ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ডিপফেক ভিডিও চিনতে ইউটিউবের পরিবর্তন

ইনফোটেক প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ২, ২০২৬, ০৬:২৩ এএম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতির ফলে ইন্টারনেটে বাস্তব ও কৃত্রিম কনটেন্টের পার্থক্য করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ভিডিও কনটেন্টের ক্ষেত্রে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার এতটাই উন্নত হয়েছে যে সাধারণ দর্শকদের জন্য আসল ও নকল ভিডিও আলাদা করা অনেক সময় প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম।

ইউটিউব ঘোষণা দিয়েছে, এখন থেকে এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও বা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় এআই ব্যবহৃত কনটেন্ট শনাক্ত করতে তারা স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং নতুন ডিসক্লোজার লেবেল চালু করবে। এর মাধ্যমে দর্শকরা সহজেই বুঝতে পারবেন তারা যে ভিডিওটি দেখছেন, সেটি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি হয়েছে কি না।

কেন এই পরিবর্তন?

সাম্প্রতিক সময়ে জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির বিস্তার বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এআই এখন মানুষের মুখ, কণ্ঠস্বর কিংবা বাস্তব ঘটনার মতো ভিডিও তৈরি করতে সক্ষম। ফলে ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এবং ডিপফেক ভিডিও নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে।

এ অবস্থায় দর্শকদের আস্থা ধরে রাখা এবং কনটেন্টের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ইউটিউব নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, ব্যবহারকারীরা জানতে চান তারা যে কনটেন্ট দেখছেন তা বাস্তব নাকি এআই-নির্ভর। সেই চাহিদা পূরণ করতেই এই উদ্যোগ।

স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত হবে এআই ভিডিও

এখন পর্যন্ত ইউটিউবে কনটেন্ট নির্মাতাদের নিজেদের উদ্যোগে জানাতে হতো ভিডিও তৈরিতে এআই ব্যবহার করা হয়েছে কি না। তবে নতুন ব্যবস্থায় শুধু নির্মাতাদের ঘোষণার ওপর নির্ভর করা হবে না।

ইউটিউবের নতুন শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ভিডিও বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারবে সেখানে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাস্তবসম্মত এআই ব্যবহার করা হয়েছে কি না। যদি কোনো নির্মাতা সঠিকভাবে এআই ব্যবহারের তথ্য না দেন, তাহলে প্ল্যাটফর্ম নিজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিওতে ডিসক্লোজার লেবেল যুক্ত করবে। এর ফলে দর্শকদের বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে আসবে।

নতুন ডিসক্লোজার লেবেল কীভাবে কাজ করবে?

নতুন ব্যবস্থার আওতায় ভিডিওতে একটি বিশেষ ‘এআই ডিসক্লোজার’ লেবেল যুক্ত থাকবে। এই লেবেল দর্শকদের জানাবে ভিডিওটি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।

দীর্ঘ বা লং-ফর্ম ভিডিওর ক্ষেত্রে এই লেবেল ভিডিও প্লেয়ারের নিচে প্রদর্শিত হবে। অন্যদিকে ইউটিউব শর্টসের ক্ষেত্রে ভিডিও চলাকালীন স্ক্রিনের ওপর সরাসরি ওভারলে হিসেবে দেখা যাবে। ফলে দর্শক ভিডিও দেখা শুরু করার আগেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি জানতে পারবেন।

কিছু লেবেল থাকবে স্থায়ী

ইউটিউব জানিয়েছে, কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ডিসক্লোজার লেবেল সরানো যাবে না। বিশেষ করে ইউটিউবের নিজস্ব এআই টুল ব্যবহার করে তৈরি ভিডিও কিংবা ‘সি২পিএ’ মেটাডেটা যুক্ত কনটেন্টের ক্ষেত্রে এই লেবেল বাধ্যতামূলক থাকবে।

সি২পিএ প্রযুক্তি নির্দেশ করে যে কনটেন্টটির উৎস এবং তৈরির প্রক্রিয়ায় এআই ব্যবহারের তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে এ ধরনের ভিডিওতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে লেবেল স্থায়ীভাবে প্রদর্শিত হবে।

নির্মাতাদের জন্য বাড়তি সুবিধা

যদি কোনো ভিডিওতে ভুলবশত এআই লেবেল যুক্ত হয়, তাহলে কনটেন্ট নির্মাতারা ণড়ঁঞঁনব ঝঃঁফরড় ব্যবহার করে সেটি সংশোধনের আবেদন করতে পারবেন।

এতে একদিকে যেমন দর্শকদের সঠিক তথ্য দেওয়া সম্ভব হবে, অন্যদিকে নির্মাতাদের জন্যও ন্যায়সঙ্গত পরিবেশ বজায় থাকবে।

রিকমেন্ডেশন ও আয় কমবে না

অনেক নির্মাতার মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে যে এআই লেবেল যুক্ত হলে ভিডিওর ভিউ, রিচ বা আয় কমে যেতে পারে। তবে ইউটিউব স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এআই ডিসক্লোজার লেবেলের কারণে ভিডিওর রিকমেন্ডেশন সিস্টেম, মনিটাইজেশন কিংবা দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য কেবল দর্শকদের তথ্য দেওয়া, কোনো কনটেন্টকে শাস্তি দেওয়া নয়।

ডিপফেকের বিরুদ্ধে নতুন লড়াই

এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে অন্যের মুখ বা কণ্ঠস্বর নকল করে তৈরি করা ডিপফেক ভিডিও বর্তমানে বড় উদ্বেগের বিষয়। এ সমস্যা মোকাবিলায় ইউটিউব ইতোমধ্যে ‘লাইকনেস ডিটেকশন’ কর্মসূচি চালু করেছে।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো নির্মাতার চেহারা বা অবয়ব ব্যবহার করে এআই ভিডিও তৈরি করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সতর্কবার্তা পাবেন। এরপর তিনি ভিডিওটি পর্যালোচনা করে অনুমতি ছাড়া তৈরি হলে তা অপসারণের আবেদন করতে পারবেন।

ভবিষ্যতের স্বচ্ছ ডিজিটাল পরিবেশ

বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে তথ্য বিভ্রান্তির ঝুঁকিও। তাই প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই কনটেন্টে স্পষ্ট লেবেলিং এখন সময়ের দাবি।

ইউটিউবের নতুন এই উদ্যোগ শুধু একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; বরং ডিজিটাল স্বচ্ছতা ও ব্যবহারকারীদের আস্থা রক্ষার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও একই ধরনের ব্যবস্থা চালু করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এআই-নির্ভর যুগে সত্য ও কৃত্রিমতার সীমারেখা স্পষ্ট রাখতেই ইউটিউবের এই নতুন নীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।