সকাল ৯টা ১০ মিনিট। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা-৬ আসনের সূত্রাপুর থানার নারিন্দায় সেইন্ট যোসেফ কারিগরি স্কুল কেন্দ্রের সামনে ভোটারদের ভিড়। ভিড় এড়িয়ে ভেতরে ঢুকে দেখা গেলÑ এই কেন্দ্রের পুরুষ ও নারী ভোটারদের উভয় লাইনই লম্বা। পুরুষ ভোটারদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করার সুযোগ না থাকলেও নারী ভোটারদের লম্বা লাইনে শাঁখা-সিঁদুর পরিহিত সংখ্যালঘু ভোটারদের প্রাধ্যান্য দেখা গেছে। জানা গেছে, এই ভোটকেন্দ্রের পাশের স্বামীবাগের ঋষিপাড়া এলাকার অধিকাংশই এই কেন্দ্রের ভোটার। ঋষিপাড়ার প্রায় প্রতিটি পরিবারের স্বামীরা তাদের স্ত্রীকে নিয়ে তাই সকাল সকাল কেন্দ্রে চলে এসেছেন ভিড় বাড়ার আগেই নিজের ভোট দিতে।
শুধু ভোট দেওয়াই নয়, সেন্ট যোসেফ কারিগরি স্কুলের গেটের বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে বসানো বুথেও কেন্দ্রে আসা ভোটারদের নানা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে দেখা গেছে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজনকে। আগে থেকেই পুরান ঢাকার-৬ ও ৭ আসনের বিভিন্ন এলাকায় রাজধানীর সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বসবাস।
বিশেষ করে পুরান ঢাকার সূত্রাপুর ও কোতোয়ালি থানার আংশিক হিসেবে পরিচিত ঢাকা-৬ ও ঢাকা-৭ আসনের ৪টি পাড়া (শাঁখারিবাজার, তাঁতীবাজার, গোয়ালনগর ও রাধিকা মোজন বসাক লেন) হিন্দু অধ্যুষিত। নারিন্দার সেইন্ট যোসেফ স্কুল কেন্দ্রের মতোই এসব এলাকার অধিকাংশ কেন্দ্রে সংখ্যালঘু হিন্দু ভোটারদের ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ভোট দিতে দেখা গেছে।
নাম ও পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে নারিন্দার সেইন্ট যোসেফ স্কুল কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা একটি পরিবারের এক নারী ভোটার বলেন, ‘সবাই বলল, ভোট না দেওয়াটা ঠিক নয়, তাই ভোট দিতে এসেছি’। ভোটের পরিবেশ দেখেও মনে যে শঙ্কা ছিল তা কেটে গেছে বলে জানান তিনি।
এই আসনের নারিন্দা সরকারি স্কুল কেন্দ্রের ভোটার প্রায় ৭০ বছর বয়সি শ্রীদাম দাস। তিনি বলেন, ‘ভিড় হতে পারে ভেবে সকালেই ভোট দিয়ে এসেছি’। গণভোটের বিষয়টি প্রথমে বুঝতে না পারলেও কেন্দ্রে দায়িত্বরত পোলিং এজেন্টরা বুঝিয়ে দেন বলে তিনি জানান। শ্রীদাম দাসের ছেলে টিটুও ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন।
পুরান ঢাকার হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত শাঁখারিবাজারের গলির সামনে ঢাকা-৬ আসনের ১১ নম্বর পোগোজ স্কুল কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার রাজীবুল আহসান বলেন, ‘নির্বাচনের পরিবেশ দেখে ভোটারদের শঙ্কা দূর হয়েছে, তাই সকালের দিকে ভোট প্রদানের হার কিছুটা কম থাকলেও দুপুরের পর তা বেড়েছে।’
সারা দেশের মতো সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব আমেজে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা-৬ ও ঢাকা-৭ আসনের নির্বাচন। আওয়ামী লীগ ও নৌকার অনুপস্থিতিতে রাজধানীসহ সারা দেশের হিন্দুসহ সংখ্যালঘু ভোটাররা অংশ নেবে কি না তা নিয়ে একধরনের সংশয় ছিল। তবে গতকাল ভোটের মাঠে রাজধানীর সংখ্যালঘু ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ প্রথাগত ধারণার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
গতকাল সকাল সাড়ে ৭টায় ভোট শুরুর পর সরেজমিনে ঢাকা-৬ ও ঢাকা-৭ আসনের বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, সবখানেই উৎসবের আমেজ নিয়ে ভোটের কেন্দ্রে এসেছেন সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যরা।
