ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা আধুনিকতার নিরিখে আমাদের জীবনকে পরিমাপ করতে যাই, তখন অজান্তেই কিছু দাসত্বের শৃঙ্খল আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। আমরা ভাবি আমরা স্বাধীন, কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়Ñ আমরা আসলে এক অদৃশ্য স্রোতের অন্ধ অনুসারী মাত্র। এই মনস্তাত্ত্বিক গোলামি থেকে মুক্তির প্রথম ইশতেহার দিয়েছিলেন আজ থেকে হাজার বছর আগে বিশ্বমানবতার অন্যতম আলোর দিশারী, মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)। বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ নোমান আলী খানের গভীর হিকমতপূর্ণ বিশ্লেষণের আলোকে যদি আমরা হজরত ইবরাহিমের (আ.) জীবনের একটি বিশেষ অধ্যায়ের দিকে তাকাই, তবে বর্তমান যুগের মানসিক ও সামাজিক ব্যাধিগুলো থেকে মুক্তির এক অনন্য প্রেসক্রিপশন খুঁজে পাব।
পারিপার্শ্বিকতার দাসত্ব ও ‘স্বাভাবিকতা’র বিভ্রান্তি
ইবরাহিম (আ.) যখন তরুণ ছিলেন এবং তিনি তাঁর সমাজের মানুষদের দিকে তাকাচ্ছিলেন, যাদের সঙ্গে তিনি বড় হয়েছেনÑ যাদের সবার ধর্ম এক ছিল, সবার সংস্কৃতি এক ছিল, তারা একই ভাষায় কথা বলত। আপনি যখন একটি সমাজে বড় হন এবং মানুষকে একই কাজ করতে দেখেন, আপনার চারপাশের সবাই যখন একই কাজ করছে, তখন সেটি আপনার কাছে স্বাভাবিক বা ‘নরমাল’ হয়ে যায়। সেটিই তখন আপনার করার মতো সাধারণ বুদ্ধির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। যদি রাস্তার সবাই একদিকে গাড়ি চালায়, তবে একমাত্র যে ব্যক্তি উল্টো দিকে গাড়ি চালাচ্ছে সে-ই পাগল। এটিই স্বাভাবিক। আপনি কীভাবে জানেন যে এটি স্বাভাবিক? কেউ আপনাকে শেখায়নি যে এটি স্বাভাবিক। আপনি কেবল দেখেছেন যে বাকি সবাই ওভাবেই গাড়ি চালাচ্ছে, তাই ওটাই স্বাভাবিক হতে হবে। আমরা আমাদের চারপাশের যা দেখি, তা দিয়েই স্বাভাবিকতাকে সংজ্ঞায়িত করি।
ভালো খাবার বা ভালো রান্না কী, তা আপনি সংজ্ঞায়িত করেন সেই খাবার দিয়ে, যা খেয়ে আপনি বড় হয়েছেন এবং আপনি দেখছেন যে সবাই সেই খাবারটি উপভোগ করছে। একপর্যায়ে আপনার রুচি সেই সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করে যেখান থেকে আপনি এসেছেন। আপনি যদি কোনো ইরাকিকে জিজ্ঞেস করেন, পৃথিবীর সেরা খাবার কী, তারা বলবে ইরাকি খাবার; যদি কোনো বাংলাদেশিকে জিজ্ঞেস করেন পৃথিবীর সেরা খাবার কী, সে বলবে, বাংলাদেশি খাবার। কেন? কারণ ওটিই ছিল তাদের স্বাভাবিকতা এবং সেখান থেকেই তারা ভালো ও মন্দ এবং সুন্দর ও কুৎসিতকে সংজ্ঞায়িত করেছে। প্রতিটি সংজ্ঞা এসেছে তাদের চারপাশ থেকে। আপনি কল্পনা করতে পারেন যে, ইবরাহিম (আ.) কে শিশু অবস্থায় তার পিতা বহুবার উপাসনালয়ে বা মন্দিরে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি সব মানুষকে উপাসনা করতে দেখেছিলেন। তিনি অন্য কোনো ধর্ম জানেন না। অন্য কোনো চিন্তাভাবনা জানেন না এবং তিনি সেই মানুষদের চেনেন যারা তাকে বড় করেছে; যে মানুষগুলো তার চেয়ে বেশি জানে, যে মানুষগুলো তাকে রক্ষা করে, যারা তাকে খাবার দেয়। সুতরাং এটা খুব স্বাভাবিক যে, তিনি তাদের মতোই চিন্তা করবেন। তাদের চিন্তাকেই সঠিক মনে করবেন। সবাই তাই করে। মানুষ হয়েও অনেকটা ভেড়ার মতো হয়ে যায়। একটা ভেড়া যখন দেখে পালের অন্য সব ভেড়া এই দিকে যাচ্ছে, তখন সেও ওই দিকেই যায়; কোনো প্রশ্ন করে না, শুধু সেই দিকে চলতে থাকে।
ইব্রাহিমীয় জিজ্ঞাসার যৌক্তিক সৌন্দর্য
কিন্তু একজন মানুষের তো চিন্তা করার ক্ষমতা আছে। প্রশ্ন করার ক্ষমতা আছে। একজন মানুষের এই চিন্তা করার ক্ষমতা আছে যেÑ আমি জানি সবাই বলছে এটা স্বাভাবিক, কিন্তু এটা কি সঠিক? এটা কি যৌক্তিক?
ইবরাহিম (আ.) একটি মৌলিক প্রশ্ন করেন। আল্লাহ যেভাবে তার প্রশ্নটি বর্ণনা করেছেন তা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি প্রথমে অন্যদের বলেননি যে ‘তোমরা ভুল’। তিনি প্রথমে তাদের একটি প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি তাদের কাছ থেকে শুনতে চেয়েছিলেন। দেখুন, আপনারা এটি অনুশীলন করছেন, আপনারা সবাই এটি করছেন, আমি আশা করি আপনারা ব্যাখ্যা করতে পারবেন কেন আপনারা এটি করছেন। আমি আশা করি আপনারা আমাকে একটি ব্যাখ্যা দিতে পারবেন, যাতে আমরা আপনাদের কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারি এবং বুঝতে পারি কেন সেই কারণগুলো আমার কাছে যৌক্তিক মনে হচ্ছে কিংবা কেন যৌক্তিক মনে হচ্ছে না। তিনি প্রথমেই তাদের ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেননি। বরং আলোচনা শুরু করতে চেয়েছেন। তাই তিনি এই প্রশ্নটি করেছেন।
‘তামাসিল’ ও ‘আকিফুন’ শব্দের ভাষাতাত্ত্বিক রহস্য
কোরআনের যে আয়াতে তার প্রশ্নটি বর্ণিত হয়েছে, ওই আয়াতের অনুবাদ এভাবেই করা হয়Ñ ‘এই মূর্তিগুলো কী যার সামনে তোমরা বসে আছ?’ এবং আমরা এখানে দুটি শব্দের ওপর মনোযোগ দেব। আরবিতে ‘মূর্তিগুলো’ এবং ‘সামনে বসে থাকা’। এখানে মূর্তিগুলোর জন্য আরবি শব্দটি হলো ‘তামাসিল’, আর তামাসিল শব্দটি এসেছে আরবি ভাষায় ‘তামাসিল’ বা ‘মিসল’ থেকে। এটি ‘আসনাম’ থেকে আলাদা। আসনাম মানে আক্ষরিক অর্থেই মূর্তি। ‘আওছান’ মানে খোদাই করা বস্তু ও মূর্তি। কিন্তু তামাসিল হলো যখন আপনি কোনো কিছুকে এতটাই বাস্তবসম্মতভাবে তৈরি করেন যে আপনার মনে হয় এটি আসলে আসল জিনিস। যেমন ধরুন মাদাম তুসোর মোমের মূর্তিগুলো; তারা সেগুলো মানুষের সমান আকৃতির এবং হুবহু অবয়বে তৈরি করে। অনেক সময় দেখবেন, মানুষ মৃত কোনো সেলিব্রেটি বা প্রেসিডেন্টের মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে এবং অন্যরা অবাক হয়ে ভাবছে, ‘তুমি এটি কীভাবে করলেন?’ কারণ মূর্তি হলেও এগুলো দেখতে বাস্তব মানুষের মতোই। তিনি এই শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন কারণ তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ‘আমি জানি যে তোমরা আসলে মূর্তির পূজা করছ না। তোমরা ভাবছ এই মূর্তিটি কোনো কিছুর প্রতিনিধিত্ব করছে এবং এটি আসলের এতটাই কাছাকাছি যে এটি তোমাদের অনুভূতি দেয় যেন এটিই আসল জিনিস।’ তামাসিল শব্দের জন্য একটি ভালো প্রতিশব্দ হলো ‘প্রতিনিধি’। এই প্রতিনিধিগুলো কী? এই প্রতিনিধিগুলো কী যার সামনে তোমরা বসে আছ? তিনি এটাই বলেছেন। দ্বিতীয় শব্দটি হলো ‘আকিফুন’। আপনারা হয়তো ‘ইতেকাফ’ শব্দের সঙ্গে পরিচিত। যখন কেউ মসজিদে অবস্থান করে এবং আল্লাহর ইবাদত করে, সেটাকে ইতেকাফ বলা হয়। তিনি ‘আকিফুন’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটি আসলে এসেছে ‘আকাফা’ থেকে। যখন একটি সুতা মালার সবকটি পুঁতি একসঙ্গে ধরে রাখে এবং পুঁতিগুলো মালা থেকে খসে পড়ে যায় নাÑ সেটিকে ‘আকাফা’ বলা হয়। এর পেছনের মূল ভাবনাটি হলো, আপনার মাথায় এই ধারণাটি রয়েছে, আপনার মাথায় এই রূপক বা প্রতিনিধিটি রয়েছে এবং আপনি এটিকে আপনার মাথায় একসঙ্গে ধরে রাখছেন। আমি এটি আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করছি এই কারণে যে, ইবরাহিমের (আ.) গল্পটি কেবল ইবরাহিম (আ.) এবং সেই মানুষদের নিয়ে নয়। এটি আসলে আমাদের নিয়ে। কারণ এই তামাসিল হাজার বছর আগে একটি মূর্তি হতে পারেÑ এমন কিছু যা বাস্তবে দেখতে একটি পাথর, কিন্তু আমার মাথায় সেটি এক ধরনের উপাস্য বা দেবতা; এটি বৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করে, আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে, আমার সন্তান হবে কি হবে না তা নিয়ন্ত্রণ করে। এই চিন্তা আমার মাথায় রয়েছে এবং আমি এই ধারণাটি আমার মাথায় একসঙ্গে ধরে রাখছি। যদিও সেই পাথরের সঙ্গে আমার সন্তান হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু আমি এই জিনিসগুলো একসঙ্গে গেঁথেছি এবং আমার মাথায় এদের একসঙ্গে বেঁধে ফেলেছি। আমি তাদের মধ্যে একটি সংযোগ তৈরি করেছি।ইবরাহিম (আ.) যখন বললেন, ‘তোমরা কি এই সংযোগটি আমাকে বুঝিয়ে বলতে পার? কীভাবে তোমরা এই মূর্তির সঙ্গে তোমাদের এই ধারণার সংযোগ ঘটালে? এর পেছনের ব্যাখ্যাটা কী?’ স্বাভাবিকভাবেই তাদের উত্তর ছিল, ‘আমরা আমাদের বাবাদের এটি করতে দেখেছি এবং তাদের বাবাদের এবং তাদের বাবাদের।’ এটাই ছিল তাদের উত্তর, যা কোনো ব্যাখ্যা নয়। এটা শুধু যা আপনারা দেখেছেন তা-ই। সুতরাং তারা মূলত বলেছিলম, ‘আমরা পূর্বপুরুষদের অনুকরণ করছি।’
