শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। শেষ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের কার্যকাল। এই মুহূর্তে অন্যতম আলোচনার বিষয়, সদ্য সাবেক হওয়া উপদেষ্টাদের পরবর্তী কার্যক্রম কী হবে, আগামীতে কোন উপদেষ্টারা কী করবেন, কোথায় যাবেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক পাড়ায় চলছে নানা গুঞ্জন।
এমন সময়ে এক তথ্যে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হতে আগ্রহী সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন।
দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের প্রধান তথা স্থায়ী প্রতিনিধি হতে উঠেপড়ে লেগেছেন সাবেক এই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। এর পেছনে অন্যতম কারণ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত তার মেয়ের সঙ্গে থাকার সুযোগ এবং আসন্ন ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি পদের নির্বাচনি প্রচার রাষ্ট্রীয় সুবিধায় করা। এর পাশাপাশি জাতিসংঘে বাংলাদেশের বর্তমান স্থায়ী প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরীকে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রসচিব করতেও তৎপরতা চালাচ্ছেন তৌহিদ হোসেন।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতন হলে অন্তর্বর্তী সরকারে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব পান তৌহিদ হোসেন। এর আগে ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারে পররাষ্ট্রসচিবের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সিভিল সার্ভিসের পররাষ্ট্র ক্যাডারে তৌহিদ হোসেন এমন এক কর্মকর্তা ছিলেন, যিনি কখনো রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন না করেই পররাষ্ট্রসচিব হয়েছিলেন। ২০১৪ সালে অবসরের আগে আওয়ামী শাসনামলে ২০১২ সালের জুনে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার নিযুক্ত হন তিনি। বর্তমানে তার জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হওয়ার বাসনার খবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে ‘টক অব দ্য টাউন’-এ পরিণত হয়েছে।
সূত্র বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিতব্য ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের আগে সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচন হবে আগামী মে মাসে। এই পদে প্যালেস্টাইন ও সাইপ্রাসের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। প্যালেস্টাইনকে সমর্থন দিয়ে এই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেও তৌহিদ হোসেনের মেয়াদকালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেনি বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে পদাধিকারবলে এতদিন বাংলাদেশের পক্ষে প্রার্থী ছিলেন তৌহিদ। গত মঙ্গলবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে এই নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব এখন ড. খলিলু রহমানের কাঁধে। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি তৌহিদ হোসেনের এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের আর সুযোগ নেই।
তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইছেন তৌহিদ হোসেন। স্থায়ী প্রতিনিধি হতে পারলে রাষ্ট্রীয় অর্থ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধায় নির্বাচনি প্রচারও বেশ ভালোভাবে করতে পারবেন সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। নিউইয়র্কে থাকলে নির্বাচনে ভোটার দেশগুলোর জাতিসংঘে নিযুক্ত প্রতিনিধি বা রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে খুব সহজেই যোগাযোগ করতে পারবেন তিনি। এ ছাড়া তৌহিদ হোসেনের এক মেয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের শিয়াটলে বাস করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিবারের সান্নিধ্যও নিশ্চিত হবে সাবেক এই উপদেষ্টার।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হতে তৌহিদ হোসেনের এই আগ্রহে বেজায় চটেছেন পররাষ্ট্র ক্যাডারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অনেক কর্মকর্তাই যেখানে অবসরে যাওয়ার আগে ভালো পোস্টিং পাচ্ছেন না, সেখানে দীর্ঘদিন অবসরে থাকা তৌহিদ হোসেনের এমন অভিপ্রায়ে মন্ত্রণালয়ে এখন থমথমে পরিস্থিতি। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চাপা উত্তেজনা।
সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে ক্যারিয়ারে কখনো ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সার্ক ও অন্যান্য আঞ্চলিক সংস্থা এবং বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থায় দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নেই তৌহিদ হোসেনের। এ ছাড়া ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ সময় প্রটোকল, প্রশাসনের মতো ‘ডেস্ক অ্যান্ড ক্ল্যারিকাল’ পোস্টে বেশি কাজ করেছেন তিনি।
মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য ও ঊর্ধ্বতন সূত্র জানায়, তৌহিদের স্থায়ী প্রতিনিধি হওয়ার বিষয়টি শুধু আগ্রহ বা অভিপ্রায়ে সীমাবদ্ধ নেই। নতুন এই পদ বাগাতে এরই মধ্যে উঠেপড়ে লেগেছেন তিনি। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের কয়েক দিন আগে থেকেই বিএনপির ঊর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন তৌহিদ হোসেন।
বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছেন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হওয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করে দলটির শীর্ষ ও উচ্চপর্যায়ে একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন তৌহিদ হোসেন। এসব যোগাযোগে বিএনপি এবং দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে নিজের বিভিন্ন ‘অবদান’ তুলে ধরেন তিনি। যদিও তৌহিদের কাজে বিএনপির হাইকমান্ড ‘সন্তুষ্ট’ নয় বলে দাবি করে দলটির ওই সূত্র।
এদিকে নিজে স্থায়ী প্রতিনিধি হওয়ার পাশাপাশি জাতিসংঘে বাংলাদেশের বর্তমান স্থায়ী প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরীকে পরবর্তী পররাষ্ট্রসচিব করার চেষ্টাও করছেন তৌহিদ হোসেন। পররাষ্ট্র ক্যাডারের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করে সালাহউদ্দিনকে সচিব করার গুঞ্জনে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে কর্মকর্তাদের মধ্যে। অভিযোগ উঠেছে, সালাহউদ্দিনকে পররাষ্ট্রসচিব করতে অন্তত চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে পদোন্নতিবঞ্চিত রেখেছেন তৌহিদ হোসেন। জানা গেছে, পররাষ্ট্র বিসিএস-১৫ ব্যাচের সাতজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করে সালাহউদ্দিন নোমানকে আরও আগেই পররাষ্ট্রসচিব করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন সাবেক এই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে পররাষ্ট্রসচিব নিয়োগ দিতে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কর্মকর্তা সালাহউদ্দিনের নাম প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠান তৌহিদ। এ বিষয়ে তখনো বেশ বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সালাহউদ্দিনকে পররাষ্ট্রসচিব করতে না পারলেও নেপাল থেকে সোজা রাষ্ট্রদূত ও যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি বানিয়ে পুরস্কৃত করেন তৌহিদ হোসেন।
এ ছাড়া উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালে তার আওতাধীন মন্ত্রণালয়ের পরিচালক আরাফাত রহমানকে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ স্থায়ী মিশনে ‘কাউন্সিলর’ হিসেবে পদায়ন করেন তৌহিদ হোসেন। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের একদম শেষ দিকে গত ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে নিউইয়র্কে আরাফাতের বদলির আদেশ হয়। ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের আকর্ষণীয় স্থানে পদায়ন এবং নিজ দপ্তরের কর্মকর্তাকে নিউইয়র্কে বদলির মাধ্যমে তৌহিদের নিউইয়র্কে যাওয়ার অভিপ্রায়কে ‘দুইয়ে দুই’ হিসেবে দেখছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে কয়েক দিন তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায়নি। তার দাপ্তরিক ই-মেইলে মন্তব্য চেয়ে যোগাযোগের দুই দিন পেরিয়ে গেলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনটা হলে সার্ভিসে থাকা কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে পড়বে এবং দায়িত্ব পালনে তাদের আগ্রহ কমবে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে সাবেক এক পররাষ্ট্রসচিব রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নির্বাচনে মূল প্রার্থী রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা এই পদের সমমানে যিনি আছেন তিনি। এখানে ব্যক্তি মুখ্য নয়, বরং রাষ্ট্র এবং পদ মুখ্য। সরকার যদি চায়, তাহলে মন্ত্রীর বদলে স্থায়ী প্রতিনিধিকে এই নির্বাচনে প্রার্থী করতে পারে। তিনি (তৌহিদ হোসেন) মনে হয় নিজের জন্য সেটাই চাইছেন। প্রার্থী থাকুক বা না থাকুক, তিনি যদি স্থায়ী প্রতিনিধি হন, তাহলে সেটি কর্মকর্তাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সঞ্চার করতে পারে। এখনো যারা সার্ভিসে আছেন, সিনিয়রিটি আছে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অবসরে যাবেন; তারা এ ধরনের পোস্টে যাওয়ার জন্য পুরো ক্যারিয়ার অপেক্ষা করেন। তাদের বঞ্চিত করে অবসর থেকে নিয়ে আসা কাউকে এমন পদ দেওয়া হলে বিদ্যমান কর্মকর্তাদের মধ্যে ভুল বার্তা যায়। এতে তারা ‘মোরালি ডাউন’ হয়ে পড়েন।’