সেইন্ট যোসেফ স্কুলের মতোই নারিন্দা সরকারি সরকারি স্কুল কেন্দ্রেও হরিজন সম্প্রদায়ের ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। স্বামীবাগে হরিজন সম্প্রদায়ের তিনটি কোয়ার্টারের অধিকাংশ পরিবারের সদস্যই গতকাল ভোট দিতে কেন্দ্রে এসেছিলেন। ফলে নারিন্দা স্কুল ক্যাম্পাস যথেষ্ট বড় হলেও নারী-পুরুষ উভয় লাইনই লম্বা দেখা গেছে। এই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার আবুল বাশার বলেন, ‘এই কেন্দ্রের ভোটাররা ততটা শিক্ষিত নন, তবে তাদের মধ্যে ভোট দেওয়ার ব্যাপক উৎসাহ রয়েছে। এই কেন্দ্রে দায়িত্বরত সবাই তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’
ঢাকা-৭ আসনের অনন্তময়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যুবক ভোটার শুভ দাস। তিনি থাকেন রাধিকা মোহন বসাক লেনে। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্নে উজ্জীবিত হয়েই ভোট দিয়েছেন তিনি।’ আশা করছেন, তার পছন্দের দল নির্বাচনে জয়ী হবে।
এই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার এস এম এহতেশামুল আনাম বলেন, ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে ভোট গ্রহণে আমাদের প্রতিশ্রুতি ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীও ভীষণ সক্রিয় ছিল। এই বিষয়গুলো ভোটারদের ভোট প্রদানে অনুপ্রাণিত করেছে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অন্তর্গত সূত্রাপুর থানার ৯টি ও কোতোয়ালি থানার (আংশিক) ২টিসহ মোট ১১টি ওয়ার্ড নিয়ে ঢাকা-৬ আসন। এই আসনে ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১০০টি। এই আসনের মোট ২ লাখ ৮৯ হাজার ৪৩৮ ভোটারের এ আসনে পুরুষ ভোটার দেড় লাখের ওপরে আর নারী ভোটার রয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার। হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৩ জন। গণফ্রন্ট, বাংলাদেশ কংগ্রেস, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ও ও জাতীয় পার্টি থেকে এ আসনে প্রার্থী থাকলেও ভোটে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল ঢাকার সাবেক মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার ছেলে বিএনপির ইশরাক হোসেনের সঙ্গে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুল মান্নানের।
অন্যদিকে ডিএসসিসির লালবাগ থানার ১১টি ও কোতোয়ালি থানার (আংশিক) ৪টিসহ মোট ১৫টি ওয়ার্ড নিয়ে ঢাকা-৭ আসন। এই আসনে মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৬৪। মোট ৪ লাখ ৭৬ হাজার ভোটারের মধ্যে এ আসনে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৬ হাজার ও নারী ভোটার রয়েছেন ২ লাখ ৩০ হাজার।
এই আসনে বিএনপি থেকে প্রার্থী হয়েছেন মো. হামিদুর রহমান হামিদ। এ আসনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রার্থী রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য হাফেজ এনায়েত উল্লাহ ও বিএনপি থেকে বহিষ্কৃৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ ইসহাক সরকার। এ ছাড়া নির্বাচনে এ আসনে আরও ৪টি দলের প্রার্থী থাকলেও জামানত হারানোর শঙ্কা রয়েছে কয়েকজনের।
সেইন্ট যোসেফ ও নারিন্দা সরকারি স্কুলের মতোই একই আসনের বাগানবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কসমোপলিটান স্কুল, কে এল জুবিলি স্কুল, রাজারদেউড়ি সরকারি প্রাথমিক ও বিদ্যালয় ও লালবাগের রহমতুল্লাহ স্কুল কেন্দ্রসহ সব কেন্দ্রেই ভোট উৎসবে স্বতঃস্ফূর্ত ছিল সংখ্যালঘু হিন্দু ভোটাররা। অধিকাংশ ভোটারের বক্তব্যÑ হিন্দু ভোট শুধু আওয়ামী লীগ নয়, সবাই পেতে পারে যদি যোগ্য বিবেচিত হয়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন