ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

এআই অপারেটিং সিস্টেম ড্রইক্লো

ইনফোটেক ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ০২:৪৯ এএম

একসময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ছিল স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের একটি অতিরিক্ত সুবিধা। ছবি সম্পাদনা, লেখা তৈরি, ভাষা অনুবাদ কিংবা ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, এসব নির্দিষ্ট কাজেই এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু প্রযুক্তি বিশ্বের নতুন লক্ষ্য হলোÑ এআইকে আর আলাদা কোনো ফিচার হিসেবে না দেখে পুরো অপারেটিং সিস্টেমের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা। অর্থাৎ ভবিষ্যতের স্মার্ট ডিভাইসে ব্যবহারকারীকে আর বিভিন্ন অ্যাপ খুলে কাজ করতে হবে না, বরং তিনি কী করতে চান তা বুঝেই অপারেটিং সিস্টেম নিজে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করবে। এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে কাজ করছে চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সাংহাই ড্রই টেকনোলজি, যার নতুন এআই-নেটিভ অপারেটিং সিস্টেমের নাম ড্রইক্লো।বর্তমান সময়ে প্রায় সব স্মার্টফোনেই কোনো না কোনো এআই সুবিধা রয়েছে। তবে সেগুলো মূলত বিদ্যমান অপারেটিং সিস্টেমের ওপর যুক্ত হওয়া অতিরিক্ত ফিচার। ব্যবহারকারীকে এখনো নির্দিষ্ট অ্যাপ খুলে সেখানে গিয়ে কাজ করতে হয়। ড্রইক্লোর দর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে এআইকে অপারেটিং সিস্টেমের মূল স্থাপত্যের মধ্যেই সংযুক্ত করা হয়েছে। ফলে এটি শুধু একটি অ্যাপের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পুরো সিস্টেম পরিচালনার অংশ হয়ে ওঠে। ব্যবহারকারীর সঙ্গে যোগাযোগ, কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, সিস্টেম পরিচালনা এবং বিভিন্ন সেবার সমন্বয়Ñ সবকিছুতেই এআই সরাসরি ভূমিকা রাখে।

এই নতুন ধারণাকে বলা হচ্ছে এজেন্টিক অপারেটিং সিস্টেম। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো, ব্যবহারকারীকে আলাদা আলাদা অ্যাপের মধ্যে ঘুরে কাজ করতে হবে না। কেউ যদি স্বাভাবিক ভাষায় কোনো কাজের নির্দেশ দেন, তাহলে এআই প্রথমে সেই অনুরোধের অর্থ বুঝবে, এরপর প্রয়োজনীয় ধাপ নির্ধারণ করবে এবং বিভিন্ন সিস্টেম ও সেবার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ সম্পন্ন করবে। প্রয়োজন হলে সংবেদনশীল কাজের আগে ব্যবহারকারীর অনুমতিও নেবে। ফলে একই কাজের জন্য একাধিক অ্যাপ খুলে তথ্য আদান-প্রদানের ঝামেলা অনেকটাই কমে আসবে।

ড্রইক্লোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑ এর হাইব্রিড এআই অবকাঠামো। সাধারণ অবস্থায় এটি ক্লাউডভিত্তিক বড় ভাষা মডেল ব্যবহার করে, যা জটিল প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, ছবি বা লেখা তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং উন্নত এআই সেবা দিতে সক্ষম। আবার ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলে বা ক্লাউড সেবা সাময়িকভাবে ব্যবহার করা না গেলে ডিভাইসের ভেতরে থাকা ছোট আকারের এআই মডেল প্রয়োজনীয় মৌলিক কাজ চালিয়ে যেতে পারে। ফলে ব্যবহারকারী সম্পূর্ণভাবে অনলাইন সেবার ওপর নির্ভরশীল থাকেন না।

এআই যত বেশি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করবে, নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই ড্রইক্লো এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে ব্যবহারকারী জানতে পারবেন এআই কী করছে এবং কোন কাজ কীভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। সংবেদনশীল কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর অনুমোদন বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে। পাশাপাশি তথ্য ব্যবস্থাপনা, অনুমতি নিয়ন্ত্রণ এবং কাজের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে এআই এজেন্টের কার্যক্রমকে স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির আরেকটি লক্ষ্য হলো উন্নত এআই প্রযুক্তিকে শুধু উচ্চমূল্যের স্মার্টফোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখা। সেই উদ্দেশ্যে ড্রইক্লো যুক্ত প্রথম দিকের স্মার্টফোনগুলো তুলনামূলক কম দামে বাজারে আনা হয়েছে। বর্তমানে কুলপ্যাড ও ফিলিপসের কিছু স্মার্টফোনে এই অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যবহারকারীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন এআই মডেল নির্বাচন, নিজস্ব এআই সহকারী তৈরি, নতুন দক্ষতা যুক্ত করা এবং নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয় কাজ নির্ধারণের সুযোগও পাবেন।

ড্রইক্লোর পেছনে থাকা সাংহাই ড্রই টেকনোলজি ২০০৮ সাল থেকে অপারেটিং সিস্টেম উন্নয়নে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের আগের ফ্রিমিওএস বিশ্বের ২০ কোটিরও বেশি ডিভাইসে ব্যবহৃত হয়েছে এবং ইউরোপ, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও লাতিন আমেরিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এক হাজারের বেশি হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার অংশীদারের সঙ্গে তারা কাজ করেছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তারা এখন এআই-কেন্দ্রিক নতুন প্রজন্মের অপারেটিং সিস্টেম গড়ে তুলছে।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনের কম্পিউটিং ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য বোঝার সক্ষমতা। এতদিন মানুষকে নির্ধারণ করতে হতো কোন অ্যাপ ব্যবহার করবেন। ভবিষ্যতে অপারেটিং সিস্টেমই বুঝে নেবে ব্যবহারকারী কী করতে চান এবং সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। ড্রইক্লো সেই ভবিষ্যতেরই একটি ঝলক দেখাচ্ছে, যেখানে অ্যাপের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে ব্যবহারকারীর প্রয়োজন, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই হয়ে উঠবে পুরো ডিজিটাল অভিজ্ঞতার মূল চালিকাশক্তি।