মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ মোড় নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি। একই সময়ে ইরানের নতুন শান্তি প্রস্তাব ওয়াশিংটনে পৌঁছে দিয়েছে পাকিস্তান। এর মধ্যেই ইরানের দিকে সতর্কবার্তা ছুড়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ‘ইরানের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’ উভয় পক্ষের কড়া বক্তব্যের কারণে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক এলমাসরি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং নিজের প্রশাসনের যুদ্ধপন্থি কর্মকর্তাদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। ফলে তিনি আবারও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পথে এগোতে পারেন।
তার মতে, ট্রাম্প ইরানের কাছ থেকে যেভাবে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ আশা করেছিলেন, বাস্তবে তা পাননি। পাশাপাশি তেহরানের সঙ্গে আলোচনাও কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলোতেও প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতর নতুন করে শক্ত অবস্থানের প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
এলমাসরি মনে করেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই চলমান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ভাষায়, এই যুদ্ধ আমেরিকার জন্য একটি ‘প্রকৃত বিপর্যয়’। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ বন্ধ করাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারত। কিন্তু এখন যুদ্ধ থেকে সরে এলে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে জনগণের কাছে তা বিজয় হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ কমে যাবে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমাতে পাকিস্তান নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে। পাকিস্তানের একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া সংশোধিত শান্তি প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এমন এক সময়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হলো, যখন শান্তি আলোচনা কার্যত অচলাবস্থার মুখে পড়েছে।
সূত্রটি জানিয়েছে, দুই পক্ষের অবস্থান দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সময় খুব সীমিত। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই ঘনঘন নিজেদের শর্ত পরিবর্তন করছে, যা সমঝোতার পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।
তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি ইরানের কোনো শত্রুভাবাপন্ন অবস্থান নেই। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা এখনো অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বাকায়ি অভিযোগ করেন, মধ্যপ্রাচ্যে মূল অস্থিতিশীলতার উৎস হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি থেকে আঞ্চলিক দেশগুলোর শিক্ষা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইরান সবসময় সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন কৌশলগত ব্যবস্থা তৈরির কাজ চলছে। এ বিষয়ে ওমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানকে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘ইরানের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য নতুন সামরিক অভিযানের ইঙ্গিতও হতে পারে।
অবশ্য এর আগেও ট্রাম্প একাধিকবার ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি একটি ছবিতে তাকে সামরিক জাহাজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ছবির বার্তায় বলা হয়, ‘এটি ঝড়ের আগের শান্ত মুহূর্ত।’
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন চলমান সংঘাতে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে না পারায় এ ধরনের কড়া বক্তব্য বাড়ছে। একই সঙ্গে এসব বক্তব্য ইরানকে আরও অনমনীয় অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরানও। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ দাবি করেছে, সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র কোনো বাস্তবসম্মত ছাড় দেয়নি। বরং যুদ্ধের মাধ্যমে যা অর্জন করা সম্ভব হয়নি, এখন আলোচনা দিয়ে তা আদায়ের চেষ্টা চলছে।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র আবোলফজল শাকারচি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও ‘বোকামিপূর্ণ’ কোনো পদক্ষেপ নেয়, তা হলে তার জবাব হবে আরও কঠোর ও ধ্বংসাত্মক। তার ভাষায়, ‘ইরানের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অপমানিত হয়েছে। আবার একই পথে হাঁটলে আরও ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে।’
আলজাজিরার যুদ্ধ বিশ্লেষক আলমিকদাদ আলরুহাইদ বলেন, উভয় পক্ষের আক্রমণাত্মক বক্তব্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুদ্ধবিরতি যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। তার মতে, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে এবং দুই পক্ষই যেন যুদ্ধের প্রস্তুত অবস্থানে রয়েছে।
তবে পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক অ্যাডাম ক্লেমেন্টস ভিন্ন দিকও তুলে ধরেন। তার মতে, ট্রাম্পের বক্তব্যের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাবও থাকতে পারে। তিনি বলেন, ট্রাম্পের অনেক বক্তব্যই দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রোতাদের লক্ষ্য করে দেওয়া হয়। তাই কেবল বক্তব্য নয়, আগামী দিনগুলোতে সামরিক তৎপরতা বাড়ে কি না সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হওয়া এখন সময়ের ওপর নির্ভরশীল।

