ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়েও কিছু মানুষ যখন মাঠের সবুজ ক্যানভাসে তুলির শেষ আঁচড়টি কাটেন, তখন সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে সেই শিল্পের জৌলুস অবলোকন করে। ফুটবলের ইতিহাসে লিওনেল আন্দ্রেস মেসির নাম কোনো শুষ্ক পরিসংখ্যান বা গাণিতিক সমীকরণ দিয়ে পরিমাপ করা অসম্ভব। ঊনচল্লিশ বছর বয়স। যখন অধিকাংশ ফুটবলার বুট জোড়া তুলে রেখে স্মৃতিরোমন্থনে ব্যস্ত থাকেন, তখন এই আর্জেন্টাইন জাদুকর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে আবারও প্রমাণ করলেন প্রকৃত শিল্পীর শরীরী অবয়বে বার্ধক্যের ছাপ পড়লেও তার ভেতরের শিল্পের জৌলুস কখনো ম্লান হয় না। তার মুখে এখন বয়সের স্পষ্ট ছাপ; কিন্তু বল পায়ে নিলেই তিনি সেই চিরযৌবনা রাজপুত্র, যার প্রতিটি ড্রিবল, নিখুঁত পাস আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আজও ফুটবল নামক খেলাটিকে শাসন করে চলেছে।
আটলান্টার সেমিফাইনালটি ফুটবল বিশ্বকে আরও একবার মনে করিয়ে দিয়েছে যে, আর্জেন্টিনার লড়াই শেষ বাঁশি বাজার আগে কখনো শেষ হয় না। চলমান বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সিগনেচার মার্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে শেষের ১৫ মিনিটের বিধ্বংসী ও সংহারক রূপ, আর সেই বিশ্বাসের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন ৩৯ বছর বয়সি এই জাদুকর। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়া অবস্থায় মহাকাব্যিক সমতায় ফেরা এবং যোগ করা সময়ে করা আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের পেছনে মেসির দুটি নিখুঁত অ্যাসিস্ট যেন সমালোচকদের সমস্ত সংশয়কে স্তব্ধ করে দিয়েছে। গোল, অ্যাসিস্ট, সর্বাধিক সুযোগ সৃষ্টি, সর্বাধিক সফল ড্রিবল ও সর্বাধিক শট অন টার্গেটের মতো প্রতিটি আক্রমণাত্মক সূচকে এই বয়সেও তিনি টুর্নামেন্টের শীর্ষে। তরুণ প্রজন্মের কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্ড কিংবা হ্যারি কেইনের মতো গতিময় তারকাদের পেছনে ফেলে তিনি এখন গোল্ডেন বুটের সবচেয়ে যোগ্য ও শক্তিশালী দাবিদার।
তবে আটলান্টার এই জাদুকরী প্রত্যাবর্তনের পেছনে মেসির একক নান্দনিকতার পাশাপাশি ডাগআউটে লিওনেল স্কালোনির কৌশলগত মাস্টারস্ট্রোকও ছিল অনন্য। বিরতির পর রদ্রিগো ডি পলকে মাঠে নামিয়ে মাঠের নিয়ন্ত্রণ পুনরুত্থাপন করা এবং মেসিকে ডান প্রান্তে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার যে পরিকল্পনা স্কালোনি করেছিলেন, তা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ টেরই পায়নি। বক্সের বাইরে থেকে এনজো ফার্নান্দেজের সেই দুর্দান্ত সমতাসূচক গোল এবং পরে মেসির পাস থেকে লাউতারো মার্তিনেজের জয়সূচক ফিনিশিং কোচের সেই শান্ত, ধৈর্যশীল ও দূরদর্শী পরিকল্পনারই ফসল। ২০১৪, ২০২২ এবং ২০২৬, চারটি বিশ্বকাপের মধ্যে তিনটির ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে যাওয়ার এই গৌরব মেসিকে দিয়েগো ম্যারাডোনার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নয়, বরং তার নিজের স্বতন্ত্র ও অলৌকিক সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে এই আনন্দের জোয়ারের মাঝেও এক নীরব বিষাদ ও দীর্ঘশ্বাসের কালো মেঘ দানা বাঁধছে। সবাই জানেন, এটিই সম্ভবত বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির শেষ মহাকাব্যিক অধ্যায়। নিউ জার্সির ফাইনাল ম্যাচটির পরেই হয়তো চিরতরে তুলে রাখা হবে মেসির জার্সিটি, এই জারসিতে হয়তো আর কখনো দেখা যাবে না তার বাঁ পায়ের সেই অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং বা নিখুঁত থ্রু পাস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সস্তা বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে মেসি সবসময় তার জবাব দিয়েছেন সবুজ ঘাসের বুকে। সামনে আরেকটি ফাইনাল, আরেকটি ইতিহাস গড়ার হাতছানি এবং হয়তো আরেকটি সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পরম মুহূর্ত। তবে ফলাফল যাই হোক না কেন, ফুটবল নামক শিল্পের ইতিহাসে একটি ধ্রুব সত্য ইতোমধ্যেই খোদিত হয়ে গেছে। সময় হয়তো লিওনেল মেসিকে বৃদ্ধ করেছে, কিন্তু তার রাজকীয় শ্রেষ্ঠত্বকে স্পর্শ করার ক্ষমতা সময়েরও নেই।

