ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

পাঠ্যবইয়ের সংকটে পড়বে দুই শ্রেণির শিক্ষার্থীরা

উৎপল দাশগুপ্ত
প্রকাশিত: জানুয়ারি ১, ২০২৬, ০২:৫৪ এএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে চলমান রাষ্ট্রীয় শোকের মধ্যেই আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বিনা মূল্যের পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হবে। আজ নতুন বছর ও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথমদিন সারা দেশের প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষার্থী বই পাবে। বই বিতরণে সরকারিভাবে এবার কোনো উৎসবের আয়োজন হচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ স্কুলে গিয়ে বই নিবে। এরই মধ্যে দেশের সব স্কুলে বই পৌঁছে গেছে। বই বিতরণের প্রস্তুতিও সম্পন্ন বলে জানিয়েছেন রাজধানীসহ দেশের একাধিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক।

এনসিটিবি ও সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে গত ৩০ ডিসেম্বর রাত ৯টা পর্যন্ত পাওয়া বই উৎপাদন ও বিতরণের হিসাব থেকে জানা গেছে, আজ প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা শতভাগ বই পেলেও ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরের ৬৭ শতাংশ বই উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। এই স্তরের মোট বইয়ের মধ্যে সাত কোটির বেশি বই এখনো সরবরাহ সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিশাল একটি অংশ পাঠ্যবই নিয়ে সংকটে পড়তে যাচ্ছে।

জানা গেছে, সপ্তম শ্রেণিতে চার কোটি ১৫ লাখ বইয়ের মধ্যে বিতরণের জন্য প্রস্তুত মাত্র এক কোটি ৮৬ লাখ (৪৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ) আর অষ্টম শ্রেণির চার কোটি দুই লাখ বইয়ের মধ্যে বিতরণের জন্য প্রস্তুত মাত্র এক কোটি ৪৪ লাখ (৩৬ শতাংশ)।

এনসিটিবি সূত্র ও প্রেসগুলো বলছে, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিসহ মাধ্যমিকের সব শিক্ষার্থীর সব বিষয়ের বই হাতে পেতে পুরো জানুয়ারি মাস লেগে যেতে পারে। গত ২৮ ডিসেম্বর রোববার পাঠ্যবইয়ের অনলাইন ভার্সন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরারও জানিয়েছিলেন, সব শিক্ষার্থীর সব বই পেতে জানুয়ারি মাস লাগতে পারে। এদিন শিক্ষা উপদেষ্টা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ের অনলাইন ভার্সন উদ্বোধন করেন। তবে গতকাল বুধবার এনসিটিবি চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মাহবুবুল হক রূপালী বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, ১৫ জানুয়ারির মধ্যে যাতে সব শিক্ষার্থী সব বই পায় সে লক্ষ্যে কাজ চলছে।

শিক্ষার্থীদের মাঝে শতভাগ বিতরণ করতে না পারলেও বইয়ের মান নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে এনসিটিবি। শিক্ষা উপদেষ্টাও বলেছেন, ‘বইয়ের কোয়ালিটি গত বছরের তুলনায় এবার অনেকটা ভালো হয়েছে।’ অন্যদিকে ৩০ ডিসেম্বর শিক্ষাসচিব ও এনসিটিবি চেয়ারম্যানের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে মাঠপর্যায়ের মাধ্যমিক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তারাও বইয়ের মান নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

সূত্র জানিয়েছে, বইয়ের মান নিয়ন্ত্রণ এবার কঠোরভাবে নজরদারি করা হয়েছে। এর ফলে গত ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বই ছাপানোতে যুক্ত বড়-ছোট বিভিন্ন প্রেসের নিম্নমানের মোট তিন হাজার টন কাগজ, ৪৫ লাখ মুদ্রিত ফর্মা ও ২৫ লাখ তৈরি বই নষ্ট করা হয়েছে। তৈরি ২৫ লাখ বইয়ের সঙ্গে কাগজ ও মুদ্রিত ফর্মা যোগ করলে কোটিরও বেশি বই নিম্নমানের অভিযোগে নষ্ট করা হয়েছে বলে জানা গেছে। উৎপাদন থেকে শুরু করে উপজেলায় সরবরাহ পর্যন্ত বইয়ের মান নিয়ন্ত্রণে প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) এজেন্ট হিসেবে এনসিটিবির পক্ষে দায়িত্ব পালন করছে কন্ট্রোল ইউনিয়ন বিডি। এছাড়া এনসিটিবির নিজস্ব কর্মকর্তাদের মনিটরিং টিম নিয়মিত নজরদারি করছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও নিয়মিত প্রেসগুলোর ছাপার কাজ তদারক করছেন। এসব কর্মকাণ্ডের বাইরে সরকারের বিভিন্ন এজেন্সিও নিয়মিত বই ছাপার কাজ নজরদারি করছেন।

বইয়ের মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কন্ট্রোল ইউনিয়ন বিডির প্রকল্প পরিচালক রাফি মাহমুদ বিপ্লব বলেন, ‘অন্যান্যবারের চেয়ে এবারের বই ছাপার পরিস্থিতি ভিন্ন। দেশের প্রেসগুলোর বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগে এবার বিদেশ থেকে বই ছাপানোর একটা পরিকল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত সেটা না হলেও প্রেসগুলোর ওপর ভালো বই দেওয়ার চাপ পড়েছে। পাশাপাশি ইন্সপেকশন এজেন্টদেরও নিজেদের কাজকে ভালো প্রমাণ করার তাগিদ রয়েছে। কারণ প্রেস বা ইন্সপেকশন এজেন্ট যে কারোর ব্যর্থতাতেই খারাপ বই গেলে আগামীতে বিদেশ থেকে বই ছাপিয়ে আনার পরিকল্পনা গতি পেতে পারে।’ মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২৪ ঘণ্টা আলাদা আলাদা টিম দিয়ে প্রেসগুলো নজরদারি করার পাশাপাশি নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।  

