২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইউরোপীয় পরাশক্তি স্পেন মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। এই ফাইনাল মূলত রূপ নিয়েছে দুই ভিন্ন প্রজন্মের, দুই ভিন্ন যুগের এবং ফুটবলের দুই রাজপুত্রের অবিশ্বাস্য প্রতীকী দ্বৈরথে। একদিকে ৩৯ বছর বয়সি লিওনেল আন্দ্রেস মেসি, যিনি নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলছেন ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়; আর অন্যদিকে সদ্য ১৯ বছরে পা রাখা স্পেনের বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামাল, যিনি নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছেন। দুই মহাতারকার বয়সের ব্যবধান দীর্ঘ ২০ বছর। তবে এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানকে ছাপিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে আন্দোলিত হচ্ছে একটি ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় মুহূর্তের স্মৃতি। যেখানে ১৯ বছর আগে পাঁচ মাস বয়সি একটি শিশুকে বাথটাবের হালকা উষ্ণ জলে পরম মায়ায় গোসল করাচ্ছিলেন কুড়ি বছর বয়সি এক তরুণ।
ইতিহাসের সেই রোমাঞ্চকর ক্ষণটি রচিত হয়েছিল ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে। বার্সেলোনা এবং স্প্যানিশ সংবাদপত্র স্পোর্টের যৌথ উদ্যোগে ইউনিসেফের একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের তহবিল সংগ্রহের জন্য ন্যু ক্যাম্পের ড্রেসিংরুমে একটি ফটোশুটের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে অংশ নিয়েছিলেন বার্সেলোনার তৎকালীন উদীয়মান লাতিন জাদুকর লিওনেল মেসি, যিনি ইতোমধ্যেই একটি বিশ্বকাপ খেলে বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দিয়ে রেখেছেন। আর সেই শুটের জন্য লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে মেসির কোলে চড়েছিল বার্সেলোনারই এক দরিদ্র অভিবাসী পরিবারের পাঁচ মাস বয়সি শিশু লামিনে ইয়ামাল। ক্যামেরার ফ্লাশের সামনে জলভর্তি প্লাস্টিকের গামলায় সেই ছোট্ট ইয়ামালকে পরম যতেœ গোসল করানোর সময় মেসিও হয়তো ভাবেননি, তার হাতের স্পর্শ পাওয়া এই শিশু একদিন তারই ফেলে আসা সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হবে। আজ দীর্ঘ ১৯ বছর পর সেই ধুলো জমা ছবি যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ভাইরাল, তখন তাকে নিয়তির লিখন ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। যে শিশুটি একদিন কিংবদন্তির কোলে চড়ে জলকেলি করেছিল, সে-ই আজ বিশ্বজয়ের চূড়ান্ত মঞ্চে সেই একই কিংবদন্তির সামনে দাঁড়িয়েছে।
এই দুই তারকার পথচলার মাঝে অদ্ভুত কিছু মিল ও সমান্তরাল রেখা ফুটবল রোমান্টিকদের রোমাঞ্চিত করে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বার্সেলোনার বিখ্যাত ও মর্যাদাপূর্ণ ১০ নম্বর জার্সিটি নিজের করে নিয়েছেন লামিনে ইয়ামাল। এই সেই জার্সি, যা গায়ে চাপিয়ে লিওনেল মেসি বার্সেলোনায় ১৭টি দীর্ঘ মৌসুমের মধ্যে ১৩টি মৌসুম অতিবাহিত করেছিলেন এবং ক্লাবটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৬৭২টি গোল করে নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন অধরা উচ্চতায়। অথচ এই বিশ্বকাপে ইয়ামাল স্পেনের হয়ে মাঠে নামছেন ১৯ নম্বর জার্সি গায়ে জড়িয়ে। কাকতালীয়ভাবে, ২০০৬ সালে জার্মানির মাটিতে নিজের প্রথম বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে এই ১৯ নম্বর জার্সি পরেই বিশ্বমঞ্চে অভিষেক ঘটেছিল কিশোর মেসির, যখন আজকের এই ইয়ামালের জন্মই হয়নি। পোশাকের এই সংখ্যার মেলবন্ধন যেন দুই প্রজন্মের অদৃশ্য আত্মিক বন্ধনকেই বারবার মনে করিয়ে দেয়।
চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে দুই প্রজন্মের এই দুই প্রতিনিধিই নিজেদের ফুটবলীয় আভিজাত্য দিয়ে ইতিহাসকে নতুন করে লিখছেন। আসরে দুর্দান্ত এক গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতাদের শীর্ষ দশে নিজের নাম খোদাই করেছেন ইয়ামাল, যেখানে তিনি গোল করার বয়সের নিরিখে মেসিকেও ছাড়িয়ে গেছেন। অন্যদিকে, ৩৯ বছর বয়সি মেসি নিজের রেকর্ড বুককে নিয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের সেই রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে দুটি জাদুকরী অ্যাসিস্ট করে দলকে ফাইনালে তোলার পাশাপাশি বিশ্বকাপের ইতিহাসে এককভাবে সর্বোচ্চ ২১টি গোলের রাজকীয় রেকর্ড এখন তার নামের পাশে। গতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে বুদ্ধিমত্তা আর বিশুদ্ধ শিল্প দিয়ে মেসি যেভাবে টুর্নামেন্ট শাসন করছেন, তার ঠিক বিপরীতে ইয়ামাল তার ক্ষিপ্রতা ও আধুনিক ড্রিবলিং দিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে করছেন তছনছ।
ফাইনালের মহারণে যখন রেফারি ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজাবেন, তখন স্টেডিয়ামের গ্যালারি সাক্ষী হবে এক অবিস্মরণীয় ক্রসরোডের। একদিকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলারের বিদায়ি গোধূলির সুর, অন্যদিকে নতুন রাজপুত্রের রাজকীয় উত্থানের ঊষালগ্ন। ১৯ বছর আগের সেই বাথটাবের জল আজ রূপ নিয়েছে ফিফা বিশ্বকাপের সবুজ ঘাসে। একদা যে শিশুকে পরম স্নেহে কোলে তুলে নিয়েছিলেন মেসি, আজ সেই শিশুই তার চোখের দিকে চোখ রেখে বিশ্বজয়ের লড়াইয়ে অবতীর্ণ। ফলাফল যাই হোক না কেন, ফুটবল নামক শিল্পের ইতিহাসে মেসি ও ইয়ামালের এই গল্পটি চিরকাল টিকে থাকবে অদ্ভুত সুন্দর রূপকথা হিসেবে, যেখানে নদীর এক কূলের বিদায়ের বিষাদ অন্য কূলের নতুন তরঙ্গের আবাহনে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন