× UCB Sticker Card
রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রূপালী ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ১৯, ২০২৬, ০১:৪১ এএম

ইনিয়েস্তার উত্তরসূরি রদ্রি

রূপালী ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ১৯, ২০২৬, ০১:৪১ এএম

ইনিয়েস্তার উত্তরসূরি রদ্রি

ফুটবল ইতিহাসের গতিপথ কখনো কখনো এমন কিছু সমান্তরাল বৃত্ত তৈরি করে, যা কল্পনাকেও হার মানায়। ২০১০ সালের ১১ জুলাই জোহানেসবার্গের সকার সিটি স্টেডিয়ামে যখন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার বুট ছুঁয়ে স্পেনের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফিটি নিশ্চিত হচ্ছিল, তখন আটলান্টিকের ওপারে যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের এক গভীর বনের ভেতর ইংরেজি শেখার ক্যাম্পে থাকা চোদ্দো বছরের এক স্প্যানিশ কিশোর আনন্দের আতিশয্যে বনের গাছপালার মধ্য দিয়ে একাকী দৌড়াতে শুরু করেছিল। মোবাইল নেটওয়ার্ক কিংবা ইন্টারনেটবিহীন সেই ক্যাম্পে থাকা অন্যান্য দেশের কিশোরদের কাছে সেদিন বনের ভেতর দৌড়ানো সেই অদ্ভূতুড়ে ছেলেটির উচ্ছ্বাসের কারণ সম্পূর্ণ অজানা ছিল, এমনকি হয়তো অবান্তরও। কেউ সেদিন কল্পনাও করতে পারেনি, দীর্ঘ ১৬ বছর পর সেই বনের ভেতর দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়ানো কিশোরটিই ২০২৬ সালের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নযাত্রায় দলের সবচেয়ে বড় সেনাপতি ও মাঝমাঠের প্রাণভোমরা হয়ে মাঠে নামবেন। স্বপ্ন আর বাস্তবতার এই ১৬ বছরের ব্যবধানকে ঘুচিয়ে দিয়ে রদ্রিগো হার্নান্দেজ ক্যাসকান্তে, বা আমাদের চেনা রদ্রি আজ স্প্যানিশ ফুটবলের কাব্যিক রূপান্তরের জীবন্ত উপাখ্যান।

ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রদ্রি নিজেই ফিরে গিয়েছেন কানেকটিকাটের সেই ধুলোবালি মাখা বনের দিনগুলোতে। তবে তার এই স্মৃতিচারণ কেবল অতীতের রোমন্থন ছিল না, বরং তা ছিল একবিংশ শতাব্দীর স্প্যানিশ ফুটবলের নতুন রণহুঙ্কার। রদ্রির দৃষ্টিতে ২০১০ সালের সেই সোনালি প্রজন্ম এখনো ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা দল হিসেবেই আসীন। টানা দুটি ইউরো এবং একটি বিশ্বকাপ জয়ের সেই অবিশ্বাস্য কীর্তিকে ছোঁয়া বা অতিক্রম করার কোনো অহমিকা তার নেই। বরং রদ্রি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করেছেন যে, তারা পূর্বসূরিদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় তুলনা করতে চান না। স্পেন এখন লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে সম্পূর্ণ নিজেদের একটি মৌলিক পথে হাঁটছে, যেখানে ইতোমধ্যে যুক্ত হয়েছে নেশনস লিগ এবং ইউরো ২০২৪-এর শ্রেষ্ঠত্ব। রদ্রির দৃঢ় বিশ্বাস, বিগত কয়েক বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা দলগত মানসিকতা স্পেনের এই নতুন প্রজন্মকে এখন ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখর তথা বিশ্বকাপ জয়ের সেই চূড়ান্ত ধাপটি অতিক্রম করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত করেছে।

