আওয়ামী সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনে ভোটার হয়েও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারা এবং কেন্দ্রবিমুখ ভোটারদের কেন্দ্রে নেওয়ার জন্য নির্বাচন উৎসবমুখর করে তুলতে অলিগলিতে দৌড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। নগর থেকে শুরু করে মেঠোপথের অলিগলিÑ সবখানেই প্রার্থীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। ভোটারদের মন জয় করতে গণসংযোগে প্রতিশ্রুতি যেমন দিচ্ছেন, ঠিক তেমনি সেই সব প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার অঙ্গীকারও করছেন ভোটারদের দুয়ারে-দুয়ারে গিয়ে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে চট্টগ্রামের নির্বাচনি মাঠে এবার ১১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে রয়েছেÑ বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, এনসিপি, এলডিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।
তথ্যানুসন্ধান বলছে, ভোটারদের মন জয় করতে চট্টগ্রামের জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীরা তাদের মানবিক কর্মগুলোকে হাতিয়ার বানিয়ে উপস্থাপন করছেন ভোটারদের সামনে, আর বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা হাতিয়ার বানিয়েছেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং দীর্ঘ সময় দল পরিচালনা করার অভিজ্ঞতাকে। নগর বিএনপির একাধিক নেতা এই প্রতিবেদককে বলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধকে লালন করেন, তারা কখনোই মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন না এবং দেবেনও না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে ১৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অধিকাংশ জামায়াত নেতা স্বাস্থ্য খাত ও হাসপাতাল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আল আমিন, পার্কভিউ, ন্যাশনাল, মেট্রোপলিটন হাসপাতালসহ নগরী ও জেলায় প্রায় অর্ধশত হাসপাতালের পরিচালক জামায়াতের প্রার্থীরা। রয়েছেন একক মালিকও। শুধু তাই নয়, নগরী ও জেলায় দুই ডজন ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে জামায়াত নেতাদের। এর মধ্যে মানবিক সেবায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত চট্টগ্রাম-৭ আসনের (রাঙ্গুনিয়া) প্রার্থী পার্কভিউর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ টি এম রেজাউল করিম এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি ও বাকলিয়া) আসনে প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হক।
তথ্যসূত্র বলছে, নগরীর সর্বাধুনিক হাসপাতালগুলো আওয়ামী লীগের সময়সহ কিছু কিছু হাসপাতাল তারও অনেক আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ করেছেন। এলাকার মানুষকে দিয়েছেন চাকরি। আওয়ামী লীগের সময়েও হেলথ ক্যাম্পের ব্যানারে মানবিক কর্মকা- অব্যাহত রেখেছেন জামায়াত নেতারা। হাসপাতাল পরিচালনার ব্যানারে চালিয়েছেন দলের কর্মকা-ও।
জানতে চাইলে বিষয়টি অকপটে স্বীকার করেন চট্টগ্রাম-৭ আসনের (রাঙ্গুনিয়া) প্রার্থী ডা. এ টি এম রেজাউল করিম। তিনি বলেন, প্রতিদানের প্রত্যাশা না করেই আমরা বছরের পর বছর মানুষকে সেবা দিয়ে আসছি। জনগণ যদি আমাদের নির্বাচিত করেন, মানবসেবার পরিধি বাড়ানোর সুযোগ আরও বাড়বে। ইনশাআল্লাহ।
চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি ও বাকলিয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান বলেন, আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী লড়াকু সৈনিক। স্বাধীনতার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করে আমরা স্বাধীন হয়েছি, স্বাধীনতা পেয়েছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী সেই শক্তিকে প্রতিহত করতে হবে আমাদের। আর সেটা করতে হবে ভোটের মাধ্যমে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে এবার মোট ভোটার ৬৬ লাখ ৮২ হাজার। এর মধ্যে নতুন ভোটার রয়েছেন প্রায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার। চট্টগ্রামে পুরুষ ভোটার প্রায় ৩৫ লাখ এবং নারী ভোটার ৩২ লাখ। নারী ভোটারের হার ৪৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। জেলার ১৬টি আসনের মধ্যে ১১টিতে ভোটার বেড়েছে ২০ হাজার করে। তবে ৭ হাজার ভোটার কমেছে চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের পর্যবেক্ষণের হিসাব বলছে, সাড়ে ৩ লাখ নতুন ভোটারের সঙ্গে গত তিনটি নির্বাচনে ভোটার হয়েও ভোট দিতে না পারা নতুন ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটার এবার ভোট দিতে যাবেন, যে কারণে এবারের নির্বাচনি সমীকরণ পূর্বের যে কোনো নির্বাচনের চেয়ে ভিন্ন।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন ভোটাররা নির্বাচনের ট্রামকার্ড হিসেবে বিবেচিত হবেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নিয়াজ উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, তরুণ ভোটাররা এবারও নির্বাচনের ট্রামকার্ড হিসেবে বিবেচিত হবেন। গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতি মাথায় রেখে এবার ভোটাররা ভোট দিতে পারেন।
ভোটাররা যাতে নির্বিঘেœ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন নির্বাচন কমিশন ও জেলা প্রশাসন। প্রস্তুতি নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ হবে ১ হাজার ৯৬৫টি কেন্দ্রে। কক্ষ থাকবে ১২ হাজার ১টি। ভোটগ্রহণ পরিচালনার জন্য দায়িত্ব পালন করবেন ৪০ হাজার প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার।

