বাঙালির ইতিহাসে গৌরব, ত্যাগ ও বেদনার এক অনন্য অধ্যায় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘদিন থেকে একুশে বইমেলায় নানা ধারার বইয়ের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে আসছে। তবে এবারের বইমেলায় ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। পাঠকদের আগ্রহ থাকলেও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নতুন প্রকাশনা খুবই সীমিত। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরেও গত বছরের তুলনায় এ বছর নতুন বইয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ফলে ইতিহাসের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে এবারের বইমেলায় প্রকাশিত বই হাতেগোনা। অনেক প্রকাশকই বলছেন, ভালো মানের পা-ুলিপি না থাকার কারণে এবার এই দুই বিষয়ে তারা বই প্রকাশ করতে পারেননি।
বইমেলা পরিচালনা কমিটির জনসংযোগ বিভাগ সূত্র জানায়, গত সোমবার পর্যন্ত নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে ৯৮৯টি। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই এসেছে মাত্র ১টি এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ১টি আর জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে কোনো বই প্রকাশ হয়নি। তবে মেলার মাঠে ঘুরে বিভিন্ন স্টলে মাত্র ১০-১২টি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নতুন বই প্রকাশের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কথাপ্রকাশ এনেছে লেখক ও গবেষক সালেক খোকনের গবেষণাগ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধে অবিনাশী ঘটনামালা’। এই বইয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্য থেকে যুদ্ধকালীন ছোটো ছোটো নানা ঘটনা সরল গদ্যে তুলে ধরা হয়েছে। অনন্যা থেকে প্রকাশিত হয়েছেÑ মহিউদ্দিন আহমদের উপন্যাস ‘শেখ মুজিবের লাল ঘোড়া’, মুনতাসীর মামুনের ‘১৯৭১ : অবরুদ্ধ দেশে স্পার্টাকাস’, মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশ করেছেÑ ওয়ালিউল ইসলামের ‘একাত্তরের ইতিকথা’, আনু মুহাম্মদের ‘মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয় নাই’ এবং বাতিঘর প্রকাশ করেছে- তানিয়া ঊর্মির ‘সেতারে স্বাধীনতার সুর : বীর গেরিলাযোদ্ধা শহীদ হাফিজ’।
প্রকাশনা সংস্থা সুবর্ণ এনেছে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী লুৎফর রহমান স্মারকগ্রন্থ’; এটি যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন জয়দুল হোসেন ও মামুন সিদ্দিকী। নাওজিশ মাহমুদের ‘স্মৃতি ও রাজনীতি : চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ প্রকাশ করেছে জাগতিক প্রকাশনী। এ ছাড়া মেলায় আগামী প্রকাশনী, প্রথমা, বাতিঘর, অনন্যা, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি., অন্বেষা, ঐতিহ্য, তাম্রলিপি, অবসরসহ বেশ কিছু প্রকাশনীর স্টলে ঘুরে দেখা যায় বিগত বছরে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই বিক্রি হচ্ছে। সংখ্যায় কম হলেও এসব নতুন প্রকাশিত বই ঘিরে পাঠক ও দর্শনার্থীদের মধ্যে আগ্রহ লক্ষ করা গেছে।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই প্রকাশ কম হওয়ার কারণ হিসেবে গবেষকেরা বলছেন, বিগত সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ‘মব’সহ বিভিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধকে অসম্মান বা অপমান করার মতো ঘটনায় গবেষকেরা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বই প্রকাশে দ্বিধা বা সংশয়ে ছিলেন। তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা রকম গবেষণার কাজ হয়েছে, যা পরে বই আকারে আসতে পারে।
