ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

স্থানীয় নির্বাচন

কৌশলী এনসিপি-জামায়াত

ফারুক আহমেদ শাহেদ
প্রকাশিত: মে ১২, ২০২৬, ০২:২০ এএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন- সব স্তরেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ, গণসংযোগ ও কৌশল নির্ধারণে বেড়েছে ব্যস্ততা। বিশেষ করে ১১-দলীয় জোটের দুই গুরুত্বপূর্ণ শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ভোটের মাঠ দখল ও বিজয় নিশ্চিত করতে আগেভাগেই প্রস্তুতি শুরু করেছে। যার অংশ হিসেবে সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাচনি সমীকরণ মেলাতে নানা বার্তাও দিচ্ছেন তারা। তবে এখনো এ দৌড়ে পিছিয়ে বিএনপি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু প্রশাসনিক কাঠামোর ভোট নয়, এটি তৃণমূল রাজনীতির শক্তি যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। তাই বড় দলগুলো এই নির্বাচন ঘিরে সাংগঠনিক শক্তি প্রমাণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ১১-দলীয় জোটের  ভেতর আপাতদৃষ্টিতে প্রার্থী নিয়ে কিছুটা দ্বন্দ্ব দেখা দিলেও এটি আসলে তাদের রাজনৈতিক প্রচারণারই একটি অংশ বলেই মনে করেন তারা। তারা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করতে নানামুখী কৌশল নেবে তারা। যা বাস্তবায়ানের জন্য প্রধানত কাজ করবে তরুণদের নেতৃত্বে গড়া এনসিপি এবং জামায়াতে ইসলামী।

এদিকে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমেই জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচন করবে বলেই ঘোষণা দিয়েছে এনসিপি। যদিও দল দুটির সম্ভাব্য প্রার্থী, যারা নির্বাচনে অংশ নিতে উচ্ছুক, তাদের ভেতর প্রায়ই মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনসহ (নাসিক) সারা দেশে বেশ কয়েকটি সিটি নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে দল দুটির দর-কষাকষি চরমে। দুই দলের সমর্থকরাই অনলাইন তর্কবিতর্ক করছেন। ডিএসসিসি নির্বাচনে জামায়াতের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। অন্যদিকে, এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদও প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

নাসিক নির্বাচনে দুই দলের কেউ প্রার্থী ঘোষণা না করলেও জামায়াতের নারায়ণগঞ্জ মহানগরীর আমির ও শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল জাব্বার আলোচনায় রয়েছেন। অন্যদিকে সদ্য এনসিপিতে যোগদান করা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জোনায়েদ এনসিপি থেকে আলোচনায় রয়েছেন।

উভয় সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে এমন মতভিন্নতা থাকলেও এটি নির্বাচনি কৌশলের অংশ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, নির্বাচনের আগে জামায়াত বা এনসিপি যে দলেরই প্রার্থীই চূড়ান্ত মনোনয়ন পাক না কেন, দীর্ঘ সময় ধরে প্রচারণায় থাকার কারণে তারা ভোটারদের মনে প্রার্থী হিসেবে স্থায়ীভাবে পরিচিত হবে। অন্যদিকে প্রার্থী বাছাই নিয়ে অনলাইন-অফলাইনে যতই মতভেদ থাকুক, শেষ পর্যন্ত তা প্রচারণার বিষয় হয়েই থাকবে।   

জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের দেওয়া তথ্য মতে, সিটি করপোরেশন পর্যায়ের নির্বাচনে ১১ দল সমঝোতার ভিত্তিতেই প্রার্থী ঠিক করবে। তবে উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে জোটের শরিকদের একক নির্বাচন করার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে এককভাবে নির্বাচনের সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি বলেই মনে করছেন তারা।

অন্যদিকে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের এমন চিন্তার বিষয়ে ভিন্নতা রয়েছে এনসিপিরি। সূত্র জানিয়েছে, এনসিপি তাদের নির্বাচনি কৌশলে ভিন্নতা আনতে চাইছে। স্থানীয় বাস্তবতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কিছু এলাকায় জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতায় গেলেও রাজধানীসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিটি করপোরেশনে একক প্রার্থী দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিপি।

