বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পাশাপাশি পেশাদার সরকারি কর্মকর্তারাও নানাভাবে বৈষম্য ও নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকে পদবঞ্চিত হয়েছেন, কাউকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, আবার কেউ নিজ কার্যালয়েই আওয়ামীপন্থি ‘সিন্ডিকেট’ দ্বারা অপমানিত ও অপদস্ত হয়েছেন। বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারের তেমনই একজন মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তা ফারহানা আহমেদ চৌধুরী। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে কর্মরত থাকাকালে আওয়ামীপন্থি আমলাদের দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় নোংরা রাজনীতির শিকার হতে হয়েছিল তাকে।
ফারহানা আহমেদ চৌধুরী বর্তমানে ভারতের মুম্বাইয়ে বাংলাদেশ উপহাইকমিশনে ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে কর্মরত। ভারতে বদলি হওয়ার আগে তিনি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে দূতাবাসের শৃঙ্খলা রক্ষা, প্রবাসীদের বহুমুখী সমস্যার সমাধান এবং বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে দেশটির উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে তিনি অনন্য সাধারণ ভূমিকা রেখেছিলেন। একজন পেশাদার কূটনীতিক হিসেবে অত্যন্ত সফল হওয়া সত্ত্বেও কেবল বাবা বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য হওয়ায় তাকে আওয়ামী আমলাদের রোষানলে পড়তে হয় এবং অপমানজনকভাবে দূতাবাস ছাড়তে বাধ্য করা হয়। অথচ অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অনেকেই এখনো দূতাবাসে বহাল তবিয়তে আছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে ‘দূতালয় প্রধান’ (হেড অব চ্যান্সারি) পদে থাকায় মিশনের অভ্যন্তরীণ যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে ফারহানা আহমেদ চৌধুরীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকত। আর এই পেশাদারিত্বই তৎকালীন ডেপুটি হাইকমিশনার (বর্তমানে প্রত্যাহার কিন্তু মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত) খোরশেদ আলম খাস্তগীর ও তার সিন্ডিকেটের অবৈধ কর্মকা-ের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
খাস্তগীর সিন্ডিকেটের ভুয়া কোম্পানির কলিং অ্যাটাস্টেশন (শ্রমিক নিয়োগের অনুমোদন), হাইকমিশনারের বাসভবন (বাংলাদেশ হাউস) পরিবর্তনে আর্থিক অনিয়ম এবং ই-পাসপোর্টের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সার্ভার কোনো লিখিত অনুমোদন ছাড়াই একটি বিদেশি বেসরকারি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগের প্রতিবাদ করেছিলেন ফারহানা। এ ছাড়াও চুক্তিতে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও ক্ষতিপূরণ আদায় না করাসহ পাহাড়সম দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তাকে নানাভাবে মানসিক চাপে রাখা ও অপদস্ত করা হতো।
একপর্যায়ে খাস্তগীর তার পথের কাঁটা সরাতে মালয়েশিয়া আওয়ামী লীগ নেতাদের সমন্বয়ে এবং দূতাবাসের নিজস্ব অনুগতদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এই সিন্ডিকেট ফারহানা আহমেদ চৌধুরীর পারিবারিক পরিচয়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তার বাবা কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম ফরহাদ আহমেদ চৌধুরী হওয়ার ‘অপরাধে’ তাকে দূতালয়প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
ফারহানাকে সরানোর পর খাস্তগীর তার পছন্দের লোক প্রণব কুমার ভট্টাচার্যকে দূতালয়প্রধানের পদে বসান। অভিযোগ রয়েছে, দূতাবাসে যোগদান করেই যোগ্যতার চেয়ে বড় পদ পাওয়ায় প্রণব কুমার ভট্টাচার্য কৃতজ্ঞতাস্বরূপ খাস্তগীরের সব অনিয়ম ও দুর্নীতিতে একনিষ্ঠ সমর্থন দেন। এতে খাস্তগীর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। প্রণব কুমার ভট্টাচার্য ইতোপূর্বে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মুখপাত্র থাকায় গণমাধ্যমে তার ব্যাপক প্রভাব ছিল। এই প্রভাব খাটিয়ে তিনি একদিকে খাস্তগীরকে দুদকের নজর থেকে রক্ষা করেন, অন্যদিকে নিজেকে আড়াল করতে তৎকালীন পাসপোর্ট কাউন্সিলরকে বলির পাঁঠা বানান। পাসপোর্ট কাউন্সিলর মিয়া মোহাম্মদ কেয়ামউদ্দিন দায়িত্ব নেওয়ার পর মালয়েশিয়ায় পাসপোর্ট দালালের দৌরাত্ম্য প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল। অথচ প্রণব ভট্টাচার্যের সহায়তায় খাস্তগীর তার বিরুদ্ধে একের পর এক ভুয়া খবর রটিয়ে জনমতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন।
উল্লেখ্য, প্রণব কুমার ভট্টাচার্য যখন দুদকের মুখপাত্র ছিলেন, তখনই বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা দুর্নীতি মামলাগুলো নতুন গতি পেয়েছিল। সম্প্রতি প্রণব কুমার ভট্টাচার্যসহ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া একাধিক কর্মকর্তার প্রত্যাহারের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান এবং দূতাবাসের সামনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেছেন মালয়েশিয়া প্রবাসী বিএনপিসহ সাধারণ বাংলাদেশিরা।
এদিকে, বাবা বিএনপির এমপি হওয়ার কারণে প্রবাসীদের জন্য নিরলস কাজ করে যাওয়া একজন যোগ্য কর্মকর্তা ফারহানা আহমেদ চৌধুরীকে দূতাবাস থেকে অপমানিত হয়ে বিদায় নিতে হয়েছে। হাইকমিশন থেকে ‘আদম ব্যবসায়ী’ হিসেবে পরিচিত খাস্তগীর প্রত্যাহার হলেও বর্তমানে কথিত পিএইচডি গবেষণার দোহাই দিয়ে তিনি মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন এবং তার সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয়। অভিযোগ রয়েছে, সামনে শুরু হতে যাওয়া শ্রমিক নিয়োগ বা ‘কলিং’ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে দূতাবাসে খাস্তগীর সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে খোদ এক বিএনপি নেতাই আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৩৫তম বিসিএসের এক কর্মকর্তা জানান, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তন হলেও ক্যাডার সার্ভিসে বৈষম্য ও আওয়ামী আমলাদের প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়নি। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেওয়ার পরও পেশাদার কর্মকর্তারা আওয়ামীপন্থি সিন্ডিকেটের কাছে অবহেলার শিকার হচ্ছেন।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ কমিউনিটির নেতারা বলেন, সৌদি আরবের পরেই মালয়েশিয়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার, যেখানে প্রায় ১৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করেন। এই বিশাল সংখ্যক প্রবাসীর স্বার্থ রক্ষা এবং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে হাইকমিশন থেকে অনতিবিলম্বে আওয়ামী দোসর ও আদম ব্যবসায়ী কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করতে হবে। তাদের পরিবর্তে যোগ্য, সৎ এবং চৌকস অফিসারদের পদায়ন করা জরুরি। অন্যথায় রাষ্ট্র সংস্কার ও নতুন বাংলাদেশের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এসব দোসররা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন