দেশের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এবং জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) অফিসগুলোয় লাগামছাড়া দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা হলেও এদিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা সংস্থাগুলোর কোনো নজর নেই। অভিযোগ, উপর মহলকে ম্যানেজ করেই দীর্ঘদিন ধরে লুটপাট ও দুর্নীতি চলে আসছে। বিভিন্ন প্রকল্প কাজে কমিশন বাণিজ্য, কাজ না করে বিল দেখানো, নামসর্বস্ব মসজিদ, মাদ্রাসা, মাজার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের নামে বরাদ্দ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করার সূতিকাগার এসব অফিস।
সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাত যেন জেলা-উপজেলার এই কর্মকর্তাদের কাছেই জিম্মি। জানা যায়, পিআইও-ডিআরআরও’র সরাসরি হস্তক্ষেপে এসব অফিসে দুর্নীতি হয়ে থাকে। ফলে জেলা-উপজেলার জনগণ সরকারের প্রকৃত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকারের সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ অডিটে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির একটি বিস্তৃত চিত্র উঠে এলে একটু নড়েচড়েই বসেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
জিআর, টিআর ও দরিদ্রের গৃহনির্মাণ প্রকল্পের টাকা ডিসির মাধ্যমে ইউএনও ও পিআইও অথবা ডিআরআরওদের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। সমুদয় অর্থ যৌথ হিসাবে জমা থাকে। কিন্তু পিআইওরা নিয়মনীতি মানেন না। অনেক ক্ষেত্রে আয়কর ও ভ্যাট কম দেখানো হয় এবং অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোডে জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে গড়িমসি করা হয়। এসব কর্মকা- স্পষ্টত দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের (পিআইও) বিরুদ্ধে অব্যয়িত সরকারি অর্থ কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ কোটি টাকার অনিয়ম শনাক্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, ৮২৮টি আপত্তির বিপরীতে প্রায় ১২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা এবং আরও ১৩২টি আপত্তির বিপরীতে প্রায় তিন কোটিসহ মোট ১৬ কোটি টাকার অডিট আপত্তি ঝুলে আছে। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ডিপার্টমেন্টাল প্রসেস (ডিপি), বিভাগীয় মামলা রুজু করা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) দিয়ে অধিকতর তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ডিপার্টমেন্টাল প্রসেস (ডিপি), বিভাগীয় মামলা রুজু করা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) দিয়ে অধিকতর তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়। সরকারি বিধি অনুযায়ী কোনো প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যয় না হলে তা ৩০ জুনের পর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাস্তবে অনেক ডিআরআরও, পিআইও এ নিয়ম মানছেন না। অনিয়ম করে বছরের পর বছর অব্যয়িত অর্থ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে দিচ্ছেন। এসব অর্থের মধ্যে রয়েছে সাধারণ রিলিফ (জিআর), টেস্ট রিলিফ (টিআর), কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) এবং হতদরিদ্রদের গৃহনির্মাণ প্রকল্পের বরাদ্দ। এর ফলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও আর্থিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে দেখা যায়, মন্ত্রণালয়ে বর্তমানে তিন হাজার ২৪টি অডিট আপত্তি জমা রয়েছে, যার মধ্যে ৯৩০টি অত্যন্ত গুরুতর। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সারা দেশে ৩০০ থেকে ৪০০ জন পিআইও এবং ডিআরআরও এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। ইতোমধ্যে ২৯ কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে। বাকিদের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে কঠোর অবস্থানে মন্ত্রণালয়। যারা অব্যয়িত টাকা জমা না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দেয় এমন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শোকজ করা হয়েছে। কয়েকজনের নামে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। আর বড় বিষয়গুলো দুদকে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, নির্দিষ্ট কিছু এলাকা এসব অনিয়মের শীর্ষে রয়েছে। এলাকাগুলো হলো হবিগঞ্জের মাধবপুরে সর্বোচ্চ তিন কোটি ৬৭ লাখ টাকার গরমিল পাওয়া গেছে। এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় ৪০ লাখ টাকা, বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে ৩৩ লাখ টাকা, বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে ২৩ লাখ টাকা, মাগুরা