সূত্র মতে, প্রাথমিক স্তরের শতভাগ বই বিতরণের জন্য প্রস্তুত। তবে ইবতেদায়ি স্তরের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির মোট বইয়ের মধ্যে তিন কোটি ১১ লাখ ১৯ হাজার ৩৪৭ কপি বইয়ের মধ্যে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিতরণের জন্য সরবরাহ করা হয়েছে দুই কোটি ৯৩ লাখ ২৬ হাজার ৩৪৭ কপি; যা মোট বইয়ের ৯৪ দশমিক ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ এই স্তরের প্রায় পাঁচ শতাংশ বই এখনো বিতরণের জন্য প্রস্তুত নয়।

অন্যদিকে মাধ্যমিক স্তরের মোট ১৮ কোটি ৩২ লাখ চার হাজার ৯২৭ কপি বইয়ের মধ্যে বিতরণের জন্য সরবরাহ করা হয়েছে ১১ কোটি ১৩ লাখ ৪৪ হাজার ৮৪৪ কপি; যা মোট বইয়ের ৬১ দশমিক ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ সাত কোটির বেশি বই এখনো বিতরণের জন্য প্রস্তুত হয়নি; যা মোট বইয়ের প্রায় ৩৮ শতাংশ। এই স্তরের ষষ্ঠ শ্রেণিতে চার কোটি ৪৩ লাখ বইয়ের মধ্যে বিতরণের জন্য প্রস্তুত তিন কোটি ৪৭ লাখ (৭৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ), সপ্তম শ্রেণিতে চার কোটি ১৫ লাখ বইয়ের মধ্যে বিতরণের জন্য প্রস্তুত মাত্র এক কোটি ৮৬ লাখ (৪৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ), অষ্টম শ্রেণির চার কোটি দুই লাখ বইয়ের মধ্যে বিতরণের জন্য প্রস্তুত মাত্র এক কোটি ৪৪ লাখ (৩৬ শতাংশ)। আর নবম শ্রেণিতে পাঁচ কোটি ৭০ লাখ বইয়ের মধ্যে বিতরণের জন্য প্রস্তুত চার কোটি ৫২ লাখ (৭৯ শতাংশ)। আরও বিপুল সংখ্যক বই প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) করে গতকাল উপজেলায় সরবরাহের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব বই উপজেলায় পৌঁছলে আজ বইয়ের সরবরাহের পরিমাণ বাড়বে বলে সূত্রের দাবি।

এনসিটিবি সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের অভিজ্ঞতা স্মরণে রেখে এবার পাঠ্যবই ছাপার প্রক্রিয়া আগেভাগেই শুরু করা হয়েছিল। নভেম্বরের মধ্যে সব পাঠ্যবই ছাপিয়ে মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়। তবে নভেম্বরে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবই ছাপার দরপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ফলে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করে বই ছাপানোর কাজ শুরু করতে অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া ছাপার কাজে মন্ত্রণালয় ও ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অনুমোদন পেতেও দেরি হয়। ফলে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু করতে না পারায় পিছিয়ে যায় বই ছাপানোর পুরো প্রক্রিয়া।

এদিকে মাঠপর্যায়ে ৪টি জেলার শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে বই বিতরণের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছে রূপালী বাংলাদেশ। বিশেষভাবে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই নিয়ে সংকটের কথা জানিয়েছেন শিক্ষা কর্মকর্তারা। বইয়ের মান নিয়েও সবাই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মজিদ বলেন, ‘সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বইয়ের সংকট থাকলেও এরই মধ্যে ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণির বই পেয়েছি। কারিগরির বই পেয়েছি শতভাগ। মহানগরীর ১৬ থানা ও ৫ উপজেলার কোনো স্কুলের কোনো শিক্ষার্থী বই পাবে না, এমনটি হবে না’।

চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল আজিজ বলেন, ‘আমার জেলার ১০ থানা ও ১৫ উপজেলায় কোটির বেশি বইয়ের মধ্যে গড়ে ৫০ শতাংশ পেয়েছি। সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বইয়ের সংকট রয়েছে। জানুয়ারির মধ্যে সব বই পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে এনসিটিবি। কাল (আজ) যা বই হাতে আছে, সেগুলোই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।’

রাজশাহী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জায়েদুর রহমান বলেন, ‘সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির কোনো বই আসেনি। ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণির বই কিছুটা ঘাটতি থাকলেও অসুবিধা হবে না।’

রংপুরের শিক্ষা কর্মকর্তা এনায়েত সিকদার বলেন, ‘সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই আসেনি। ইবতেদায়ির বই পাওয়া গেছে শতভাগ। জানুয়ারির মধ্যেই সব বই পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে এনসিটিবি।’     

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বর্তমানে এনসিটিবির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বইয়ের সংকট স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘১ তারিখের মধ্যে ওই দুই শ্রেণির ৭০ শতাংশ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। ১৫ জানুয়ারির মধ্যে সব শিক্ষার্থী সব বই পাবে। তিনি আরও বলেন, ‘প্রেসগুলোর সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ২২ জানুয়ারির মধ্যে সব বই দেওয়ার কথা। এ সময়ের আগে বই না দিলেও নিয়ম অনুযায়ী তাদের (প্রেস) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। তারপরও নানাভাবে তাদের মোটিভেট করে চেষ্টা করেছি সব শিক্ষার্থীর কাছে বই পৌঁছাতে। এছাড়া বইয়ের মানও আগের তুলনায় অনেক ভালো হয়েছে।’