আর্জেন্টিনা ও স্পেনের সম্পর্ক শুধু ফুটবলের নয়, ইতিহাসেরও। একসময় স্পেনের উপনিবেশ ছিল আর্জেন্টিনা। ১৮১০ সালে স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হয়ে ১৮১৬ সালে স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। দুই শতাব্দী পর সেই দুই দেশের লড়াই আর যুদ্ধের ময়দানে নয়, বিশ^কাপের ফাইনালের সবুজ ঘাসে যেখানে অস্ত্র নয়, জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে একটি ফুটবল।
ফুটবল মাঝেমধ্যে এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দেয়, যা কেবল একটি ম্যাচের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে সময়ের দলিল, ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। ২০২৬ বিশ^কাপের ফাইনাল তেমনই এক উপলক্ষ। নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে বিশে^র এক নম্বর দল আর্জেন্টিনা এবং দুই নম্বরে থাকা স্পেন। একদিকে বিশ^চ্যাম্পিয়নের মুকুট ধরে রাখার লড়াই, অন্যদিকে ১৬ বছর পর আবার বিশ^সেরার সিংহাসন পুনর্দখলের স্বপ্ন।
আর এই ফাইনালকে আরও মহিমান্বিত করেছে একটি ঐতিহাসিক তথ্য বিশ^কাপে ঠিক ৬০ বছর পর আবার মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ^কাপে প্রথম ও মাত্র একবারের মতো বিশ^কাপের মঞ্চে দেখা হয়েছিল দুই দলের। সেই ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। ছয় দশক পর ইতিহাস যেন আবারও একই দুই প্রতিপক্ষকে এনে দাঁড় করিয়েছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে, তবে এবার শিরোপার লড়াইয়ে।
ষাট বছরের গল্প, এক রাতের নিষ্পত্তি
১৯৬৬ সালে তারা লড়েছিল গ্রুপপর্বে। সেই সময় কেউ ভাবেনি, বিশ^কাপের ফাইনালে এই দুই পরাশক্তির দেখা পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও ছয় দশক। এই দীর্ঘ সময়ে ফুটবল বদলেছে, বদলেছে কৌশল, বদলেছে প্রজন্ম। ম্যারাডোনা থেকে মেসি, জাভি-ইনিয়েস্তা থেকে ইয়ামালÑ নতুন নায়করা এসেছেন, পুরোনো কিংবদন্তিরা ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন। কিন্তু বিশ^কাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের পুনর্মিলনের দিন আর আসেনি। অবশেষে ৬০ বছর পর সেই অপেক্ষার অবসান।
একজন কিংবদন্তির বিদায়, আরেক নক্ষত্রের সূর্যোদয়
এই ফাইনালের সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্য হয়তো লিওনেল মেসিকে ঘিরেই। ৩৯ বছর বয়সে তিনি হয়তো শেষবারের মতো বিশ^কাপের মঞ্চে নামছেন। টুর্নামেন্টজুড়ে তার ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছে আরেকটি ফাইনাল।
অন্যদিকে মাত্র ১৯ বছর বয়সি লামিন ইয়ামাল যেন ভবিষ্যৎ ফুটবলের প্রতীক। ২০০৭ সালে মাত্র পাঁচ মাস বয়সি ইয়ামালকে এক দাতব্য ফটোশুটে কোলে নিয়েছিলেন মেসি। আজ সেই শিশুই বিশ^কাপ ফাইনালে দাঁড়িয়ে আছেন তার শৈশবের নায়কের বিপরীতে। এ যেন সময়ের লেখা সবচেয়ে সুন্দর ফুটবল কবিতা।
স্পেন : শৈল্পিক ফুটবলের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি
স্পেন এই বিশ^কাপে যেন ফুটবলকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। বল দখলের সৌন্দর্য, নিখুঁত পাস, সংগঠিত রক্ষণ আর অবিশ^াস্য প্রেসিং সব মিলিয়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল হয়ে উঠেছে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে পরিপূর্ণ দল। কেপ ভার্দের সঙ্গে হতাশাজনক ড্র দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও এরপর সৌদি আরব, উরুগুয়ে, অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল, বেলজিয়াম এবং সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে তারা ফাইনালে এসেছে। সাত ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করা স্পেনের রক্ষণ এই বিশ^কাপের অন্যতম বড় বিস্ময়। রোদ্রি মাঝমাঠে যেন এক অদৃশ্য স্থপতি। আর সামনে ইয়ামাল, দানি ওলমো ও মিকেল ওইয়ারজাবালের সৃজনশীলতা প্রতিপক্ষের জন্য এক অবিরাম দুঃস্বপ্ন।