জেলায় সাড়ে চার লাখ টাকা, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে এক লাখ টাকা এবং ফেনীর পরশুরামে আট লাখ ও সদরে দেড় লাখ টাকা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকারি নীতিমালায় একই কর্মস্থলে তিন বছর থাকার কথা থাকলেও কেউ কেউ ৫ থেকে ৭ বছর ধরে একই কর্মস্থলে আছেন। আবার কেউ মামলা করেও থাকছেন একই স্টেশনে। দেশের ১১টি উপজেলায় কর্মরত পিআইও বদলির কারণে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন। মামলা করা ওই পিআইওরা পাঁচ বছর বা আরও বেশি সময় ধরে একই স্টেশনে আছেন। মন্ত্রণালয় থেকে তালিকা করা হচ্ছে, কারা তিন বছরের বেশি সময় ধরে এক স্টেশনে আছেন। নতুন নীতিমালার কারণে পিআইওদের যখন-তখন বদলি করা যাবে। ফলে তাদেরও ভয় আছে। পিডিদের নিয়েও কাজ করা হচ্ছে। যাদের অনিয়ম বিষয়েও তদন্ত করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হচ্ছে এবং আরও হবে।
দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে কর্তাদের নাম : বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী আবু তাহের চৌধুরী (যোগদান-২০২৬), সহকারী প্রকৌশালী মো. জালাল উদ্দিন (যোগদান-২০১৯), মো. কামরুল উপ-প্রকল্প পরিচালক (যোগদান-২০২০)। হেরিং বোন বন্ড (এইচবিবি) করণ নির্মাণ প্রকল্পের মো. নজরুল ইসলাম সহকারী প্রকল্প পরিচালক (যোগদান-২০১৬), সহকারী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম (যোগদান-২০১৬), সহকারী প্রকৌশলী কাজী আনোয়ারুল আলম (যোগদান-২০১৬), সহকারী প্রকৌশলী সালমা আক্তার (যোগদান-২০১৬), সহকারী প্রকৌশলী মীর মোরশেদ রানা (যোগদান-২০১৯), সহকারী প্রকৌশালী জাকির হোসেন (যোগদান-২০১৯), সহকারী প্রকৌশলী মো. মঈনুল ইসলাম (যোগদান-২০১৯)। দুর্যোগ আশ্রয় কেন্দ্র প্রকল্পের জাকির হোসেন (যোগদান-২০১৬), কাজী ইমতিয়াজ (যোগদান-২০১৯)। এ ছাড়াও কাজী ইমতিয়াজ, জাকির হোসেন, মো. মহিদুল ফারুক হোসেন, মো. বেলাল হোসেন মজুমদার, কমল বরণ সাহা, মো. তারিকল ইসলাম, মো. হাবিবুল্লাহ মিঞা, মো. জাকির হোসেনের নাম রয়েছে। এদের কেউ কেউ ২০১৬ সাল থেকে আবার কেউ কেউ ২০১৯ সাল থেকে উপজেলা কার্যালয় থেকে প্রকল্পে বদলি হয়ে দীর্ঘ ৭ বছর থেকে ১০ বছর কর্মরত আছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ, হেরিং বোন বন্ড (এইচবিবি) করণ, সেতু/কালভার্ট নির্মাণ, দুর্যোগ আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় ৩০ জন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এপিডি ও সহকারী প্রকৌশলী পদে ২০১৯ সাল থেকে, একই পদে দীর্ঘ ৭ বছর আবার কেউ কেউ ২০১৬ সাল থেকে দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ কর্মরত আছেন। যদিও সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী একই কর্মস্থলে/প্রকল্পে সর্বোচ্চ ৩ বছরের বেশি থাকার কথা না। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে সরকারি নীতিমালা না মেনে এই বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা একই কর্মস্থলে/প্রকল্পে ৮-১০ বছর কর্মরত আছেন। এর মধ্যে এইচবিবি ও সেতু/কালভার্ট প্রকল্পেই প্রায় ১৬ জন ৮-১০ বছর ধরে কর্মরত আছেন। যদিও সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী একই কর্মস্থলে/প্রকল্পে সর্বোচ্চ তিন বছর থাকার বিধান রয়েছে। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে সরকারি নীতিমালা না মেনে এই বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা একই কর্মস্থলে/প্রকল্পে কর্মরত আছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে তারা দীর্ঘদিন একই পদে কর্মরত আছেন। অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কর্মরত সব পিআইও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মাঠ পর্যায়ের উপজেলা থেকে বদলি করে বিভিন্ন প্রকল্পে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, দেশের প্রায় অধিকাংশ পিআইও-ডিআরআরওর নামে নানা অভিযোগ দুর্যোগ অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে এলেও অদৃশ্য কারণে এসব অভিযোগ ফাইলেই চাপা পড়ে থাকে। অভিযুক্তদের যোগসাজশে কখনো ফাইল থেকে গায়েব হয়ে যায় অভিযোগপত্র। মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এর সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। যাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে পিআরআরওরা। এ কারণে মন্ত্রী-সচিবের দপ্তর পর্যন্ত তথ্য সঠিক সময়ে পৌঁছায় না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দুর্নীতি অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারি নির্দেশে কঠোর অবস্থানে মন্ত্রণালয়। আগের সরকারের সময় যা হয়েছে এখন সেসব হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