রদ্রির আকাশচুম্বী আত্মবিশ্বাসের মূল ভিত্তি লুকিয়ে আছে স্পেনের বর্তমান খেলার দর্শনে। যেখানে দলের চেয়ে বড় কোনো একক তারকা নেই, বরং পুরো দলটিই একতাবদ্ধ যুদ্ধাস্ত্র। রদ্রির নিজস্ব একটি চমৎকার মূল্যায়ন রয়েছে এই দলটির ব্যাপারে, যেখানে তিনি বলেন, আমরা ছোট দলের মতো মাঠের প্রতি ইঞ্চি ঘাসের জন্য দৌড়াই, কিন্তু যখন বল আমাদের পায়ে থাকে, তখন আমরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় দলের মতো আধিপত্য বিস্তার করে খেলি। ডাগআউটে লুইস দে লা ফুয়েন্তের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখানেই যে, তিনি এই দলে কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক অহমিকা বা ইগো জমতে দেননি। স্পেনের স্কোয়াডের প্রতিটি ফুটবলার আজ যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেদের বিলিয়ে দিতে এবং একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে প্রস্তুত। ব্যক্তির চেয়ে সমষ্টির এই প্রাধান্যই মূলত এই স্পেন দলকে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং ভারসাম্যপূর্ণ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এই দলগত একাত্মতা ও কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ স্পেন প্রদর্শন করেছে ফ্রান্সের মতো মহাশক্তিধর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের মঞ্চে। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে কিংবা ফরাসি মাঝমাঠের যে বিধ্বংসী রূপ পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে প্রতিপক্ষের মনে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল, তাকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ও শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলার প্রধান কারিগর ছিলেন রদ্রি। ফ্রান্সের আক্রমণভাগকে পরাস্ত করার জন্য ফুটবলের প্রচলিত পজিশনাল প্লে এবং বল হারানোর পর মুহূর্তেই কাউন্টার-প্রেসিংয়ের যে নিখুঁত জ্যামিতি ফুয়েন্তে এঁকেছিলেন, মাঠের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে তার সফল বাস্তবায়ন ঘটিয়েছেন ম্যানচেস্টার সিটির এই মিডফিল্ডার। ফরাসি ফুটবলারদের প্রচ- প্রেসের মুখেও রদ্রি নিজেকে এমন সব জ্যামিতিক পজিশনে নিয়ে গেছেন, যেখান থেকে স্পেনের বলের দখল ধরে রাখা এবং গতি নিয়ন্ত্রণ করা ছিল অত্যন্ত সহজ। মাঠের জটলার মধ্যে এক পাস, দুই পাস কিংবা তিন পাসের যে সরল দৃশ্য গ্যালারি থেকে দেখা গেছে, তার অন্তরালে ছিল রদ্রির অতিমানবীয় ফুটবল বুদ্ধি। ফরাসিদের প্রতিনিয়ত বলের পেছনে ছুটিয়ে ক্লান্ত করে ফেলার যে সূক্ষ্ম ছক, তার মূল হৃৎপি- ছিলেন রদ্রি নিজে।

সেমিফাইনালের সেই মহাকাব্যিক লড়াইয়ে রদ্রির এই দর্শনের নিখুঁত প্রতিফলন দেখা গেছে দলের বাকি সদস্যদের মাঝেও। মার্ক কুকুরেয়ার রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা থেকে শুরু করে দানি ওলমোর মাঝমাঠের সৃজনশীলতা, প্রত্যেকেই নিজের ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বকে দলের প্রয়োজনে উৎসর্গ করেছিলেন। ম্যাচের শেষভাগে ফরাসি খেলোয়াড়দের বোকা বানিয়ে স্প্যানিশ ফুটবলারদের সেই আত্মবিশ্বাসী ও ছন্দময় পাসিং ফুটবলই বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, ম্যাচের নাড়ি স্পেনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। ক্লাব ফুটবলের সমস্ত বড় শিরোপা এবং ব্যক্তিগত অর্জন নিজের ঝুলিতে পুরলেও, রদ্রির কাছে ফিফা বিশ্বকাপের এই সোনালি ট্রফিটি জয় করাই হবে তার খেলোয়াড়ী জীবনের পরম এবং সর্বোচ্চ সার্থকতা। একজন ফুটবলারের জন্য বিশ্বকাপের চেয়ে বড় এবং আরাধ্য আর কোনো স্বপ্ন হতে পারে না।

কানেকটিকাটের সেই নীরব বনের নিঃসঙ্গ কিশোর আজ আমেরিকারই এক জুলাইয়ের রাতে স্পেনের কোটি কোটি মানুষের স্বপ্নের ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। ইনিয়েস্তার সেই জাদুকরী মুহূর্তের সাক্ষী হওয়া ছোট্ট ছেলেটি আজ নিজেই ইনিয়েস্তার জুতোয় পা গলিয়ে স্পেনকে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বজয়ের চূড়ায় নিয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে। ইতিহাসের এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন এবং বাস্তবের দূরত্ব হয়তো অনেকখানি ঘুচে গেছে, কিন্তু রদ্রির ফুটবলীয় সরলতা ও লড়াইয়ের মানসিকতা বিন্দুমাত্র বদলায়নি। ২০১০ সালে তিনি ছিলেন স্পেনের বিশ্বজয়ের এক দূরবর্তী ও নীরব স্তাবক, আর ২০২৬ সালে তিনি নিজেই সেই অবিনশ্বর ইতিহাস রচনা করার অপেক্ষায়।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!