ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সিলেটে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ছিনতাই-অপহরণ

সালমান ফরিদ, সিলেট
প্রকাশিত: মার্চ ১২, ২০২৬, ০১:১১ এএম

সিলেট নগরীতে এখন আতঙ্ক ছড়াচ্ছে লাগামহীন ছিনতাই। দিনে-রাতে যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে দুর্বৃত্তদের শিকারে পরিণত হচ্ছেন নগরবাসী। সম্প্রতি এমন কয়েকটি ঘটনার ফুটেজ ভাইরালও হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এমন পরিস্থিতিতে সিলেটবাসীকে নির্বিঘেœ ঈদের কেনাকাটা করার আহ্বান জানিয়েছেন সিলেটের দুই মন্ত্রী। কিন্তু আশ্বস্ত হতে পারছেন না নগরবাসী। উল্টো তাদের কাবু করে রাখছে ছিনতাই ও অপহরণের আতঙ্ক। মন্ত্রীদের কড়া নির্দেশনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা, কোনো কিছুই যেন থামাতে পারছে না ছিনতাই।

এর মধ্যে গত দুই দিনে সিলেটে দুটি বড় অভিযানে বেশ কয়জন অপহরণকারী ও ছিনতাইকারী আটক হয়েছে। এমন স্বস্তির খবরের মধ্যেও অস্বস্তি বাড়িয়েছে ওই সময়ে বেশ কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাস্তার পাশে ওত পেতে থাকা এবং মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা পথচারীদের সর্বস্ব নিয়ে নির্বিঘেœ পালিয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় পথ থেকে জোর করে তুলে নেওয়া হচ্ছে নিরীহ মানুষকে।

পুলিশের রেকর্ড ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিও ফুটেজ অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে সিলেটে ছিনতাই, রাহাজানি ও অপহরণের অন্তত চারটি ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও আরো কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যা আলোচনায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ফুটেজ আসেনি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে দুই শতাধিক অপরাপধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একাধিক সূত্র জানায়, ঈদ সামনে রেখে প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটে মাঠে নেমেছে অসংখ্য অপরাধী চক্র। তাদের বেশির ভাগই এসেছে সিলেটের বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে। এরা বহিরাগত মৌসুমি অপরাধী। ফলে সিলেটের পুলিশের খাতায় তাদের নাম নেই। এ কারণে ঘটনার পর অপরাধীদের চিহ্নিত করতে বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকে। গত মঙ্গলবার র‌্যাব-৯-এর হাতে আটক হওয়া ১৮ ছিনতাইকারীর মধ্যে অধিকাংশই সিলেটের বাইরের। আটককৃতরা জানিয়েছে, তাদের মতো আরও চক্র এখন সিলেটে সক্রিয়। এক্ষেত্রে স্থানীয় অপরাধীরা তাদের তথ্য দেয়। সে অনুসারে তারা অপকর্ম করে। মূলত ক্রাইম সিনে থাকে না স্থানীয় অপরাধীরা।

সিলেটের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, অপরাধ সংশ্লিষ্টদের বেশিসংখ্যকই কিশোর। এরা কিশোর গ্যাং নামে পরিচিত। এসব অপরাধী বেশির ভাগ রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অনেকে নেতাদের সঙ্গে যুক্ত ছবি ব্যবহার করে দলীয় পরিচয় দিয়ে পুলিশকে ধোঁকা দিচ্ছে। তাদের টার্গেট মূলত একাকী চলাফেরা করা নারীরা। এ ছাড়া ব্যবসায়ী ও পথচারীদেরও নিশানা বানানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এমনটি দেখা গেছে। অবশ্য ফুটেজ মিললেও অপরাধীদের খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ।

মূলত গত ফেব্রুয়ারিতে দুটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় সিলেট নগরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনটি মোটরসাইকেলে সশস্ত্র ছয় ছিনতাইকারী নগরীর অভিজাত এলাকা নামে পরিচিত ‘হাউজিং এস্টেট’-এ এক নারীর কাছ থেকে ব্যাগভর্তি টাকা ছিনিয়ে নেয়। ওই নারী সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে যাওয়ার পথে দিনদুপুরে এ ঘটনার শিকার হন। এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ফেসবুকে ভাইরাল হলে নগরজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। ফুটেজ দেখে ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করা গেলেও এখন পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এই দায়ভার নিয়ে প্রত্যাহার হন এয়ারপোর্ট থানার ওসি মোবাশ্বির আলী। তার বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনার কয়েক দিন পর সাগরদিঘির পাড়ে আরেক নারীকে দুটি মোটরসাইকেলে চারজন ছিনতাইকারী দেশীয় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা ছিনিয়ে নেয়।

