ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

‘ফল যা-ই হোক, ভোটের অধিকারটা যেন থাকে’

শহিদুল ইসলাম রাজী
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬, ০৫:০৭ এএম

‘ভালো লাগছে এটা ভেবেই যে, নিজের ভোটটা নিজে দিতে পেরেছি। এর আগেরবার কেন্দ্রে এসে শুনেছিলাম, আমার ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। তাই নিরুপায় হয়ে ভোট না দিয়েই চলে যেতে হয়েছে। এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন ফরিদাবাদের হরিচরন রোডের বাসিন্দা সত্তোরোর্ধ বৃদ্ধ সৈয়দ মোহাম্মদ সুলতান। তিনি বলেন, ‘অনেকদিন পর সুন্দর পরিবেশে নির্বাচনি উৎসব ফিরে এসেছে। তাই ফল যা-ই হোক, ভোটের অধিকারটা যেন থাকে’। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে গেন্ডারিয়ার ফরিদাবাদের জামিয়া আরাবিয়া এমদাদুল উলুম মাদ্রাসার ৯৫নং কেন্দ্রে ভোট দিয়ে স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি। এ সময় ভোট দেওয়ার অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি এসব কথা বলেন। 

ঢাকা-৪ আসনের শ্যামপুরের পোস্তগোলায় ভাষা প্রদীপ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে রিকশায় এলেন আলী বহরের বাসিন্দা শওকত। হাঁটার মতো অবস্থা নেই। রিকশা থেকে নেমে দুই যুবকের কাঁধে ভর করে ঢুকলেন কেন্দ্রে। তাকে সহায়তা করলেন দায়িত্বরত আনসার সদস্যরাও। আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, ‘১৭ বছর ভোট দিবার পারি নাইক্কা। স্কুলের গেটে আইলে কয়, দেওয়া অইয়া গেছে, যান গা। আজ (গতকাল) আইসি ভোট দিবারÑ খুব খুশি লাগতাছে।’ তার চোখেমুখে ছিল তৃপ্তির ছাপ। এই কেন্দ্রে ভোট দিতে আসছেন নতুন, তরুণ ও বিগত সরকারের আমলে যারা ভোট দিতে পারেননি। বিগত কয়েকটি নির্বাচনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি বলে জানান এসব তরুণ ভোটার। তারা বলছেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর এবার নতুন পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উৎসবমুখর পরিবেশে তারা ভোট দিতে পেরেছেন। এ কেন্দ্রে তরুণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এমনটি জানা যায়।

রাজধানীর শনিরআখাড়া, মাতুয়াইল, জুরাইন, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী ও সায়দাবাদ এলাকার ভোটাররা দুভাগে পড়েছেন ঢাকা ৪ ও ৫ নম্বর আসনে।

ঢাকা-৪ আসনের একটি কেন্দ্রে ভোট দেওয়া শেষে একজন ভোটার বলেন, ‘২০২৪ সালেও ভোট দিছি, শুধু ভোট দিতেই ঢাকায় আসলাম। আওয়ামী লীগ ছাড়া ভালো লাগছে না, তারপরও ভোট দিতে হবে, ভোট দিলাম’। তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যে ভুল করছে, তা আর কেউ না করুক। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, জনগণের জন্য কাজ করুক। জনগণ পছন্দ করলে আবার তারে ক্ষমতায় আনবে’। একই কেন্দ্রে জীবনের প্রথমবার ভোট দিয়েছেন মারিয়া আক্তার বর্ষা নামে আরেক ভোটার। তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘দুর্নীতিমুক্ত একটা সরকার হউক, প্রথম ভোটে এটাই আমার চাওয়া। কেউ যেন বঞ্চিত না হয়। গরিব মানুষ যেন দুবেলা খেতে পারে, এমন সরকার চাই। যে দলই আসুক, তারা যেন রাষ্ট্রটাকে ঠিক করে’।

প্রথম ভোট দেওয়ার অনুভূতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘দেশে একটা গুমোট গুমোট ভাব ছিল। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে এসে মনে হচ্ছে উৎসব উৎসব ভাব’।

চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের হটস্পট হিসেবে পরিচিত ছিল রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, দনিয়া, রায়েরবাগ এলাকা। এসব ভোটকেন্দ্রে দিনভর উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি ভোটারদের অভিযোগও ছিল অনেক। সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণের ও ভোটার উপস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও দুপুর থেকে উপস্থিতি কমার পাশাপাশি ধীরগতির অভিযোগও পাওয়া যায়। দীর্ঘ লাইনে থেকে ভোট না দিয়েও যেতে দেখা গেছে বেশকিছু ভোটারকে। নির্বিঘেœ ভোট দিতে পেরে অনেকে যেমন স্বস্তি প্রকাশ করেছেন, পাশাপাশি বুথ খুঁজে না পেয়ে ভোট না দিয়ে চলে গেছেন কেউ কেউ।

যাত্রাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সকাল ৯টায় গিয়ে বুথের সামনে লাইন দেখা গেছে। এই কেন্দ্রে ভোট দিয়ে বেরিয়ে ৭২ বয়স বয়সি আকলিমা বেগম নির্বিঘেœ ভোট দিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘কোনো ঝামেলা ছাড়াই ভোট দিয়েছি’। এখানকার মহিলা ভোটকেন্দ্রে ২৫৮৩টি ভোটের মধ্যে সকাল সোয়া ৯টা পর্যন্ত ১৬০ ভোট কাস্ট হয়েছে বলে জানান প্রিসাইডিং অফিসার। এরপর এই স্কুলে থাকা পুরুষ কেন্দ্রে ভোট দেন বিএনপি প্রার্থী নবী উল্লাহ নবী। তিনি ভোট দিয়ে জয়ের বিষয়ে আশা প্রকাশ করেন।

দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে দনিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজে থাকা পুরুষ ভোটকেন্দ্রে গেলে প্রিসাইডিং অফিসার জানান, দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৬৪৪ ভোটের মধ্যে ৯৫০টি গ্রহণ করা হয়েছে। এই কেন্দ্রের ৫০২ নম্বর রুমের সামনে দেখা যায় তরুণ ভোটারদের লম্বা লাইন। সদ্য এমএসসি পাস করা ইয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে লাইনে আছি। এর পরও কষ্ট নেই। এখানে যারা লাইনে আছেন সবাই একসঙ্গে অভ্যুত্থানের যোদ্ধা ছিলাম। নতুন দেশ গড়তে ভোট দিতে পারব, তাই ভালো লাগছে’।

বিকেল পৌনে ৩টার দিকে রায়েরবাগ এলাকার মোহাম্মদবাগ এবিএম গ্রাজুয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি কেন্দ্রে ২৬৮২ ভোটের মধ্যে বেলা সোয়া ১টা পর্যন্ত ১১১৮টি ভোটগ্রহণের কথা জানান প্রিসাইডিং অফিসার। তবে ওই সময় এই কেন্দ্রের প্রায় সব বুথই ছিল খালি। এই স্কুলের আরেকটি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার জানান, ২৬৫১ ভোটের মধ্যে ১১৩০ ভোট কাস্ট হয়েছে। এই কেন্দ্রের কয়েকটি বুথের সামনে লাইন থাকলেও ধীরগতিতে ভোটগ্রহণের অভিযোগ করেছেন ভোটাররা।