ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

২০২৬ শিক্ষাবর্ষ

পাঠ্যবইয়ে গণঅভ্যুত্থান, বাদ পড়েছে ভুল ইতিহাস

উৎপল দাশগুপ্ত
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২২, ২০২৬, ০৬:৫৬ এএম
ফাইল ছবি

চলতি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রণীত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের নতুন পাঠ্যবইয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন-পরিমার্জন এনেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। বইগুলোতে মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার ঘোষণা, স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের ভোট চুরি থেকে পতন এবং জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের নতুন ইতিহাস সংযোজন করা হয়েছে। রয়েছে কার্টুনের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীরত্বগাথা। চলতি শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন ১ জানুয়ারি সারা দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের হাতে এ বই তুলে দেওয়া হয়েছে।

পরিবর্তন ও পরিমার্জনের বিষয়ে এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধ বিবেচনায় নেওয়ার পাশাপাশি পাঠ্যপুস্তকে বিষয়বস্তুর বিন্যাস, ধারাবাহিকতা ও সঠিকতা বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বইয়ে ব্যক্তিবন্দনার বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়েছে, নতুন বইয়ে এসব বিষয়ে বিশেষ করে স্বাধীনতার ইতিহাসের তথ্য অন্তর্ভুক্তের ক্ষেত্রে ‘অতিশয়োক্তি’ বাদ দিয়ে ‘নির্মোহ’ থাকার চেষ্টা করা হয়েছে।

এনসিটিবি জানায়, বয়স অনুযায়ী বিষয়বস্তুর পরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থাকলেও সপ্তম থেকে দশম শ্রেণিতে বিস্তারিতভাবে গণআন্দোলন, জুলাই বিপ্লব ও শহিদ আবু সাঈদের ছবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংশোধিত বইয়ের লক্ষ্য, তরুণ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানানো এবং জুলাই গণআন্দোলনের গুরুত্ব বোঝানো।

পাঠ্যবইয়ে যত পরিবর্তন

স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাস তুলে ধরে নতুন পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা ‘বাকশাল’ প্রতিষ্ঠা করেন, যার ফলে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা থমকে গিয়েছিল। নতুন পাঠ্যবইয়ে শেখ মুজিবকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপনের পরিবর্তে ইতিহাসের সত্যনিষ্ঠ তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

ষষ্ঠ থেকে নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নাম যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান, ’২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনার পতন ও তার পলায়নের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।

এনসিটিবি সূত্র জানায়, তরুণ প্রজন্মের সামনে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঠিক চিত্র তুলে ধরার উদ্দেশ্যে পাঠ্যবইগুলো পরিমার্জন করা হয়েছে। এছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নির্দেশে স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত ‘অতিশয়োক্তি’ করা তথ্যাদি বাদ দেওয়া হয়েছে।  

ষষ্ঠ শ্রেণির ‘চারুপাঠ’ বইয়ে ‘কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টারের ভাষা’ শিরোনামে একটি বিশেষ পাঠ যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে কার্টুনের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়ার দৃশ্যসহ আন্দোলনের বিভিন্ন প্রতিবাদী চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