এর আগে গত বছর ২৬ অক্টোবর নগরীর দক্ষিণ সুরমা এলাকার কদমতলীতে এনা পরিবহনের এক কর্মকর্তা ছিনতাইয়ের শিকার হন। তার কাছ থেকে ১২ লাখ ৪০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। পাঁচটি মোটরসাইকেলে ১০ ছিনতাইকারী এসে এ ঘটনা ঘটায়। এদিকে গত রোববার সন্ধ্যায় নগরীর তাঁতীপাড়া এলাকায় এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনায় ১০ জনকে আটক করে পুলিশ। আটককৃতরা কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত। তাদের বেশির ভাগের সঙ্গে বর্তমান সরকারদলীয় রাজনীতিবিদদের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

এসএমপির জালালাবাদ থানার শিবেরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির কাছাকাছি এলাকায়ও প্রায়ই ছিনতাই হচ্ছে। সেখানে গত ৮ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ছিনতাইয়ের শিকার হন ব্যাংক কর্মকর্তা মিঠুন দাস (৩২)। তিনি দ্য ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেডের সহকারী বিনিয়োগ কর্মকর্তা। ঘটনার সময় হেলমেট পরা পাঁচ-ছয়জন দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেলে এসে তার কাছ থেকে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৩০০ টাকা নিয়ে যায়। এ সময় বাধা দিলে তাকে কুপিয়ে ফেলে যায় ছিনতাইকারীরা।

এমন পরিস্থিতিতে গত শনিবার জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী প্রশাসনের প্রতি কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, অপরাধীকে গ্রেপ্তারের পর কেউ ছাড়ানোর তদবির করলে তাকেও যেন গ্রেপ্তার করা হয়। অপরাধী কোন দলের নেতা বা কর্মী তা দেখা বিবেচ্য নয়। অন্যদিকে সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য শিল্প ও বাণিজ্য এবং পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরও সম্প্রতি সিলেটে সংঘটিত ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন।

এসএমপির উপকমিশনার  (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সিলেটের পুলিশ তৎপর রয়েছে। অপরাধীদের চিহ্নিত করা হয়েছে। গত তিন দিনে এসএমপির অভিযানে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত দুজনেরও বেশি ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। বাকিদের দ্রত আইনের আওতায় আনা হবে। অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)-৯-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, মহানগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে অভ্যাসগত অপরাধী ও মাদকসেবী উচ্ছৃঙ্খল তরুণদের সমন্বয়ে একাধিক সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র সক্রিয়। অপেক্ষাকৃত কম জনবহুল এলাকায় দেশীয় ধারালো অস্ত্রের ভয়ভীতি দেখিয়ে ছিনতাই করা হয়। তারা শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় সাধারণ লোকজনের মতো ওত পেতে থাকে এবং ছিনতাই শেষে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। ছিনতাই করার সময় তারা ভুক্তভোগীকে প্রাণঘাতী আঘাত করতেও দ্বিধাবোধ করে না। আমরা তাদের একে একে আটকের চেষ্টা করছি।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, প্রতিবছর ঈদ সামনে রেখে চুরি-ছিনতাই বাড়ে। তুলনামূলকভাবে এবার এ রকম অপরাধ কম হচ্ছে। নগরবাসীর নিরাপত্তায় নগরীতে পুলিশের ৬০টি মোবাইল টিম ও ৬টি স্ট্রাইকিং টিম কাজ করছে। ১২টি অস্থায়ী ও ৩টি স্থায়ী চেকপোস্টে তল্লাশি চলছে। বিপণিবিতানগুলোতে পোশাকধারীদের পাশাপাশি সাদা পোশাকে পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। সিনিয়র অফিসাররা ২৪ ঘণ্টা তদারকি করছেন।

এ বিষয়ে মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, আমরা ছিনতাই-রাহাজানির বিষয়ে জিরো টলারেন্সে। অপরাধী যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতেই হবে। কেউ আমাদের দলীয় পরিচয় ব্যবহার করতে চাইলে তাকে কঠোরভাবে দমনের কথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছিনতাই, রাহাজানিতে কোনো ছাড় নয়, কোনো আপোস নয়।