প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষাকে যুগোপযোগী, আনন্দময় ও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই ও শিক্ষাক্রম পরিমার্জনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথমে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মোট ৬০৪টি পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনা মূল্যে বিতরণ করা হবে, যার মধ্যে ৬০১টি পরিমার্জিত এবং তিনটি নতুন বই অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। নতুন তিনটি পাঠ্যবই হলো- চতুর্থ শ্রেণিতে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিবিষয়ক ‘স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার’, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’বিষয়ক একটি এবং কারিগরি ও ভোকেশনালের একটি। এ ছাড়া ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবোটিক্সসহ আধুনিক প্রযুক্তির বিষয়-আশয় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।
২০২৭ সালের বই পরিমার্জনার পর ২০২৮ সালে শিক্ষার্থীরা যাতে পরিমার্জিত নতুন কারিকুলামে পাঠ্যবই পায় সে কাজ শুরু হবে। এ লক্ষ্যে কমিটি গঠন করে কারিকুলাম পরিমার্জনার রূপরেখা প্রণয়ন করা হবে। তারপর কারিকুলাম তৈরি করে সে অনুযায়ী টেক্সট কনটেন্ট বা পাঠ্যসূচি তৈরি হবে। একই সঙ্গে চলবে পরিমার্জিত নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ। এনসিটিবি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে সার্বিক প্রস্তুতি নিতে সম্প্রতি এনসিটিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক সভা করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সভায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনও অংশ নেন। এসব সভায় নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে মানসম্পন্ন পরিমার্জিত পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে পরিমার্জিত নতুন কারিকুলামের পাঠ্যবই বিষয়েও আলোচনা হয়।
জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা তাদের অন্যান্য বইয়ের সঙ্গে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ (আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা) এবং বর্তমানের শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে ‘স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার’ (সমাজ সংস্কৃতি) নামে দুটি নতুন পাঠ্যবই পাবে। পর্যায়ক্রমে এই বিষয় দুটি পরের ক্লাসে, অর্থাৎ সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতেও অন্তর্ভুক্ত হবে। এছাড়া শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কারাতে, দাবা, সাঁতার ও অ্যাথলেটিক্স- এই সাতটি খেলা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। তবে লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস বা স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার বিষয়ে গতানুগতিক কোনো লিখিত পরীক্ষা দিতে হবে না শিক্ষার্থীদের। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে বছরজুড়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে।
এনসিটিবির বিশাল এই কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ৪০০ সদস্যের একটি শক্তিশালী প্যানেল গঠন করা হচ্ছে। ২০২৭ সালের বই পরিমার্জনার জন্য শিগগিরই ঢাকার বাইরে এই বিশেষজ্ঞদের নিয়ে চারদিনের একটি আবাসিক কর্মশালা হবে। এতে ৬০১টি পাঠ্যবই পরিমার্জন চূড়ান্ত করা হবে বলে জানান এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী।
রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘পরিমার্জন বলতে বইয়ে থাকা যেকোনো ধরনের ভুল চিহ্নিত করে তা সংশোধন, শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য অধিক উপযোগী কনটেন্ট অন্তর্ভুক্ত করাসহ সব বিষয়ই গুরুত্ব পাচ্ছে। আশা করছি কোরবানির ঈদের আগেই পরিমার্জনার কাজ শেষ করতে পারব। শিক্ষার্থীরা যাতে শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই ভুল-ভ্রান্তিহীন পরিমার্জিত মানসম্পন্ন বই পায় সে লক্ষ্যেই সব কাজ চলছে।’ পরিমার্জনের মাধ্যমে বর্তমানের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইটি আরও যুগোপযোগী করা হচ্ছে মন্তব্য করে চেয়ারম্যান বলেন, ‘বইটির কনটেন্ট এমনভাবে সাজানো হচ্ছে যাতে শিক্ষার্থীরা উচ্চ পর্যায়েও বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে পারে।’
এদিকে ৬০১টি বই পরিমার্জনা ও নতুন দুটি বই তৈরি করে আগামী শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব কি না এমন প্রশ্নে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) পদে সম্প্রতি দায়িত্ব পাওয়া অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু।
রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘আশা করি কোনো সমস্যা হবে না। কারণ বই তৈরির আগে প্রারম্ভিক যেসব কাজ রয়েছে- যেমন বই ছাপানোর জন্য দরপত্র দেওয়া, দরপত্র মূল্যায়ন করা ইত্যাদি আগেই শেষ করে ফেলা হবে। আমাদের প্রেসগুলোরও যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে, তাই বই ছাপার প্রারম্ভিক কাজ এগিয়ে রাখলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শিক্ষার্থীর হাতে বই তুলে দেওয়া যাবে।’
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে বই প্রণয়ন দেশের প্রচলিত শিক্ষার প্রেক্ষাপটে একেবারেই নতুন। তাই এই বইয়ে কী ধরনের কনটেন্ট থাকতে পারে সে সম্পর্কে এখনো স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। তবে এ নিয়ে কাজ চলছে বলে জানান এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম মাসুদুল হক। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘বইটির আইডিয়া একেবারেই নতুন, তাই এর কনটেন্ট কী হতে পারে তা নিয়ে কাজ চলছে।’ তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘যেসব গল্প-কবিতা পড়লে শিক্ষার্থীরা আনন্দ পায়- তেমন কনটেন্ট অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, আবার, বইয়ে টেক্সট কনটেন্টের পাশাপাশি গান ও খেলার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কী হবে তা এখনো চূড়ান্ত নয়, নানা বিষয়ই পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’
বর্তমানে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে কোনো বই নেই, তবে এই দুই শ্রেণির শিক্ষক সহায়িকায় (টিচার্স গাইড) ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিক্স, ব্যাডমিন্টন ও সাঁতার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২১ (পরিমার্জিত ২০২৫) অনুযায়ী প্রাথমিক স্তরের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে সাতটি খেলা অন্তর্ভুক্ত করার ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় আত্মরক্ষামূলক দক্ষতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশলগত দক্ষতার গুরুত্ব বাড়ায় নতুনভাবে কারাতে ও দাবা অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তাই ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য চতুর্থ শ্রেণির স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার বিষয়ের নতুন বইয়ে কারাতে ও দাবা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। বইয়ের প্রস্তাবিত বিষয়বস্তুতে ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিক্স, ব্যাডমিন্টন ও সাঁতারের ক্ষেত্রে মৌলিক নিয়ম, খেলার কৌশল, নিরাপত্তা বিধি এবং দলগত অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরা হবে। একইভাবে কারাতে ও দাবার ক্ষেত্রেও খেলা দুটির সার্বিক বিষয় অন্তর্ভুক্তের কথা বলা হয়েছে। এই বিষয়গুলোর মূল্যায়ন ধারাবাহিক ও কার্যভিত্তিক হওয়া উচিত বলে উল্লিখিত ধারণাপত্রে মন্তব্য করা হয়েছে।
এই সাতটি খেলা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করায় শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশ নিশ্চিত হবে বলে মন্তব্য করেন এনসিটিবির সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল হায়দার। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক স্তরে খেলাধুলা শিক্ষার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হওয়া খেলাগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, সহনশীলতা, নেতৃত্বগুণ ও সমস্যা সমাধানে দক্ষতা গড়ে উঠবে, যা সার্বিকভাবে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্যপূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করবে।’