নবম ও দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা’ পাঠে শেখ হাসিনা সরকারকে ‘নিপীড়ক শাসক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনা স্থায়ীভাবে টিকে থাকার আকাক্সক্ষায় কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠেন। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে তিনি নির্বাচনি ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেন। ফলে ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালের ‘নাইট ভোট’ বা আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির প্রহসন এবং ২০২৪ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতারণা করা হয়। ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার যে ‘নীলনকশা’ আওয়ামী লীগ করেছিল, জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করেছে বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাঠ্যবইয়ে শেখ হাসিনার শাসনকালকে ‘ফ্যাসিবাদী’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, এই সময়ের অর্থনৈতিক ফলাফল ছিল ধ্বংসাত্মক। গত ১৬ বছরে দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ থেকে বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ‘চোরতন্ত্র’ কায়েম করে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছিল।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে পাঠ্যবইয়ে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে পর্যায়ক্রমে এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট, বিস্তার ও পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে। পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছে, চাকরিতে কোটা প্রথাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা ২০২৪-এর জুন থেকে আন্দোলন গড়ে তোলেন। আন্দোলন দমন করতে ছাত্রলীগ (নিষিদ্ধ ঘোষিত), যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ সরকারি বাহিনীর সঙ্গে মিশে জুলুম-নির্যাতন শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্মম হামলা চালালে আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। পরদিন ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে শহিদ হন। এ ঘটনায় সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও রাজপথে জন-আক্রোশের বিস্ফোরণ ঘটে। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। আন্দোলন দমাতে শেখ হাসিনার সরকার আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এর প্রতিবাদে বিপুলসংখ্যক মানুষ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। আন্দোলনের একপর্যায়ে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। এতে প্রমাণিত হয়, নিপীড়ক শাসক যত শক্তিশালীই হোক, গণপ্রতিরোধে তার পরাজয় অনিবার্য। নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ৩৬ দিনের আন্দোলনে প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত হয়, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ শিশু। বইয়ে স্থান পেয়েছে ছাত্র-জনতার জুলাই আন্দোলনের নানা কাহিনি, ছবি, কার্টুনসহ নানা বিষয়ও।

এবারের পাঠ্যবই সংস্কারের অংশ হিসেবে অষ্টম শ্রেণির ‘সাহিত্য কণিকা’ বই থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বাদ দেওয়া হয়েছে। আগের সংস্করণে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ শিরোনামে ভাষণটি পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

চলতি বছরের অষ্টম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের পর নেতৃত্বশূন্য পরিস্থিতিতে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। নবম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা’ অংশেও একইভাবে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

এনসিটিবি যা বলছে

পাঠ্যবই প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান এনসিটিবি চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি আসার আগেই এই পরিবর্তন-পরিমার্জনের কাজটি হয়েছে, তাই বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে শুধু এনসিটিবি নয়, সামষ্টিকভাবেই সব করা হয়েছে।’

নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই তৈরির সময় এনসিটিবির চেয়ারম্যান ছিলেন প্রফেসর রবিউল কবীর চৌধুরী। পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তনের বিষয়ে এনসিটিবির সাবেক এই চেয়ারম্যান বলেন, ‘এই পরিবর্তন আসলে ব্যক্তি মতামতের বিষয় নয়; সরকার, এনসিসি ও এনসিটিবি সামষ্টিকভাবে এতে কাজ করেছে। তবে প্রধান লক্ষ্য ছিল জুলাই স্পিরিট ধারণ করে এগিয়ে যাওয়া।’

২০২৫ সালে প্রাথমিক স্তরের কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন নয়, বরং কিছু পরিমার্জন করা হয়েছে। শিক্ষাক্রমে এই পরিমার্জনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষার জন্য পাঠ্যপুস্তকের কন্টেন্টও যৌক্তিকভাবে পরিমার্জন করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন এনসিটিবির সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) প্রফেসর ড. মো. ইকবাল হায়দার। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা, জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি এবং মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত রিভিউ কমিটির মতামত গ্রহণের মাধ্যমে এসব পরিমার্জন সম্পন্ন হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনের ক্ষেত্রে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ বিবেচনায় নেওয়ার পাশাপাশি পাঠ্যপুস্তকে বিষয়বস্তুর বিন্যাস, ধারাবাহিকতা এবং সঠিকতা বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।’

এ বিষয়ে এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই পাঠ্যবইয়ে ব্যক্তিবন্দনা, কোটারি বন্দনার একটি প্রথা প্রচলিত ছিল। নতুন পাঠ্যবইয়ে এই অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান, আমাদের সন্তানদের আত্মদান এবং ইতিহাসে যৌক্তিকভাবে যার যা অবস্থান সেটাই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সার্বিকভাবে এসব পরিবর্তন-পরিমার্জন এনসিটিবি, এনসিসিসহ সামষ্টিকভাবে করা হয়েছে।’