সিলেটে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের পার্থক্য এখন অর্ধেকেরও বেশি। মহানগর ও এর আশপাশের পিডিবি এলাকায় পিক আওয়ারে চাহিদা প্রায় ২২৫ মেগাওয়াট। কিন্তু এর বিপরীতে বর্তমান সরবরাহ প্রায় অর্ধেক। কাগজে-কলমে ১৮৫ মেগাওয়াট বলা হলেও প্রতি ২ ঘণ্টায় ১ ঘণ্টা করে লোডশেডিং হচ্ছে। লোডশেডিংয়ে রেশনিং বা লোড ম্যানেজমেন্ট অনুসরণ না করায় কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি সময় অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে। তবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা গ্রামাঞ্চলের পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এলাকায়। তাদের এলাকায় চাহিদা প্রায় ৪৫–৫০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মাত্র ১৮–২৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সেখানে ঘাটতি অর্ধেকেরও বেশি।
সিলেটে বিদ্যুতের এমন সংকটের কারণ হিসেবে জ্বালানি সংকটকে দায়ী করছে কর্তৃপক্ষ। তাদের ভাষায়, জ্বালানি সংকট এবং জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ বরাদ্দ না পাওয়ায় সিলেটে দিন ও রাতে পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করা হচ্ছে। তারা জানিয়েছে, গরমের মৌসুমে এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে। বিশেষ করে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময়ও শিক্ষার্থীরা লোডশেডিংয়ের মুখোমুখি হতে পারে। এ নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে।
পিডিবি ও পল্লী বিদ্যুৎ সূত্র জানায়, শহরের তুলনায় গ্রামে লোডশেডিংয়ের অবস্থা অসহনীয়। কোথাও কোথাও মাইকিং করে বিদ্যুৎ না থাকার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন সিলেট মহানগর এলাকায় বহুবার বিদ্যুতের যাওয়া-আসা করলেও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এলাকায় একবার গেলে কয়েক ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ ফিরে আসে। গত শনিবার সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার গ্রামাঞ্চল থেকে গ্রাহকরা জানান, তাদের এলাকায় দুপুর ১২টায় বিদ্যুৎ চলে গিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়নি। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানান, লোডশেডিং চলছে—সিলেট থেকে বিদ্যুৎ দেওয়া হলে সরবরাহ আসবে। এর আগে সকাল থেকেও কয়েকবার লোডশেডিং করা হয়েছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, উপজেলা সদর এলাকায় তুলনামূলক কম লোডশেডিং দেওয়া হয়। সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে গ্রামের লাইনে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হয়। ফলে গ্রামগুলোতে একটানা ৫–৬ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হয়। এ চিত্র সিলেটের প্রায় সব গ্রামেই। জকিগঞ্জ, কানাইঘাট ও বিয়ানীবাজার এলাকা থেকেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ও ২-এর আওতায় মোট গ্রাহক সংখ্যা ১২ লাখ ২০ হাজার। অসহনীয় ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। সহসা এই দুরবস্থার অবসান হবে—এমন কোনো সম্ভাবনাও দেখছেন না কেউ।
গ্রামের মতো সিলেট নগরীর গ্রাহকরাও তীব্র লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ। উপশহর, হাউজিং স্টেট, ফাজিলচিশতসহ সব এলাকায় সমানতালে লোডশেডিং চলছে। দিনের বেলায় ৮–১০ বার বিদ্যুতের যাওয়া-আসা করছে। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। পুরো পিক আওয়ারের ৬ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ৪ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে মহানগরে। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কারাগারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়ও ঘনঘন লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পিডিবি সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী মো. ইমাম হোসেন বলেন, পিক আওয়ারে আমাদের চাহিদা ছিল ২২৫ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ পেয়েছি ১৮৫ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৪০ মেগাওয়াট। এ কারণে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। কারণ জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট কিছু না বললেও বলেন, “আমরা সবাই জানি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে। এর প্রভাবে জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কমছে—আমিও তাই মনে করি।”
সহকারী প্রকৌশলী জারজিসুর রহমান বলেন, সিলেটের চার জেলায় পিডিবির গ্রাহক সংখ্যা ৫ লাখ ৬৫ হাজার। পিক আওয়ারে সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে ২৩০ মেগাওয়াট। গ্রিডে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ থাকলে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাওয়া যায়; না হলে লোডশেডিং দিতে হয়। বর্তমানে পিক আওয়ারে সরবরাহ ১৪০ থেকে ১৮০ মেগাওয়াটের মধ্যে সীমিত রাখা হচ্ছে।
সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর গ্রাহক সংখ্যা ৪ লাখ ২০ হাজার। সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. আব্দুর রশীদ বলেন, পিক আওয়ারে আমাদের চাহিদা ১০৫ মেগাওয়াট, আর সরবরাহ প্রায় ৭৩ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ৩২ মেগাওয়াট ঘাটতি নিয়েই সেবা দিতে হচ্ছে। তিনি জানান, ঘাটতি খুব বেশি নয়। তবে ঘনঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা ও সারাদিন বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর অবস্থা আরও খারাপ। জেনারেল ম্যানেজার মো. রবিউল হক জানান, তাদের গ্রাহক সংখ্যা ২ লাখ ৩৫ হাজার। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত পিক আওয়ারে তাদের সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে ৪৫–৫০ মেগাওয়াট, আর সরবরাহ মাত্র ১৮–২৫ মেগাওয়াট। উৎপাদন ও সরবরাহে যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে কি না—এ প্রশ্নে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সিলেটের বিদ্যুৎ সূত্র জানায়, চাইলেই বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়াতে পারে না স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। জাতীয় লোড ম্যানেজমেন্টের কারণে নির্দিষ্ট করা থাকে সিলেটের সরবরাহ। এর বেশি চাহিদা তৈরি হলেই আন্ডার লোড ফ্রিক্যুয়েন্সির কারণে জাতীয় গ্রিড থেকে সিলেট আপনাআপনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাই সিলেটে লোডশেডিং কমাতে হলে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ বাড়াতে হবে।