আর্জেন্টিনা : মৃত্যুঞ্জয়ীদের আরেকটি অভিযাত্রা
আর্জেন্টিনার পথটি ছিল অনেক বেশি নাটকীয়। গ্রুপপর্বে সহজেই এগিয়ে গেলেও নকআউটে প্রতিটি ম্যাচ ছিল কঠিন পরীক্ষার নাম। কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়, মিসরের বিপক্ষে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও অবিশ^াস্য প্রত্যাবর্তন, সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে স্নায়ুচাপের লড়াই এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত ঘুরে দাঁড়ানোÑ সব মিলিয়ে স্কালোনির দল যেন প্রমাণ করেছে, তারা শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত হার মানতে জানে না। এই বিশ^কাপে তাদের ১৯ গোলের মধ্যে ১২টিই এসেছে ৭৫ মিনিটের পর। অর্থাৎ ম্যাচ যত শেষের দিকে গড়িয়েছে, আর্জেন্টিনা ততই ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।
দুই দর্শনের সংঘর্ষ
স্পেন বিশ^াস করে বলই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আর্জেন্টিনা বিশ^াস করে সাহস, ধৈর্য আর সঠিক মুহূর্তে আঘাত হানার কৌশলে। স্পেন প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে। আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষকে অপেক্ষা করায়। স্পেন ছন্দ দিয়ে জেতে। আর্জেন্টিনা চরিত্র দিয়ে জেতে। এই দুই দর্শনের সংঘর্ষই হয়তো নির্ধারণ করবে বিশ^কাপের নতুন সম্রাটকে।
ইতিহাস বলছে সমানে সমান
আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুই দল মুখোমুখি হয়েছে ১৪ বার। আর্জেন্টিনার জয় ৬টি, স্পেনেরও ৬টি, আর ড্র হয়েছে দুটি ম্যাচ।
তবে বিশ^কাপের ইতিহাসে এই দুই দলের ফাইনালের গল্প মাত্র একটি ম্যাচের ১৯৬৬ সালের সেই লড়াই। ছয় দশক পর আবার বিশ^কাপে দেখা, তবে এবার ট্রফির জন্য।
ম্যাচের ভাগ্য কোথায় নির্ধারিত হতে পারে?
রোদ্রি বনাম এনজো ফার্নান্দেজের মিডফিল্ড যুদ্ধ, ইয়ামালের গতি সামলানোর চ্যালেঞ্জ, মেসির সৃজনশীলতা আটকে রাখার স্প্যানিশ পরিকল্পনাÑ এসব ছোট ছোট লড়াইয়ের ওপরই নির্ভর করবে পুরো ফাইনালের চিত্র। যদি স্পেন শুরু থেকেই নিজেদের ছন্দ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তা হলে ম্যাচ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কিন্তু যদি আর্জেন্টিনা প্রথম এক ঘণ্টা ঝড় সামলে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, তা হলে শেষ ত্রিশ মিনিটে মেসির একটিমাত্র স্পর্শও ইতিহাস বদলে দিতে পারে।
শুধু শিরোপা নয়, উল্টরাধিকারেরও লড়াই
রোববারের এই ফাইনাল কেবল বিশ^কাপের শিরোপা নির্ধারণ করবে না। এটি হয়তো লিওনেল মেসির বিশ^কাপ অধ্যায়ের শেষ পৃষ্ঠা লিখবে। আবার একই সঙ্গে লামিন ইয়ামালের নতুন যুগের প্রথম অধ্যায়ও শুরু হতে পারে।
ঠিক ৬০ বছর পর বিশ^কাপের মঞ্চে আবার মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও স্পেন। ইতিহাসের পুরোনো হিসাব, বর্তমানের শ্রেষ্ঠত্ব আর ভবিষ্যতের স্বপ্নÑ সবকিছু মিলিয়ে এটি এমন এক রাত, যার প্রতিটি মুহূর্ত বহু বছর ধরে ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে।
ইতিহাস থেকে ফুটবলের মাঠে। কামান-বন্দুক থেকে গোলাকার ফুটবলে; যেখানে বাঁশি দিলে যুদ্ধ শেষ। এখন এই যুদ্ধের শেষ বাঁশি বাজবে ৯০ মিনিট পরে। কিন্তু সেই বাঁশির প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে থাকবে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় বহু যুগ ধরে।