বিএনপি ও জামায়াতের মতো বড় রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা, জনপ্রিয়তা ও ভোটের অবস্থান যাচাই করতে চায় এনসিপি। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে বিভিন্ন মহানগরে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্তের কাজও শুরু করেছে দলটি।  ইতিমধ্যে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়র পদে ১০০ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে এনসিপি। যেখানে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে ৫০ জন এবং পৌর মেয়র পদে ৫০ জন প্রার্থী রয়েছেন। এ ছাড়া আরও অনন্ত ৪০০ প্রার্থী ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানায় দলটি। দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া রূপালী প্রতিবেদককে বলেন, ‘দলের প্রার্থীরা এখন থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে কাজ শুরু করছেন’।

এদিকে আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, জামায়াত ও এনসিপি ইতিমধ্যে জোটভিত্তিক রাজনীতির পথেই হাঁটা শুরু করেছে। শুরুতে এটিকে ‘নির্বাচনি সমন্বয়’ বলা হলেও দুই দলের একসঙ্গে পথচলা দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। কারণ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে কৌশল নেওয়া হয়েছিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সেই কৌশলেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে একদিকে জামায়াতের সঙ্গে জোটগত বৈঠক করছে এনসিপি, অন্যদিকে কৌশলগত কারণে দলীয়ভাবেও অভ্যন্তরীণ সভা করছে।

এদিকে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে জামায়াতের সঙ্গে বনিবনা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা চেয়ারম্যানÑ এই পদগুলোতে একক নির্বাচন করার জন্য দলগতভাবে পরিকল্পনা করছে এনসিপি।

এদিকে জামায়াত ও তাদের নারী বিভাগ স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুত হওয়ার কথা জানিয়েছে। যার অংশ হিসেবে নারীদের ভোট নিশ্চিত করতে গ্রহণ করেছে বিভিন্ন পরিকল্পনা। নাম না প্রকাশের শর্তে জামায়াতের এক নেতা বলেন, ‘জুলাই চেতনায় বিশ্বাসী যারা আছি, তাদের সঙ্গে নিয়েই কাজ করতে আগ্রহী জামায়াত। মানুষের স্বার্থে গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ আমরা ১১-দলীয় জোট রাজপথে আন্দোলন করে যাচ্ছি। পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় নির্বাচনেও জোটবদ্ধ হয়ে আগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ে আমাদের বোঝাপড়া চলছে। সিটি নির্বাচনে আমাদের সমঝোতার বিষয়টি অনেকটা চূড়ান্ত হলেও, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সবাই নিজের অবস্থান যাচাই করতে চাই। তারই অংশ হিসবে এনসিপি নতুন দল হিসেবে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও ভোটব্যাংক পরীক্ষা করতে চায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিছু উপজেলায় এনসিপি-জামায়াত এককভাবে নির্বাচন করবে, সঙ্গে কিছু জায়গায় সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনে লড়বে। তবে নির্বাচনের ফরমেট যেমনই হোক, জয় ছাড়া বিকল্প ভাবছে না এগারোদলীয় জোট। একই সঙ্গে জোটের অন্যান্য দল থেকে কাউন্সিলর, ইউপি সদস্য, চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।’ এসব ক্ষেত্রে জামায়াতের সমর্থন থাকবে বলেও তিনি জানান।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলটির প্রচার মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে ১১-দল একসঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন করেছে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সমঝোতা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তপশিল ঘোষণা হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হওয়া যাবে, তার জন্য কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগেই দেশের অধিকাংশ জায়গায় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। শরিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা হলে কোন দলকে কতটুকু কোন স্থানে ছাড় দেওয়া হবে, সেটি তখন বিবেচনা করা হবে। আপাতত কৌশলগতভাবে সব দলই কাজ করছে।’

এদিকে ১১-দলীয় জোটের অন্যান্য দলের নেতারা বলছেন, ইউনিয়ন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে নিজেদের সক্ষমতা যাচাইয়ের চিন্তা রয়েছে। সিটি করপোরেশনে কেন্দ্রীয়ভাবে সমঝোতা হলেও ইউনিয়ন পরিষদে দল থেকে কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে না। তৃণমূল পর্যায়ে দল-সমর্থিত প্রার্থীরা ‘ওয়ান টু ওয়ান’ সমঝোতা করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে দলের পক্ষ থেকে কোনো বাধা থাকবে না।