ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

ভয়ংকর অর্থ পাচারকারী ছেলের দুর্নীতিবাজ বাবা!

রেজোয়ান কবির
প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

সৈয়দ শফিকুর রহমান। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানির এজিএম (সেলস) ছিলেন তিনি। দুর্নীতির দায়ে গত এপ্রিলে তাকে বরখাস্ত করা হয়। তবে সৈয়দ শফিকের আরেকটি পরিচয় হলো- ভয়ংকর অর্থ পাচারকারী সৈয়দ আব্দুল্লাহ জায়েদের বাবা তিনি।

জায়েদ বাংলাদেশের ক্রিপ্টোকারেন্সি ক্রয়-বিক্রয়সহ মানি লন্ডারিং ও অনলাইন প্রতারণার অন্যতম হোতা। অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার জন্য নানা ধরনের ছলচাতুরি, কূটকৌশল ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তিনি এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। জায়েদ দেশের ভার্চুয়াল মুদ্রা কেনাবেচার মাস্টারমাইন্ড। কয়েক বছর ধরে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে অর্থ বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে অনেককে প্রতারিত করছেন। নিজেকে একটি গ্লোবাল ফিনটেক প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দাবি করা এই অর্থ পাচারকারীর প্রতিষ্ঠান পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ব্ল্যাকলিস্টেড।

একদিকে দেশে বাবার তেল জালিয়াতি, অন্যদিকে বিদেশে ছেলের হাজার কোটি টাকার মানি লন্ডারিং সাম্রাজ্য! এ যেন বাবা-ছেলের জালিয়াতির মহোৎসব।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সৈয়দ শফিক রাষ্ট্রীয় তেল চুরি ও অবৈধ বরাদ্দের মাধ্যমে দেশে দুর্নীতির পাহাড় গড়েছেন। সম্প্রতি খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো ও স্থানীয় প্রশাসনের এক বিশেষ তদন্তে তার দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। বরখাস্ত হওয়া সৈয়দ শফিক হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা ও ফোনকলের মাধ্যমে বিভিন্ন সিএনজি ও ফিলিং স্টেশনে বরাদ্দপত্রের বাইরে অতিরিক্ত তেল অবৈধভাবে সরবরাহ করতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

রাষ্ট্রীয় তেল চুরির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর নানা ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি তার। অবশেষে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নির্দেশে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বাবার এই অবৈধ আয়ের ওপর ভিত্তি করেই ডালপালা মেলেছে ছেলের মানি লন্ডারিং নেটওয়ার্ক। দুর্নীতির টাকায় রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন বরখাস্তকৃত এই সরকারি কর্মকর্তা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১০ কোটি টাকা দিয়ে ডি ব্লকে ফ্ল্যাটটি কিনেছেন তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে তার শতকোটি টাকা জমা রয়েছে। চড়েন ৫ কোটি টাকার মারসিডিজ বেঞ্জ গাড়িতে। সাভার ও পূর্বাচল ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে জমি রয়েছে নামে-বেনামে।

দেশত্যাগের পাঁয়তারা

ছেলে জায়েদের হাজার কোটি টাকা পাচারের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পর এই দুর্নীতিবাজ পরিবার এখন দেশ থেকে পালানোর পাঁয়তারা করছে। এ-সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র রূপালী বাংলাদেশের হাতে এসেছে।

ডিজিটাল মাফিয়া আব্দুল্লাহ জায়েদ, তার স্ত্রী আরফা আনান, ছোট ভাই আব্দুল্লাহ গালিব ও তার স্ত্রী মেহেরুন নেসা বর্তমানে মালয়েশিয়ায় রয়েছেন। আর ঢাকায় রয়েছেন বাবা সৈয়দ শফিকুর রহমান ও তাদের মা শেখ আসমা আফরোজ। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও জুরিসডিকশন থেকে বাঁচতে এরই মধ্যে পরিবারটির সব সদস্য ক্যারিবিয়ান দ্বীপের পাসপোর্ট কিনেছেন। পুরো পরিবার ক্যারিবিয়ান দেশ সেন্ট লুসিয়ার ‘বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব’ পাওয়ার জন্য জনপ্রতি প্রায় আড়াই লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৩ কোটি টাকা) বিনিয়োগ করেছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন এবং দেশের শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে এখন তারা আয়েশি জীবনযাপনের আশায় ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে পাড়ি জমাতে চাইছেন। একটি সূত্রে জানা যায়, সৈয়দ শফিকের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক।

এ ব্যাপারে বক্তব্যের জন্য সৈয়দ শফিকুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

দুর্নীতি যাদের রক্তে, তারা এভাবেই দেশের অর্থনীতিকে রক্তশূন্য করে নিজেদের আখের গুছিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, কেনা পাসপোর্টে এই মাফিয়া পরিবার কি সত্যি সত্যিই বিচারের হাত থেকে চিরতরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হবে, নাকি রাষ্ট্র তার লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধারে এই ‘বাপ-বেটা’র সিন্ডিকেটকে অবিলম্বে আইনের আওতায় আনবে।