ঢাকা রবিবার, ০৫ জুলাই, ২০২৬

প্রাইভেসি নাকি জালিয়াতি

ইনফোটেক ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২৬, ০৭:২০ এএম

স্মার্টফোনে যোগাযোগের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপ। এতদিন এই অ্যাপে কাউকে খুঁজে পেতে বা যোগাযোগ করতে মোবাইল নম্বরের প্রয়োজন হতো। তবে সম্প্রতি ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা আরও সুরক্ষিত করতে ফোন নম্বরের পরিবর্তে ‘ইউজারনেম’ বা হ্যান্ডেল ব্যবহারের সুবিধা চালু করতে যাচ্ছে এর মাদার কোম্পানি মেটা। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই ফিচারটির পরীক্ষামূলক বুকিং বা রিজার্ভেশন শুরু হতেই প্রযুক্তি বিশ্বে এটি নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং খোদ সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে, এই সুবিধার আড়ালে ছদ্মবেশ ধারণ বা ‘ইমপার্সোনেশন’ এবং অনলাইন জালিয়াতি এক লাফে অনেক বেড়ে যেতে পারে। ফিচারটি সবার জন্য উন্মুক্ত করার আগে প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বলিউড কিং শাহরুখ খান, অমিতাভ বচ্চন, কিংবা রিলায়েন্স জিও এবং রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে হুবহু মিল থাকা বেশ কিছু ইউজারনেম (যেমন- ‘রহফরধসড়ফর’, ‘ংযধযৎঁশয.ধপঃড়ৎ’, ‘ৎনরথাবৎরভ ’) সহজেই বুকিং করা যাচ্ছিল। এমনকি বিনান্সের প্রতিষ্ঠাতা চ্যাংপেং ঝাও জানিয়েছেন, অন্য প্ল্যাটফর্মে তিনি যে হ্যান্ডেল ব্যবহার করেন, সেটি এখানে বুক করতে পারেননি। মেটা অবশ্য দাবি করেছে, তারা সেলিব্রিটি, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ইউজারনেম আগে থেকেই সংরক্ষিত (রিজার্ভ) রাখছে যাতে অন্য কেউ তা হাতিয়ে নিতে না পারে। তবে ঠিক কোন কোন নাম তারা সুরক্ষিত রাখছে, আর কোনগুলো বাদ পড়ছেÑ সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি কোম্পানিটি। হোয়াটসঅ্যাপের সবচেয়ে বড় বাজার ভারত, যেখানে ৫০ কোটিরও বেশি মানুষ এই অ্যাপ ব্যবহার করেন। ইতোমধ্যেই সেখানে পুলিশ, ব্যাংক বা সরকারি কর্মকর্তা সেজে ডিজিটাল জালিয়াতির ঘটনা নিত্যদিনের বিষয়। এই পরিস্থিতিতে ভারতের ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় হোয়াটসঅ্যাপকে একটি সরকারি নোটিশ পাঠিয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের মতে, ফোন নম্বর গোপন রেখে শুধু ইউজারনেম দিয়ে যোগাযোগের সুযোগ থাকলে অনলাইন জালিয়াতি, ফিশিং এবং ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর মতো সাইবার অপরাধ মারাত্মক রূপ নিতে পারে। সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই বিষয়ে আলোচনা ও সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ভারতে যেন এই ফিচার পুরোপুরি চালু করা না হয়। অন্য দিকে, এই সরকারি হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেছে ডিজিটাল অধিকার রক্ষা বিষয়ক সংস্থা ‘ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন’। তাদের মতে, অপরাধ দমনের জন্য ফৌজদারি আইন আছে, কিন্তু এভাবে গোপনে চিঠির মাধ্যমে কোনো অ্যাপের ফিচার বা ডিজাইন নির্ধারণ করে দেওয়া সরকারের কাজ নয়।

নিরাপত্তা বনাম গোপনীয়তা : বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন? সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ‘সোশ্যালপ্রুফ সিকিউরিটি’-এর প্রধান নির্বাহী র?্যাচেল টোব্যাক মনে করেন, ইউজারনেম ফিচারটি প্রাইভেসির দিক থেকে একটি বড় জয়। কারণ, এর ফলে অপরিচিতদের কাছে ফোন নম্বর ফাঁস হবে না, যা ব্যবহারকারীকে সিম-সোয়াপিং বা অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের হাত থেকে বাঁচাবে। তবে এর পাশাপাশি ইউজারনেমটি আসলেই আসল ব্যক্তির কি না, তা যাচাই করার শক্তিশালী ব্যবস্থাও থাকা জরুরি। সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য তার পরামর্শÑ এমন কোনো ইউজারনেম বেছে নেওয়া উচিত যা সহজে কেউ অনুমান করতে পারবে না। মজিলা ফাউন্ডেশন আবার অন্য একটি আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। মেটা জানিয়েছে যে ব্যবহারকারীরা চাইলে তাদের ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের ইউজারনেমটি হোয়াটসঅ্যাপের সাথে সিঙ্ক বা যুক্ত করতে পারবেন। মজিলা বলছে, এর মাধ্যমে মেটা তাদের সব অ্যাপের ভেতর ব্যবহারকারীর পরিচয় এক সুতোয় বেঁধে ফেলছে, যা পরোক্ষভাবে তাদের একচেটিয়া আধিপত্যকেই প্রকাশ করে। প্রাইভেসি এবং সুরক্ষার এই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে হোয়াটসঅ্যাপ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা তাড়াহুড়ো না করে ধীরে ধীরে এটি চালু করছে। ব্যবহারকারী ও বিভিন্ন মহলের মতামত পর্যালোচনা করে বছরের শেষ নাগাদ একটি নিরাপদ সংস্করণ নিয়ে আসার ব্যাপারে আশাবাদী মেটা। তবে প্রযুক্তি দুনিয়া এখন তাকিয়ে আছেÑ হোয়াটসঅ্যাপ শেষ পর্যন্ত সুরক্ষার এই চ্যালেঞ্জ কীভাবে পার করে।