ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

কেমন হওয়া উচিত হাজির হজ-পরবর্তী জীবন

ইসলামের আলো প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২৬, ০৬:০০ এএম

হজ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়Ñ মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার ধন-সম্পদ, বংশ বা পদমর্যাদা নয় বরং আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা নির্ধারিত হয় তাকওয়ার ভিত্তিতে। কিন্তু হজের প্রকৃত সফলতা শুধু কাবাঘর তাওয়াফ, সাফা-মারওয়া সাঈ কিংবা আরাফার ময়দানে অবস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং একজন হাজির জীবনে এর প্রভাব কতটুকু পড়ল, তার চরিত্র, আমল ও জীবনযাত্রায় কতটুকু পরিবর্তন এলোÑ সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হজ-পরবর্তী জীবন যদি আল্লাহভীতি, ইবাদত, সততা ও মানবিকতায় আলোকিত না হয়, তবে হজের আধ্যাত্মিক শিক্ষা অপূর্ণ থাকে। এ জন্য একজন হাজির উচিত নিচের বিষয়গুলোর ওপর শতভাগ গুরুত্ব দেওয়া।

তাকওয়ার প্রতিফলন

হজের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো তাকওয়া অর্জন। তাই হজ শেষে একজন হাজির জীবনে তাকওয়ার বাস্তব প্রতিফলন ঘটতে হবে। তার দৃষ্টি, কথা, লেনদেন ও আচরণে আল্লাহভীতি প্রকাশ পাবে। সে হারাম থেকে বেঁচে চলবে এবং হালাল জীবনের প্রতি যতœবান হবে। আল্লাহ-তায়ালা বলেন, ‘তোমরা পাথেয় গ্রহণ করো, আর সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৭)।

ইবাদতের প্রতি যতœশীলতা

অনেক মানুষ হজ থেকে ফিরে সাময়িকভাবে আবেগপ্রবণ হয়; কিন্তু কিছুদিন পর আবার আগের জীবনে ফিরে যায়। অথচ প্রকৃত হাজি সে-ই, যার আমলে স্থায়ী পরিবর্তন আসে। হজের পর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, তাহাজ্জুদ, জিকির-আজকার ও নফল ইবাদতের প্রতি বিশেষ যতœবান হওয়া জরুরি।  কেননা, আল্লাহর কাছে বান্দার  সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো সেটি, যা বান্দা নিয়মিত করে থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৬৪)।

গুনাহমুক্ত পবিত্র জীবন

হজ মানুষের জীবনে তওবার এক সুবর্ণ সুযোগ। একজন হাজি যখন আল্লাহর ঘর থেকে ফিরে আসে, তখন তার হৃদয় গুনাহের ভয় ও আখেরাতের চিন্তায় কোমল হয়ে যায়। তাই হজের পর মিথ্যা, গিবত, প্রতারণা, সুদ, ঘুষ ও হারাম উপার্জন থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য। আল্লাহ-তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২২২)।

বিনয়, নম্রতা ও মানবিকতা

হজ মানুষকে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের মহান শিক্ষা দেয়। সেখানে রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব, কালো-সাদাÑ সবাই একই পোশাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়। এই দৃশ্য মানুষকে অহংকার ত্যাগ করতে শেখায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১)।

আখেরাতমুখী জীবন গঠন

হজ মানুষকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী উপলব্ধি করায়। কাবার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ অনুভব করেÑ একদিন তাকে সবকিছু ছেড়ে আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে।

তাই হজ-পরবর্তী জীবন হওয়া উচিত আখিরাতকেন্দ্রিক। আল্লাহ-তায়ালা বলেন, ‘আর আখিরাতই হলো স্থায়ী জীবন, যদি তারা জানত।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৪)।

সমাজের আদর্শ মানুষ হওয়া

হজ থেকে ফিরে একজন মানুষ শুধু ‘হাজি’ উপাধি অর্জন করলেই যথেষ্ট নয়; বরং তার জীবন অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা হওয়া উচিত।  তার সততা, আমানতদারি, চরিত্র ও ব্যবহার দেখে মানুষ ইসলামের সৌন্দর্য উপলব্ধি করবে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যার চরিত্র উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৫৫৯)। আমাদের সমাজে অনেক মানুষ হজ পালন করেও চরিত্র ও আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে না। ফলে তার মাধ্যমে হজের প্রকৃত শিক্ষা সমাজে প্রতিফলিত হয় না। একজন হাজির প্রকৃত পরিচয় তার পোশাক বা উপাধিতে নয়; বরং তার আমল, চরিত্র ও জীবনাচরণে প্রকাশ পায়। হজের পর যদি একজন মানুষের অন্তরে তাকওয়া বৃদ্ধি পায়, ইবাদতে মনোযোগ বাড়ে, গুনাহের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হয় এবং মানবিকতা বিকশিত হয়Ñ তবেই তার হজ সফল।