পেছনে রেখেছিলেন, কিন্তু মাঠে তারা আবারও প্রমাণ করেছে কেন বড় টুর্নামেন্টে তাদের হিসাবের বাইরে রাখা যায় না।

দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানের স্বপ্ন : ইংল্যান্ডকে নিয়েও ছিল বড় প্রত্যাশা। জুড বেলিংহ্যাম, হ্যারি কেইনসহ শক্তিশালী স্কোয়াডের কারণে অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, এবার ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপ জয়ের অপেক্ষা শেষ হতে পারে। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে উঠে সেই সম্ভাবনা ধরে রেখেছে। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে কঠিন লড়াই জিতে তারা শেষ চারে জায়গা করে নেয়।

সবচেয়ে বড় হতাশার গল্প : ভবিষ্যদ্বাণীর তালিকায় ব্রাজিলও ছিল অন্যতম নাম। ঐতিহ্য, প্রতিভাবান খেলোয়াড় এবং আক্রমণাত্মক ফুটবলের কারণে অনেকেই তাদের সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন মনে করেছিলেন। কিন্তু মাঠে সেই হিসাব মেলেনি। ব্রাজিল শেষ ষোলোতেই বিদায় নেয়, যা এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ভবিষ্যদ্বাণীর বাইরে উঠে আসা চমক : যেসব দলকে শুরুতে শিরোপার মূল দাবিদার ধরা হয়নি, তাদের মধ্যে নরওয়ে সবচেয়ে বড় চমক হয়ে ওঠে। এরলিং হালান্ডদের দল প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে যায় এবং বড় দলগুলোর হিসাব পাল্টে দেয়। এটাই আবার প্রমাণ করেছে বিশ্বকাপে শুধু র‌্যাঙ্কিং বা পরিসংখ্যান নয়, মুহূর্তের পারফরম্যান্সই অনেক সময় ভাগ্য নির্ধারণ করে।

বিশ্বকাপের সৌন্দর্য অনিশ্চয়তায় : ২০২৬ বিশ্বকাপের ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলোÑ ডেটা ও বিশ্লেষণ দলগুলোর শক্তি বুঝতে সাহায্য করে, কিন্তু মাঠের ৯০ মিনিট সব হিসাব বদলে দিতে পারে। স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মতো ফেভারিটরা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকলেও ব্রাজিলের বিদায় এবং নরওয়ের উত্থান দেখিয়েছে, বিশ্বকাপ কেন ফুটবলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মঞ্চ। কারণ শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যদ্বাণী কেবল সম্ভাবনার গল্প বলে, আর ইতিহাস লেখা হয় মাঠে।