প্রকাশনা সংস্থা বাতিঘরের প্রধান নির্বাহী জাফর আহমদ রাশেদ বলেন, ‘বাতিঘর বছরজুড়েই নিয়মিত বই প্রকাশ করে। তবে এবারের বইমেলা ঘিরে শুরু থেকেই এক ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল। মেলা কবে অনুষ্ঠিত হবে, আদৌ হবে কি নাÑ এ প্রশ্নের কারণে অনেক প্রকাশকই যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারেননি।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত দেড় বছর ধরে বই প্রকাশ নিয়েও প্রকাশকদের মধ্যে এক ধরনের সংশয় ও দ্বিধা কাজ করেছে। কোন ধরনের বই প্রকাশ করা যাবে, কোন বই মেলায় প্রদর্শন করা যাবেÑ এসব বিষয় নিয়েও অনেকে দ্বিধায় ছিলেন।’ তার মতে, এসব কারণেই এবারের মেলায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইয়ের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যেতে পারে।
এদিকে পুরো বইমেলার বিভিন্ন প্রকাশনার স্টলে স্টলে ঘুরে হাতেগোনা কিছু জুলাই অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বই প্রকাশের খবর পাওয়া গেছে। তবে সেই সংখ্যাটা গত বছরের তুলনায় খুবই কম। গতবার যেখানে ১২৫টিরও বেশি জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিচারণা ও জুলাইকে উপজীব্য করে লেখা বই প্রকাশিত হয়েছিল এবার সেখানে হাতেগোনা কিছু পাওয়া গেছে। জুলাই নিয়ে এবার কেন এত কম বই প্রকাশ হচ্ছেÑ জানতে চাইলে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার লোকজন জানাচ্ছেনÑ গতবার জুলাই আন্দোলন নিয়ে যা বই প্রকাশ হওয়ার তা হয়ে গেছে। এখন দিন যত যাবে ততই কমতে থাকবে জুলাইকেন্দ্রিক বই।
জুলাই গণআন্দোলন নিয়ে কি বই প্রকাশ করেছেন জানতে চাইলে প্রকাশনা সংস্থা ‘অনন্যা’র স্বত্বাধিকারী মনিরুল হক বলেন, “এবার এখন পর্যন্ত একটা বই এসেছে। আর একটা আসবে। এবার জুলাইয়ের বই ভালো বিক্রি হচ্ছে না। গতবার তিনটি বই প্রকাশ করেছিলাম। তিনটি বই ভালো বিক্রি হয়েছে। বিশেষ করে ‘দ্রোহের গ্রাফিতি’ নামক বইটা খুব ভালো বিক্রি হয়েছে।”
জুলাই নিয়ে বই কেন কম বিক্রি হচ্ছেÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এমনিতে এবার বই কম বিক্রি হচ্ছে। সেই তুলনায় জুলাইয়ের বই আরো কম বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া তেমন কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। মানুষ বই-ই কম পড়ছে এখন।’
বইমেলার জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিচারণা ও জুলাইকে উপজীব্য করে লেখা উল্লেখযোগ্য নতুন বইগুলোর মধ্যে ‘প্রতিভা প্রকাশ’ নিয়ে এসেছে জানে আলমের লেখা ‘স্বাধীনতার ফুল ফুটেছে বিপ্লবীদের হাতে’ ও তহ্মিনা নিশার ‘জুলাই ছত্রিশ’ নামক বই। অনন্যা থেকে প্রকাশিত হয়েছে- সায়ন্ত সাখাওয়াতের ‘লাল জুলাইয়ের চোখে জল’ ও মাহবুব আজীজের লেখা ‘উচ্চারণের বিপরীতে...’ বইটি গতকাল মেলায় আসার কথা। প্রকাশনা সংস্থা রিদম থেকে এসেছে ইমরান আকন্দের বই ‘একজন আবু সাঈদ একটি গণঅভ্যুত্থান’। পা-ুলিপি প্রকাশন থেকে এসেছে শ্যামল আবদুল হালিমের লেখা ‘লাল জুলাই কাব্য’। ফারহানা খানমের লেখা ‘সেদিন ছিল ছত্রিশ জুলাই’ প্রকাশ করেছে চমনপ্রকাশ। কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে- সাংবাদিক নূরুল কবীরের লেখা ‘দ্বিরালাপ’। মুহাম্মদ শফিউল্লাহ’র লেখা ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান : মরদেহ গণনার কয়েকটি দিন’ এনেছে প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্য। আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে- মুস্তাক মজিদের লেখা ‘ফ্যাসিবাদ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ ও ফয়েজ তৌহিদুল ইসলামের লেখা ‘তার নাম রাখিও স্বাধীনতা’ এবং ‘জাগতিক’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে- সোহেল মাহমুদ সাগরের ‘ভ্রষ্ট ভীরু’।