আধুনিক যুগের ‘তামাসিল’ ও আমাদের পরাধীনতা
আজ আমরা অনেকে হয়তো মূর্তিপূজক নই। কিন্তু এরপরও বিভিন্ন রকম তামসিলের পূজা আমরা করি।
সোশ্যাল মিডিয়া ও রূপের মরীচিকা : যেমন একজন তরুণীর আত্মবিশ্বাস হয়তো খুব কম। সে সোশ্যাল মিডিয়ায় যায়। সে টিকটকে যায় কিংবা ইনস্টাগ্রামেও যায়। সেখানে অনেক ইনফ্লুয়েন্সারকে দেখে যারা দেখতে অত্যন্ত সুন্দরী, শরীর প্রদর্শন করে, একটি নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে কথা বলে, ছুটিতে বেড়াতে যায়, সেলফি তোলে এবং সেগুলো পোস্ট করে। এগুলো দেখে সে তার অনুসরণ করে, তার মতো হতে চায়। তার পূজা করে। তার মাথায় সর্বক্ষণ এই চিন্তা ঘুরতে থাকে যে, আমি এখনো তার মতো দেখতে হইনি; আমার এখনো তার মতো মেকআপ নেই; আমার এখনো তার মতো এত ফলোয়ার নেই।
সামাজিক আভিজাত্যের অন্ধ প্রতিযোগিতা : তরুণদের ক্ষেত্রেও এটা ঘটে, আবার বয়স্কদের ক্ষেত্রেও ঘটে। যেমন ধরুন গ্রামের কোনো একজন ধনী ব্যক্তি নিজের ছেলের বিয়েতে বিরাট অনুষ্ঠান করে, অনেককে খাওয়ায়, প্রচুর টাকা ওড়ায়। এটা অনেকের জন্য তামাসিল হয়ে দাঁড়ায়। ইজ্জতের মানদ- হয়ে দাঁড়ায়। তারা ভাবতে থাকে, এভাবে ধুমধাম করে নিজেদের ছেলেদের বিয়ে না করালে তাদের ইজ্জত থাকবে না। সামর্থ্য না থাকলেও তরা তাদের ওই তামসিলের অনুসরণ করার চেষ্টা করে।
ইব্রাহিমীয় আদর্শে ফেরার আহ্বান
হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর আদর্শ আমাদের শেখায় সমাজের তৈরি করে দেওয়া অন্ধ স্রোতে গা না ভাসিয়ে সত্য, যুক্তি ও ঐশী হিদায়াতের আলোয় নিজের জীবনকে পরিচালনা করা। আমাদের চারপাশের করপোরেট সংস্কৃতি বা সামাজিক লোকলজ্জা যদি আল্লাহর বিধানের পরিপন্থি কোনো ‘তামাসিল’ বা রূপক মূর্তি খাঁড়া করে, তবে একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো ইবরাহিমী চেতনা বুকে ধারণ করে সেই মূর্তিকে ভেঙে চুরমার করে দেওয়া। আল্লাহ যেন আমাদের এমন মানুষ বানান যারা নিজেদের এই শৃঙ্খলগুলো থেকে মুক্ত করতে পারে। আমরা যেন আমাদের জীবনের সব তামাসিল বা মূর্তিগুলো চিনতে পারি ও সেগুলো ভেঙে ফেলতে পারি। যেমন ইবরাহিম (আ.) তার সমাজের তামাসিল বা মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। আমরা যেন সত্যিকার অর্থেই আমাদের পিতা ইবরাহিমের দ্বীনের ওপর দৃঢ় থাকতে পারি। আমিন।

